নিজস্ব প্রতিবেদক : জুলাই সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সংবিধান সংস্কার নাকি সংশোধন- এই প্রশ্নে বিরোধ রেখেই জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত যে বিশেষ কমিটি হয়েছে, তারা প্রথমবারের মতো ৪ অগাস্ট বৈঠকে বসতে যাচ্ছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বাধীন এই কমিটি বৈঠকটি হবে জাতীয় সংসদে।
‘সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি’র সদস্য আন্দালিভ রহমান পার্থ বলেন, “আগামী ৪ অগাস্ট সংবিধান সংশোধন কমিটির বৈঠক হবে বলে জানানো হয়েছে।
জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন শেষ হওয়ার দুই দিন আগে ১৩ জুলাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত ১২ সদস্যের এই বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়।
সেদিন বিরোধী দল গণভোটের রায়কে উপেক্ষা করে এই কমিটি করার প্রতিবাদে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে।
বিরোধী দলের জন্য পাঁচটি পদ শূন্য রাখা হলেও বিশেষ কমিটিতে সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস কোনো নাম প্রস্তাব করেনি।
সংসদে তারা বলেছেন, কমিটির ধারণাগত ভিত্তিই তারা গ্রহণ করেন না; তাই এতে সদস্য দেওয়ারও প্রশ্ন আসে না।
তবে বিএনপি বলছে, যেকোনো সময় জামায়াত নাম প্রস্তাব করলে তাদের যুক্ত করা হবে।
প্রথমে ১৭ সদস্যের একটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। এতে বিএনপির সাতজন, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির একজন, গণসংহতি আন্দোলনের একজন, গণঅধিকার পরিষদের একজন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের একজন, স্বতন্ত্র একজন এবং বিরোধী দলের পাঁচজন সদস্য রাখার পরিকল্পনা ছিল।
সে দিন সংসদে চিফ হুইপ জানান, বিরোধী দলের সদস্যদের নাম চেয়ে কয়েক দফা যোগাযোগ করা হলেও তারা এখন পর্যন্ত কোনো নাম দেননি। তাই বিরোধী দলের জন্য নির্ধারিত পাঁচটি পদ শূন্য রেখে আপাতত ১২ সদস্যের কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হচ্ছে। পরে বিরোধী দল সদস্যদের নাম দিলে তাদের অন্তর্ভুক্ত করে কমিটি পুনর্গঠন করা হবে।
কমিটির সদস্যরা হলেন—সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল উদ্দিন, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন, বিএনপির সংসদ সদস্য জয়নুল আবেদীন, শাকিলা ফারজানা, মাহমুদুল হক রুবেল, গণসংহতি আন্দোলনের সংসদ সদস্য জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, বিজেপির সংসদ সদস্য আন্দালিভ রহমান পার্থ, গণঅধিকার পরিষদের সংসদ সদস্য নুরুল হক এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সংসদ সদস্য মো. অলি উল্লাহ।
বুধবার সন্ধ্যায় জামায়াতের সংসদীয় দলের মুখপাত্র নাজিবুর রহমান বলেন, “আমরা সংশোধন কমিটিতে কোনো নাম দেব না। আমরা এতে যুক্ত হচ্ছি না।”
কমিটিতে না গেলেও সংসদে কথা বলার সুযোগ আছে, বলেন নাজিবুর রহমান।
তার ভাষ্য, “কমিটি তো সংসদে পাশ হয়েছে। আর সুযোগ নেই। তাছাড়া আমরা সংসদে ও সংসদের বাইরে তো কথা বলবই।’
জামায়াতের এই সংসদ সদস্য বলেন, “সরকার ইতোমধ্যে জুলাই সনদ অক্ষরে-অক্ষরে পালন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আমরা দেখতে চাই, সেটা তারা পূরণ করে কিনা।”
তবে সরকারি দলের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলছেন, “জামায়াতে ইসলামী যেকোনো সময় নাম দিলেই তাদের নাম যুক্ত করা হবে। এরপর সংসদে তা তোলা হবে।”
জামায়াতের পক্ষ থেকে সংবিধান সংশোধনে বিশেষ কমিটি না করে ‘সংস্কার কমিটি’ করার প্রস্তাব ছিল। যদিও সরকারি দল এতে সায় দেয়নি।
সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনে বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেছিলেন, তারা ‘কনসেপচুয়ালি’ সংবিধান সংশোধন কমিটিকে গ্রহণ করেননি।
বুধবার রাতে সংবিধান সংশোধন কমিটির সদস্য নূরুল ইসলাম মনি বলেন, আগামী ৪ অগাস্ট আসন্ন বৈঠকে পরিচিতিমূলক আলোচনাই হবে।
আলোচনার এজেন্ডা প্রথম বৈঠকের পরই জানা যাবে, বলেন বিএনপির এই সংসদ সদস্য।
১৯৭২ সালের ১১ এপ্রিল বাংলাদেশের সংবিধানের খসড়া তৈরির জন্য ৩৫ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটির প্রধান বা চেয়ারম্যান ছিলেন ড. কামাল হোসেন। এর পর বিভিন্ন সরকারের সময় সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে।
তবে চাকরিতে কোটা নিয়ে জুলাই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর রাষ্ট্রসংস্কারের জোরালো দাবি ওঠে।
মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দেশের হাল ধরার পর সংবিধান, বিচার বিভাগ, পুলিশ, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), নির্বাচন ব্যবস্থা ও জনপ্রশাসন সংস্কারসহ ১১টি খাত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এসব কমিশনের সুপারিশ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা, সংলাপ, বিতর্ক পেরিয়ে গেল বছরের ১৭ অক্টোবর তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের উপস্থিতিতে জুলাই জাতীয় সনদ গৃহীত হয়।
এরপর নভেম্বরে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, যে আদেশ অনুসারে গণভোট অধ্যাদেশ জারি করা হয়।
গেল ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে গণভোট হয়, তাতে প্রায় ৬৯ শতাংশ ভোট পড়ে সংবিধান সংস্কারের পক্ষে।
রাষ্ট্রপতির ওই আদেশ অনুসারে, সংসদ সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নেওয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল। তবে ২০৯ আসনে জয় পাওয়া বিএনপির প্রার্থীরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি, তারা শুধু সংসদ সদস্য হিসেবেই শপথ নেন।
অন্যদিকে আলাদা করে উভয় শপথই নেন জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের ৭৭ জন সদস্য।