বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৭ শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
৭ সফর, ১৪৪৮ হিজরি

আয়া সুফিয়া-ব্লু মসজিদ: সভ্যতার দুই অমর স্মারক

মুক্তবাণী ডেস্ক : আজানের ধ্বনি ভেসে আসে এক প্রান্ত থেকে, আর অন্য প্রান্তে পর্যটকদের দীর্ঘ সারি। মাঝখানে ঐতিহাসিক সুলতানাহমেত স্কয়ার।
এখানেই পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে বিশ্বের অন্যতম আলোচিত দুটি স্থাপনা-আয়া সুফিয়া (হায়া সোফিয়া) ও ব্লু মসজিদ (সুলতান আহমেদ মসজিদ)। একটি প্রায় দেড় হাজার বছরের পুরোনো, অন্যটি অটোমান সাম্রাজ্যের স্থাপত্যশৈলীর অনন্য নিদর্শন।
দুটি স্থাপনা যেন ইস্তাম্বুলের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সভ্যতার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীক।

ইস্তাম্বুলে কয়েকদিন ঘুরে দেখা যায়, শহরের সবচেয়ে বেশি দর্শনার্থীর ভিড় এই দুই স্থাপনাকে ঘিরেই।
প্রতিদিন বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে হাজার হাজার পর্যটক, গবেষক ও ধর্মপ্রাণ মানুষ এখানে আসেন। কেউ ইতিহাসের টানে, কেউ স্থাপত্যের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হতে, আবার কেউ নামাজ বা প্রার্থনায় অংশ নিতে।

বাংলাদেশে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি আয়া সুফিয়া নামে বেশি পরিচিত। তবে আন্তর্জাতিকভাবে এর নাম হাগিয়া সোফিয়া, আর তুর্কি ভাষায় আয়াসোফিয়া। গ্রিক শব্দ হাগিয়া অর্থ ‘পবিত্র’ এবং সোফিয়া অর্থ ‘প্রজ্ঞা’ বা ‘ঈশ্বরীয় জ্ঞান’। অর্থাৎ হাগিয়া সোফিয়ার অর্থ ‘পবিত্র প্রজ্ঞা’। এটি কোনো ব্যক্তির নাম নয়; বরং খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্বে ঈশ্বরের জ্ঞানের প্রতীক হিসেবে এই নামকরণ করা হয়েছিল।

বর্তমান আয়া সুফিয়া নির্মাণ করেন বাইজেন্টাইন সম্রাট জাস্টিনিয়ান প্রথম। ৫৩২ সালে নির্মাণকাজ শুরু হয়ে ৫৩৭ সালে এটি সম্পন্ন হয়। প্রায় এক হাজার বছর এটি ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় গির্জা এবং পূর্ব অর্থোডক্স খ্রিস্টানদের অন্যতম প্রধান উপাসনালয়। সে সময় প্রায় ৫৬ মিটার উচ্চতার গম্বুজ নির্মাণ ছিল প্রকৌশল বিজ্ঞানের এক বিস্ময়, যা পরবর্তী শতাব্দীতে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বহু গির্জা ও মসজিদের স্থাপত্যে প্রভাব ফেলেছে।

১৪৫৩ সালে অটোমান সুলতান দ্বিতীয় মেহমেদ কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের পর আয়া সুফিয়াকে মসজিদে রূপান্তর করেন। তবে ভবনের মূল কাঠামো অক্ষত রেখে এতে মিনার, মিহরাব, মিনবার এবং ইসলামি ক্যালিগ্রাফি সংযোজন করা হয়। ফলে একই স্থাপনায় আজও পাশাপাশি দেখা যায় বাইজেন্টাইন মোজাইক শিল্প ও অটোমান ইসলামী শিল্পকলার অপূর্ব সমন্বয়।

১৯৩৫ সালে আধুনিক তুরস্কের প্রতিষ্ঠাতা মুস্তাফা কামাল আতাতুর্ক এটিকে জাদুঘরে রূপান্তর করেন। পরে ২০২০ সালে এটি আবার মসজিদ হিসেবে চালু হয়। বর্তমানে এটি একই সঙ্গে একটি সক্রিয় উপাসনালয় এবং বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ঐতিহাসিক নিদর্শন।

আয়া সুফিয়ার ঠিক বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকা ব্লু মসজিদের সরকারি নাম সুলতান আহমেদ মসজিদ। অটোমান সুলতান প্রথম আহমেদের নির্দেশে ১৬০৯ সালে এর নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং ১৬১৭ সালে শেষ হয়। নকশা করেন বিখ্যাত স্থপতি সেদেফকার মেহমেদ আগা, যিনি অটোমান স্থাপত্যের কিংবদন্তি মিমার সিনানের শিষ্য ছিলেন।

মসজিদটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো ছয়টি মিনার। নির্মাণের সময় এটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল, কারণ সে সময় মক্কার মসজিদুল হারামেও ছয়টি মিনার ছিল। পরে সেখানে সপ্তম মিনার নির্মাণের মাধ্যমে সেই বিতর্কের অবসান ঘটে।

মসজিদের ভেতরে প্রায় ২০ হাজার হাতে তৈরি ইজনিক টাইলস ব্যবহার করা হয়েছে। নীল, ফিরোজা ও সাদা রঙের এসব টাইলসের আধিক্যের কারণেই ইউরোপীয়রা একে ‘ব্লু মসজিদ’ নামে পরিচিত করে। যদিও তুরস্কে এর সরকারি নাম এখনও সুলতান আহমেদ মসজিদ।

সুলতানাহমেত স্কয়ারের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, কয়েক মিনিট হাঁটলেই দেখা মেলে দুই ভিন্ন সাম্রাজ্যের ইতিহাস। একদিকে বাইজেন্টাইন সভ্যতার গৌরব, অন্যদিকে অটোমান সাম্রাজ্যের শক্তি, শিল্পরুচি ও স্থাপত্য।

আয়া সুফিয়া, ব্লু মসজিদ, টপকাপি প্রাসাদ, বাসিলিকা সিস্টার্ন এবং প্রাচীন হিপোড্রোম নিয়ে গড়ে ওঠা এই ঐতিহাসিক অঞ্চল ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পায়। বর্তমানে আয়া সুফিয়ার দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ ও ভূমিকম্প-সহনশীলতা বাড়াতে ব্যাপক সংস্কারকাজ চলছে।

ইস্তাম্বুলে এসে বোঝা যায়, আয়া সুফিয়া ও ব্লু মসজিদ কেবল দুটি দর্শনীয় স্থান নয়; এগুলো দুই সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকার বহনকারী জীবন্ত ইতিহাস। শত শত বছর পেরিয়েও স্থাপত্য, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের অনন্য সাক্ষী হয়ে আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে তারা।