আন্তর্জাতিক ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে হওয়া সমঝোতা চুক্তিকে বড় ধরনের ‘কূটনৈতিক সাফল্য’ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছেন বিশ্বনেতারা। সেইসঙ্গে তারা আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর এই উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন এবং আলোচনায় পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকারও ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।
রোববার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তারা ঘোষণা করেন, দুই দেশ যুদ্ধের অবসান, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর বিষয়ে একটি কাঠামোগত সমঝোতায় পৌঁছেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রোববার ওয়াশিংটনের স্থানীয় সময় বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে চুক্তির ঘোষণা দিয়ে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লেখেন, ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সঙ্গে চুক্তি এখন সম্পন্ন হয়েছে।’
এর কিছুক্ষণ আগে মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ জানান, স্থানীয় সময় সোমবার ভোরে একটি সমঝোতা অর্জিত হয়েছে।
সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) আগামী শুক্রবার (১৯ জুন) সুইজারল্যান্ডে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা রয়েছে।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস :
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এই শান্তি চুক্তিকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, ‘এটি সংঘাতের অবসান এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথে একটি বড় পদক্ষেপ।’
তিনি ওয়াশিংটন ও তেহরানকে অভিনন্দন জানান, কারণ এই চুক্তিতে তাৎক্ষণিক ও স্থায়ী যুদ্ধবিরতি, হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু এবং ভবিষ্যৎ আলোচনার একটি কাঠামো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
গুতেরেস পাকিস্তান, কাতার, মিশর, সৌদি আরব, তুরস্কসহ অন্যান্য আঞ্চলিক দেশের প্রতিও গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এসব দেশের গঠনমূলক ভূমিকা এই অগ্রগতি অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান :
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান চুক্তিটিকে আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি বলে উল্লেখ করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে এই সমঝোতা অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
এরদোগান পাকিস্তানের ‘ব্যতিক্রমী মধ্যস্থতা প্রচেষ্টার’ প্রশংসা করেন এবং চুক্তি সম্পাদনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের নেতৃত্বকেও স্বীকৃতি দেন।
তিনি আরও বলেন, ‘কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় সহায়তা দেওয়ার জন্য কাতার ও সৌদি আরবকেও আমি ধন্যবাদ জানাই।’
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ:
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই সমঝোতাকে আমরা স্বাগত জানাই। অস্ট্রেলিয়া দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনা হ্রাস এবং সংঘাতের অবসানের আহ্বান জানিয়ে আসছে, বিশেষ করে লেবাননের পরিস্থিতি নিয়েও।’
তিনি বলেন, ‘যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হয়, এর প্রভাব তত বাড়তে থাকে। ভবিষ্যতে উত্তেজনা এড়াতে সংযম ও গঠনমূলক সংলাপ অপরিহার্য।’
তিনি পাকিস্তান, কাতার, সৌদি আরব, তুরস্কসহ অন্যান্য মধ্যস্থতাকারী দেশের প্রচেষ্টারও প্রশংসা করেন।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার:
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এক্সে লেখেন, ‘আজ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া এই চুক্তিকে আমি আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাই। যুদ্ধের অবসান, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।’
তিনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং পাকিস্তান, কাতারসহ অন্যান্য মধ্যস্থতাকারীদের অভিনন্দন জানান।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ:
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া এই চুক্তিকে আমি স্বাগত জানাই। এটি বিভিন্ন অংশীদারের যৌথ কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফল।’
তিনি দ্রুত ও পূর্ণাঙ্গভাবে চুক্তি বাস্তবায়নের আহ্বান জানান এবং বলেন, এর মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি দ্রুত ও নিঃশর্তভাবে খুলে দেওয়া সম্ভব হবে।
কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল থানি:
কাতারের প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারকে পৌঁছানোর ঘটনাকে স্বাগত জানিয়েছেন।
এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি পাকিস্তানসহ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, তাদের সহযোগিতাই আলোচনার জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে এবং সমঝোতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মের্ৎস:
জার্মান চ্যান্সেলর বলেন, ‘আমি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই চুক্তিকে স্বাগত জানাই এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ইরানি পক্ষকে এই কূটনৈতিক সাফল্যের জন্য অভিনন্দন জানাই।’
তার মতে, এই চুক্তি বৈশ্বিক অর্থনীতিকে নতুন গতি দিতে পারে এবং মধ্যপ্রাচ্যকে আরও নিরাপদ করে তুলতে সহায়তা করবে।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি:
জাপানের প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ ও অবাধ নৌচলাচল বাস্তবে নিশ্চিত করা হবে। তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিসহ অন্যান্য বিষয়ে চূড়ান্ত সমঝোতাও দ্রুত সম্পন্ন হবে।’
একই সঙ্গে তিনি মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন।
নিউজিল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইনস্টন পিটার্স:
উইনস্টন পিটার্স বলেন, ‘এই গুরুত্বপূর্ণ ও ইতিবাচক চুক্তি উত্তেজনা কমানো এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চলে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার পথে বড় পদক্ষেপ।’
তিনি জোর দিয়ে বলেন, দীর্ঘদিনের জটিল সমস্যার সমাধানে সংলাপ ও কূটনীতিই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
ই-৪ দেশগুলোর যৌথ বিবৃতি:
যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি ও ইতালিকে নিয়ে গঠিত ই-৪ জোট জানিয়েছে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হলে তারা দেশটির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে প্রস্তুত।
যৌথ বিবৃতিতে তারা বলেছে, ‘ইরান কখনও পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে পারবে না। এই লক্ষ্য অর্জনে আমরা যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত।’
তথ্যসূত্র: জিও নিউজ