আন্তর্জাতিক ডেস্ক : অধিকৃত পশ্চিম তীরের উত্তরাঞ্চলীয় তাল গ্রামে বন্দুক হামলা ও সংঘর্ষে অন্তত চার ফিলিস্তিনি এবং দুই ইসরায়েলি নিহত হয়েছেন। কয়েক মাসের মধ্যে পশ্চিম তীরে এটিই সবচেয়ে প্রাণঘাতী একক ঘটনা। এ ঘটনার জন্য একে অপরকে দায়ী করেছে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন। ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
ঘটনার পর পশ্চিম তীরে ব্যাপক সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান চালানোর প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)।
স্থানীয় ফিলিস্তিনিদের দাবি, শনিবার সকালে প্রায় ৩০ জন ইহুদি বসতি স্থাপনকারী (সেটলার) তাল গ্রামে ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘরে হামলা চালায়। তাদের প্রতিরোধ করতে গেলে সংঘর্ষ শুরু হয়। পরে ঘটনাস্থলে ইসরায়েলি সেনারা এসে গুলি চালায়।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী আহমেদ জেইদান বিবিসিকে বলেন, বসতি স্থাপনকারীদের সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের হাতাহাতির সময় ইসরায়েলি সেনারা উপস্থিত ছিল। পরে তারা গুলি চালানো শুরু করে।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের ক্ষমতাসীন ফাতাহ আন্দোলনের স্থানীয় নেতা ইসাম সাইফি রয়টার্সকে বলেন, ইসরায়েলি সেনারা পৌঁছানোর আগেই সেটলাররা গুলি চালায়। পরে সেনারাও গুলি চালায়। এতে কয়েকজন ফিলিস্তিনি আহত হন।
তবে আইডিএফ সম্পূর্ণ ভিন্ন দাবি করেছে। ইসরায়েলি বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই এলাকায় ভ্রমণে যাওয়া কয়েকজন ইসরায়েলির ওপর হামলার খবর পেয়ে সেনারা সেখানে যায়। এ সময় কাছের একটি সেটলার আউটপোস্টের নিরাপত্তারক্ষীর অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে এক ফিলিস্তিনি হামলা চালিয়ে তাকে হত্যা করে। পরে সেনারা ওই হামলাকারীকে গুলি করে হত্যা করে।
আইডিএফের সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান মেজর জেনারেল আভি ব্লুথ জানান, গোলাগুলির ঘটনায় একই ফিলিস্তিনি পরিবারের চার সদস্য নিহত হয়েছেন।
এ ঘটনায় আরও এক ইসরায়েলি সেনাও নিহত হয়েছেন। তবে তার মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতি এখনো পরিষ্কার নয়। এছাড়া আরও দুই ইসরায়েলি আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির অ্যাম্বুলেন্স সেবা।
ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ভিডিওতে ফিলিস্তিনি, ইসরায়েলি সেনা এবং বেসামরিক পোশাকে সশস্ত্র ইসরায়েলিদের মধ্যে সংঘর্ষের দৃশ্য দেখা গেছে। যদিও ভিডিওগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তালের ঘটনাকে গণহত্যা আখ্যা দিয়ে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। এক বিবৃতিতে বলা হয়, ইসরায়েলি সরকারের রাজনৈতিক সমর্থন, নিরাপত্তা বাহিনীর সুরক্ষা এবং দায়মুক্তির কারণেই বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বাড়ছে।
অন্যদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু হামলার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে পূর্ণ শক্তি প্রয়োগের অঙ্গীকার করেছেন। তিনি নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেছেন এবং ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজের যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়, তাল গ্রামের অভিযুক্ত ফিলিস্তিনি বন্দুকধারীর বাড়ি ভেঙে ফেলা হবে। পাশাপাশি অনুমোদনহীন ইসরায়েলি বসতি বৈধ করার এবং নতুন বসতি স্থাপনের প্রক্রিয়াও দ্রুততর করা হবে।
তবে ইসরায়েলের বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটস পার্টির নেতা ইয়াইর গোলান এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলেন, এটি পুরো অঞ্চলকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলবে।
তালের ঘটনার পর পশ্চিম তীরের আরও কয়েকটি গ্রামে সশস্ত্র ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে নতুন করে সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয় চিকিৎসকদের মতে, ফারাতা গ্রামে অন্তত একজন ফিলিস্তিনি মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।
ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থি জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির বলেছেন, ‘যেসব গ্রাম থেকে হামলাকারীরা এসেছে, সেগুলোর সঙ্গে গাজার মতো আচরণ করা উচিত।’
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের হামলা এবং সহিংসতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ওই সময় থেকে পশ্চিম তীরে অন্তত ১ হাজার ১১৪ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর অভিযানে প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে অন্তত ৩৫ জন বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় নিহত হন।
একই সময়ে ফিলিস্তিনিদের হামলা অথবা ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের সময় পশ্চিম তীরে ৪১ জন ইসরায়েলি নিহত হয়েছেন।