নিজস্ব প্রতিবেদক : প্রতারণার অভিযোগে গেজেট থেকে বাদ পড়া ৩৪ জুলাইযোদ্ধাকে পুনর্বহালের সুপারিশ করেছে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় পর্যালোচনা কমিটি। এর আগে সরকারি তদন্তে ভুয়া প্রমাণিত হওয়ায় ১৩ জন শহিদসহ ২২১ জনের গেজেট বাতিল করা হয়েছিল।
পরে বাদ পড়াদের মধ্যে আপিল করা ৪৬ জনের আবেদন পুনঃযাচাই করে আহত ৩৪ জনকে প্রকৃত জুলাইযোদ্ধা হিসেবে পুনরায় গেজেটভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান অধিদপ্তর জানিয়েছে, আপিলে সুপারিশপ্রাপ্ত জুলাইযোদ্ধাদের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে সরকারের উচ্চপর্যায়ের কমিটি।
একই সময়ে শহিদ ও আহতদের স্বীকৃতি প্রক্রিয়ায় প্রতারণা ও জালিয়াতির অভিযোগে আরও ১২৮ জনের মাসিক ভাতা ও অন্যান্য সরকারি সুবিধা স্থগিত করা হয়েছে। পাশাপাশি নতুন আবেদন যাচাইয়ে প্রায় ২০০টি আবেদন সম্পূর্ণ ভুয়া এবং আরও ৬০০টি আবেদন তথ্যগত অসংগতিপূর্ণ হিসেবে শনাক্ত হওয়ায় পুরো যাচাই কার্যক্রম নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আনোয়ারুল নাসের বলেন, গেজেট বাতিল হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৪৬ জন আপিল করেছিলেন। যাচাই-বাছাই শেষে ১২ জন প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করতে না পারলেও ৩৪ জন আন্দোলনে আহত হওয়া এবং বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার প্রমাণ দাখিল করতে সক্ষম হয়েছেন।
তিনি জানান, অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বাধীন স্থানীয় পর্যালোচনা কমিটি এসব তথ্য যাচাই করে তাদের পুনরায় জুলাইযোদ্ধা হিসেবে গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করেছে। অধিদপ্তর সেই সুপারিশ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে।
এখন বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ের কমিটির চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে।
অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১ জানুয়ারি থেকে বিভিন্ন ধাপে পরিচালিত তদন্তে মিথ্যা তথ্য, ভুয়া নথি, দ্বৈত নিবন্ধন ও অসত্য দাবির প্রমাণ পাওয়ায় ১৩ জন শহিদসহ মোট ২২১ জনের গেজেট বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগে অভিযুক্ত ১২৮ জনের মাসিক ভাতা, এককালীন অনুদানসহ সব ধরনের সরকারি সুযোগ-সুবিধা স্থগিত করা হয়েছে। এদের মধ্যে ১০৫ জনের ক্ষেত্রে আন্দোলনে আহত বা সম্পৃক্ত না থাকার প্রমাণ মিলেছে। আর ২৩ জনের নাম একাধিক গেজেটে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
নতুন আবেদন যাচাইয়েও বড় ধরনের অনিয়ম ধরা পড়েছে। অধিদপ্তরের হিসাবে, প্রায় ২০০টি আবেদন সম্পূর্ণ ভুয়া বলে শনাক্ত হয়েছে। আরও প্রায় ৬০০টি আবেদনে তথ্যগত অসংগতি, একই ব্যক্তির একাধিক আবেদন, শহিদের পরিচয়ে আহত হিসেবে আবেদন কিংবা প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্রের ঘাটতি পাওয়া গেছে। এসব আবেদন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের তদন্ত কমিটির মাধ্যমে যাচাই করা হচ্ছে। একই সঙ্গে শতাধিক সন্দেহজনক গেজেট ও আবেদন এখনো তদন্তাধীন রয়েছে।
আনোয়ারুল নাসের বলেন, সরকারের উদ্দেশ্য কাউকে হয়রানি করা নয়; বরং প্রকৃত জুলাইযোদ্ধাদের অধিকার নিশ্চিত করা। অভিযোগ পাওয়া প্রতিটি ঘটনা স্থানীয় পর্যায়ে তদন্ত করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। যাদের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে, তাদের গেজেট বাতিলের পাশাপাশি সরকারি সুবিধা স্থগিত করা হয়েছে। আবার যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ টেকেনি এবং গ্রহণযোগ্য প্রমাণ পাওয়া গেছে, তাদের ক্ষেত্রেও ন্যায়সংগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। আপিলে সুপারিশ পাওয়া ৩৪ জন তারই উদাহরণ।
তিনি আরও জানান, প্রতারণার মাধ্যমে সরকারি সুবিধা গ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে শুধু গেজেট বাতিলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না সরকার। যারা ইতোমধ্যে ভাতা বা অন্য আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন, তাদের কাছ থেকে অর্থ পুনরুদ্ধারে জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অভিযোগের ধরন অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হবে। তবে যেসব আপিলকারীর পুনঃগেজেটের বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি, তাদের ক্ষেত্রে উচ্চপর্যায়ের কমিটির সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত পৃথক কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, এত বড় কল্যাণ কর্মসূচির বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখতে কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের কোনো বিকল্প নেই। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সাধারণ সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, প্রকৃত শহিদ পরিবার ও আহতদের অধিকার রক্ষায় যেমন প্রতারণাকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা জরুরি, তেমনি ভুলবশত বাদ পড়া প্রকৃত যোদ্ধাদেরও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। আপিলের মাধ্যমে ৩৪ জনের পুনঃগেজেটের সুপারিশ দেখাচ্ছে, যাচাই প্রক্রিয়া কেবল শাস্তিমূলক নয়, সংশোধনমূলকও।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থান অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৮৪৩ জন শহিদ এবং ১৪ হাজার ৩৭০ জন আহত জুলাইযোদ্ধার গেজেট কার্যকর রয়েছে। শহিদ পরিবার ও আহত জুলাইযোদ্ধাদের কল্যাণে এ পর্যন্ত প্রায় ৯৭৩ কোটি ৩৩ লাখ টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শহিদ পরিবারের জন্য সঞ্চয়পত্র, আহতদের এককালীন অনুদান, মাসিক ভাতা এবং বিদেশে উন্নত চিকিৎসার ব্যয়। সরকার ইতোমধ্যে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার কল্যাণ কর্মসূচি বাস্তবায়নের পথে রয়েছে।
এদিকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আগামী ৫ আগস্ট থেকে তিন দিনব্যাপী জাতীয় কর্মসূচির প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম জানিয়েছেন, জুলাই মাসজুড়ে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হলেও মূল আয়োজন শুরু হবে ৫ আগস্ট। ওই দিন তিন দিনব্যাপী বিশেষ কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, কর্মসূচির প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সময়সূচির সঙ্গে সমন্বয় করে অনুষ্ঠানসূচি চূড়ান্ত করা হচ্ছে। আগামী দু-এক দিনের মধ্যেই কোথায়, কখন এবং কী ধরনের কর্মসূচি হবে, তার পূর্ণাঙ্গ সূচি প্রকাশ করা হবে।