মো. ইব্রাহীম:
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো—এটি নিঃসন্দেহে একটি কঠিন এবং জনজীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলা সিদ্ধান্ত। কিন্তু এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে যে ক্ষোভ, সমালোচনা ও রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে, তার পুরো দায়কে শুধু ‘সরকারের ব্যর্থতা’ বলে ব্যাখ্যা করলে বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বাদ পড়ে যায়।
বরং বিএনপি সরকারের বড় দুর্বলতা অন্য জায়গায়—তারা কঠিন সিদ্ধান্তের প্রয়োজনীয়তা জনগণের কাছে যথেষ্ট দক্ষতা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে উপস্থাপন করতে পারছে না।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানি পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের চাপ বাংলাদেশসহ আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। একই সময়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের ওপরও বড় আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
অতএব, জ্বালানির দাম সমন্বয়ের পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারের বাস্তবতা যে একটি বড় কারণ—এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—সরকার সেই বাস্তবতাটি জনগণের কাছে কতটা পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করেছে?
একজন সাধারণ মানুষ যখন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখেন, রাতারাতি জ্বালানির দাম লিটারে ২০ টাকা বেড়ে গেছে, তখন তিনি আন্তর্জাতিক বাজারের চার্ট খুঁজবেন না। তিনি হিসাব করবেন—তার যাতায়াতের খরচ কত বাড়বে, বাজারে পণ্যের দাম কত বাড়তে পারে, পরিবারের মাসিক ব্যয়ের ওপর কতটা চাপ পড়বে।
রাষ্ট্র যদি সেই মানুষের প্রশ্নের উত্তর আগে থেকেই দিতে না পারে, তাহলে ক্ষোভ তৈরি হবেই।
এখানেই সরকারের জনসম্পর্কের দুর্বলতা সামনে আসে।
কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া সরকারের অধিকার; কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের বোঝা জনগণের ওপর চাপিয়ে দিয়ে ব্যাখ্যার দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ কোনো সরকারের নেই।
সরকারকে এখন স্পষ্ট করে বলতে হবে—আন্তর্জাতিক বাজারে কী পরিবর্তন হয়েছে, বাংলাদেশ কী দামে জ্বালানি কিনছে, রাষ্ট্র কতটা ভর্তুকি দিচ্ছে, কেন দাম বাড়াতে হলো এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে দাম কমানোর কোনো কাঠামো কী থাকবে।
কারণ জনগণ যুক্তি বুঝতে পারে। মানুষ সবসময় দাম কমানোর দাবি করেই থেমে থাকে না; তারা জানতে চায় কেন দাম বাড়ছে এবং রাষ্ট্র তাদের সুরক্ষায় কী করছে।
আর এখানেই দ্বিতীয় বড় প্রশ্ন—নিম্নআয়ের মানুষদের জন্য সরকারের প্রস্তুতি কোথায়?
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি শুধু পাম্পের দামের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব পড়ে পরিবহন, কৃষি, শিল্প, উৎপাদন ও পণ্য পরিবহনের খরচে। ফলে শেষ পর্যন্ত এর চাপ গিয়ে পড়ে সাধারণ ভোক্তার ওপর।
তাই সরকারের এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত প্রান্তিক ও নিম্নআয়ের মানুষের সুরক্ষায়।
সেবামুখী মন্ত্রণালয় ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হবে। প্রয়োজন হলে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষের জন্য সাময়িক সহায়তার ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে বাজারে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি, সিন্ডিকেট ও সুযোগসন্ধানী ব্যবসার বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
তবে এর সঙ্গে আরেকটি বিষয় অমোঘ সত্য—
দুর্নীতি বন্ধ না করে, অপচয় বন্ধ না করে এবং রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা না এনে জনগণের কাছ থেকে শুধু ত্যাগ দাবি করলে সেই ত্যাগের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করা কঠিন।
জনগণ যদি দেখে সরকার তাদের কাছ থেকে ত্যাগ চাইছে, অথচ সরকারি অর্থের অপচয়, দুর্নীতি কিংবা অনিয়মের বিরুদ্ধে যথেষ্ট দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেই, তাহলে সরকারের প্রতিটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তই সন্দেহ ও সমালোচনার মুখে পড়বে।
এই মুহূর্তে বিএনপি সরকারের সামনে তাই শুধু জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রশ্ন নেই; সামনে রয়েছে জনগণের আস্থা ধরে রাখার পরীক্ষা।
সরকারকে বুঝতে হবে—অর্থনীতি শুধু হিসাবের খাতা দিয়ে পরিচালিত হয় না; অর্থনীতির সঙ্গে মানুষের জীবন, অনুভূতি এবং প্রত্যাশাও জড়িত।
আন্তর্জাতিক বাজারের চাপ সরকার সৃষ্টি করেনি—এটি বাস্তবতা। কিন্তু সেই চাপের বোঝা কীভাবে মানুষের ওপর পড়বে, কারা সুরক্ষা পাবে, কোথায় অপচয় কমবে এবং রাষ্ট্র কীভাবে সংকট মোকাবিলা করবে—এসব সিদ্ধান্ত সরকারেরই।
সুতরাং এখন সরকারের সবচেয়ে জরুরি কাজ শুধু সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা নয়; সিদ্ধান্তের পেছনের হিসাব জনগণের সামনে খুলে দেওয়া।
কারণ একটি সরকার তখনই কঠিন সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে পারে, যখন জনগণ বিশ্বাস করে—সরকার তাদের কষ্ট বুঝছে, তাদের সঙ্গে কথা বলছে এবং সংকটের সময় তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছে।
জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়তো অর্থনৈতিক বাস্তবতার ফল। কিন্তু সেই বাস্তবতাকে জনগণের কাছে কীভাবে উপস্থাপন করা হবে—সেটিই এখন সরকারের রাজনৈতিক দক্ষতার পরীক্ষা।
এই পরীক্ষায় ব্যর্থ হলে সমস্যাটি শুধু জ্বালানির দামে সীমাবদ্ধ থাকবে না; তা ধীরে ধীরে সরকারের প্রতি জনআস্থার সংকটেও রূপ নিতে পারে।