খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি : পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী খাগড়াছড়ি জোনের উদ্যোগে আয়োজিত বিনামূল্যে চক্ষু চিকিৎসা ক্যাম্পের মাধ্যমে ছানি অপারেশনের জন্য ৮৪ জন রোগীকে চট্টগ্রাম লায়ন্স হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
সোমবার সকালে সেনাবাহিনীর ব্যবস্থাপনায় প্রথম ধাপে ছানি অপারেশনের জন্য নির্বাচিত ৮৪ জন রোগীকে পাঠানো হয়। পরবর্তী ধাপে আরো ৭১ জন রোগীকে লায়ন্স হাসপাতালে পাঠানোর কথা রয়েছে। এভাবে পর্যায়ক্রমে ক্যাম্পে শনাক্ত হওয়া সকল রোগীর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও ছানি অপারেশন সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এর আগে গত ১৯ আগস্ট পানছড়ি উপজেলা মডেল মসজিদ কমপ্লেক্সে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী খাগড়াছড়ি জোনের উদ্যোগে একটি বিনামূল্যে চক্ষু চিকিৎসা ক্যাম্পেইনের আয়োজন করা হয়। প্রত্যন্ত এলাকার সাধারণ মানুষের জন্য উন্নত চক্ষু চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য করার উদ্দেশ্যে আয়োজিত এ ক্যাম্পে চট্টগ্রাম লায়ন্স হাসপাতাল থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা অংশগ্রহণ করেন। ক্যাম্পে আগত রোগীদের চক্ষু পরীক্ষা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা পরামর্শ প্রদান করা হয়।
চিকিৎসা ক্যাম্পে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ছানি অপারেশনের প্রয়োজন রয়েছে—এমন মোট ১৫৫ জন রোগীকে শনাক্ত করা হয়। পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে এসব রোগীকে চট্টগ্রাম লায়ন্স হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ছানি অপারেশনের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এরই অংশ হিসেবে আজ প্রথম ধাপে ৮৪ জন রোগীকে চট্টগ্রামে প্রেরণ করা হয়েছে।
প্রথম ধাপে পাঠানো ৮৪ জন রোগীর মধ্যে ৪৬ জন পাহাড়ি এবং ৩৮ জন বাঙালি জনগোষ্ঠীর সদস্য। তাদের মধ্যে ৩৪ জন পুরুষ ও ৫০ জন নারী রয়েছেন।
খাগড়াছড়ি সদর জোন সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম লায়ন্স হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রেরিত রোগীদের প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করার পর চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী ছানি অপারেশনসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা প্রদান করা হবে। অপারেশন ও চিকিৎসা কার্যক্রম শেষে রোগীদের বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ব্যবস্থাপনায় নিরাপদে পুনরায় খাগড়াছড়িতে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হবে।
সেনাবাহিনীর এ উদ্যোগকে পার্বত্য এলাকার সাধারণ মানুষ অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছে। প্রত্যন্ত পাহাড়ি অঞ্চলের অনেক মানুষ আর্থিক অসচ্ছলতা, যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সুবিধার স্বল্পতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে চোখের বিভিন্ন সমস্যায় ভুগলেও সময়মতো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে পারেন না। বিশেষ করে ছানি রোগের কারণে অনেকেই ধীরে ধীরে দৃষ্টিশক্তি হারানোর ঝুঁকিতে থাকেন। বিনামূল্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অপারেশনের সুযোগ তাদের জন্য নতুন আশার সৃষ্টি করেছে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দীর্ঘদিন ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের পাশে থেকে বিভিন্ন ধরনের মানবিক ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। চিকিৎসাসেবা, বিনামূল্যে ওষুধ বিতরণ, চক্ষু চিকিৎসা, স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন সামাজিক সহায়তার মাধ্যমে পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে সেনাবাহিনীর এ ধরনের কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী মনে করে, পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া শুধু একটি চিকিৎসা কার্যক্রম নয়; বরং এটি মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা এবং পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। ভবিষ্যতেও পার্বত্য চট্টগ্রামের পিছিয়ে পড়া পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর কল্যাণে এ ধরনের মানবিক ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।
সেনাবাহিনীর এমন উদ্যোগের ফলে পার্বত্য এলাকার অসহায় ও দরিদ্র মানুষের জন্য উন্নত চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে এবং একই সঙ্গে তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরে আসার পথও সুগম হচ্ছে। বিশেষ করে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার মাধ্যমে ছানি আক্রান্ত রোগীরা পুনরায় স্বাভাবিক ও কর্মক্ষম জীবনযাপন করতে পারবেন—এটাই এ উদ্যোগের অন্যতম প্রধান সাফল্য।