সীতাকুণ্ড প্রতিনিধি : চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের বহুল আলোচিত ও অপরাধীদের নিরাপদ আস্তানা হিসেবে পরিচিত ‘জঙ্গল সলিমপুর’ এলাকায় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। দীর্ঘ তিন দশকের সন্ত্রাসবাদ, পাহাড় কাটা, অবৈধ দখলদারিত্ব ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের চিরতরে অবসান ঘটাতে এই দুর্গম অঞ্চলে জরুরি ভিত্তিতে ৪টি বড় সড়ক নির্মাণের কাজ শুরু করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।
সরকারের উচ্চপর্যায়ের বিশেষ নির্দেশনায় গত বৃহস্পতিবার থেকে সেনাবাহিনীর ৩৪ কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড মাঠপর্যায়ে এই মেগা প্রকল্পের কাজ শুরু করে।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জঙ্গল সলিমপুর দীর্ঘ বছর ধরে চট্টগ্রামের অন্যতম দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত ছিল। ঘন পাহাড়ি বনাঞ্চল এবং সুনির্দিষ্ট কোনো যাতায়াত ব্যবস্থা না থাকায় এলাকাটিকে অপরাধীরা তাদের অভয়ারণ্য হিসেবে ব্যবহার করে আসছিল।
সরু পাহাড়ি পথ হওয়ায় পুলিশ বা র্যাবের পক্ষে সেখানে তাৎক্ষণিক অভিযান চালানো ছিল অত্যন্ত দুরূহ। বাহিনীগুলো অভিযানে নামলেই পাহাড়ের উঁচুতে থাকা অপরাধীরা দূর থেকে তা টের পেয়ে দুর্গম বনে আত্মগোপন করত। ফলে অতীতে বহু বড় বড় অভিযান চালিয়েও সেখানে দীর্ঘমেয়াদি বা কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পাওয়া যায়নি। সেনাবাহিনী সড়কগুলো নির্মাণ করলে এই পাহাড়ি জনপদে অবশেষে রাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সার্বিক প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হবে।
পাহাড়ি ও অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং এলাকায় রাস্তা নির্মাণে সেনাবাহিনীর দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে দ্রুততার সঙ্গে কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। যদিও প্রকল্পের চূড়ান্ত বাজেট এখনো নির্ধারিত হয়নি, তবে প্রাথমিক পর্যায়ে নিচের ৪টি সড়ক নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে।
প্রথম সড়ক ছিন্নমূল এলাকা থেকে শুরু করে আলীনগর উচ্চ বিদ্যালয় পর্যন্ত। দ্বিতীয় সড়ক আলীনগর–টেক্সটাইল হয়ে সরাসরি ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়ক পর্যন্ত সংযোগ সড়ক। তৃতীয় সড়ক আলীনগর থেকে বাংলাদেশ মিলিটারি অ্যাকাডেমির (বিএমএ) পাশ দিয়ে ভাটিয়ারী–বালুচড়া লিংক রোড হয়ে চট্টগ্রাম–খাগড়াছড়ি মহাসড়ককে সংযুক্তকারী গুরুত্বপূর্ণ বাইপাস সড়ক। চতুর্থ সড়ক জঙ্গল সলিমপুরের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থার সার্বিক উন্নয়নে আরও একটি সংযোগ সড়ক।
অনুসন্ধানে জানা যায়, নব্বইয়ের দশকে আলী আক্কাস নামে এক কুখ্যাত সন্ত্রাসী ও ভূমিদস্যুর মাধ্যমে এই সংকটের সূচনা হয়। সে ‘ছিন্নমূল পুনর্বাসন’ প্রকল্পের একটি ভুয়া ব্যানার ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নদীভাঙন কবলিত ও বাস্তুচ্যুত অসহায় মানুষের আবেগ নিয়ে খেলা শুরু করে। মাত্র ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পের মাধ্যমে সরকারি খাস জমি অবৈধভাবে প্লট আকারে বিক্রি করে সেখানে এক অনিয়ন্ত্রিত বিশাল জনবসতি গড়ে তোলে। সময়ের ব্যবধানে এই ছিন্নমূল এলাকাটি বিশাল এক ভূমি বাণিজ্য, চাঁদাবাজি, অবৈধ অস্ত্রের গুদাম, মাদক ব্যবসা এবং প্রশাসন বহির্ভূত এক সমান্তরাল অপরাধ সাম্রাজ্যে পরিণত হয়।
দীর্ঘদিন ধরে নির্বিচারে পাহাড় কেটে বসতি স্থাপন ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার কারণে সীতাকুণ্ডের পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। পরিবেশবিদরা বহুবার সতর্ক করেছেন যে, জঙ্গল সলিমপুরে যেভাবে পাহাড় ন্যাড়া করা হয়েছে, তাতে যেকোনো মুহূর্তে ভয়াবহ ভূমিধসে শত শত মানুষের প্রাণহানি ঘটতে পারে।
বিগত বছরগুলোতে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী একাধিকবার বড় ধরনের উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে অবৈধ বিদ্যুৎ-গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন, সন্ত্রাসী গ্রেফতার এবং কয়েকশ একর সরকারি খাস জমি উদ্ধার করলেও প্রভাবশালী চক্রের কারণে পরিস্থিতির কোনো স্থায়ী সমাধান সম্ভব হচ্ছিল না।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সড়ক নির্মাণ প্রসঙ্গে বলেন, জঙ্গল সলিমপুরের মূল সমস্যাই ছিল ভেতরের যোগাযোগ ব্যবস্থা। পর্যাপ্ত রাস্তা না থাকায় কোনো অপরাধ ঘটার পর পুলিশ সেখানে তাৎক্ষণিকভাবে পৌঁছাতে পারত না। সেনাবাহিনীর এই ৪টি সড়ক নির্মাণ সম্পন্ন হলে আমাদের উপস্থিতি ও নিয়মিত নজরদারি বহুগুণ বেড়ে যাবে। অপরাধীদের পালিয়ে থাকার আর কোনো সুযোগ থাকবে না।
সেনাবাহিনীর এই বিশাল উদ্যোগে জঙ্গল সলিমপুরের সাধারণ ও নিরীহ বাসিন্দাদের মধ্যে দীর্ঘদিনের আতঙ্ক কেটে গিয়ে স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে। স্থানীয়দের মতে, এই রাস্তাগুলো শুধু সন্ত্রাস দমনেই ভূমিকা রাখবে না, বরং এতদিন ধরে মূল শহর থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা এই জনপদের শিক্ষা, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সব ধরনের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করবে। টেকসই এই সড়ক ব্যবস্থার মাধ্যমে জঙ্গল সলিমপুর মূলধারার সমাজের সঙ্গে যুক্ত হতে যাচ্ছে— যা এই অঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক।