মাত্র পাঁচ মাসের ব্যবধানে দ্বিতীয় দফা জ্বালানি তেলের দামবৃদ্ধি দেশের অর্থনীতিতে স্বাভাবিকভাবেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সেই সঙ্গে বাড়বে জনদুর্ভোগ। উল্লেখ্য, রোববার রাত ১২টা থেকে ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি একলাফে ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। নতুন দাম অনুযায়ী, ডিজেল ১৩৫ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এর আগে গত ১৮ এপ্রিলও সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছিল। সরকারের তরফ থেকে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামবৃদ্ধির কথা বলা হলেও নীতিনির্ধারকদের ভাবা উচিত ছিল-এই মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও সংকটের মুখে ঠেলে দেবে।
জ্বালানি বিভাগ ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) হিসাব অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে দামবৃদ্ধির ফলে বিপিসির দৈনিক লোকসান ১৩০ থেকে ১৩৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাসে সংস্থাটির মোট লোকসান প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এই বিপুল আর্থিক ক্ষতি সামাল দিতেই সরকার দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছে বলে যুক্তি দেখানো হচ্ছে। তবে প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রীয় এই ভর্তুকি বা লোকসানের পুরো চাপ কি সরাসরি সাধারণ মানুষের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়াটাই একমাত্র সমাধান ছিল? অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তেলের এই দামবৃদ্ধি দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের আঘাত হানবে। তাই সরকারের উচিত ছিল বিকল্প সমাধান খোঁজা।
মনে রাখা উচিত, জ্বালানি তেল সাধারণ কোনো পণ্য নয়; এটি পুরো পরিবহণ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ, কৃষি ও শিল্প খাতের চালিকাশক্তি। ডিজেল ও পেট্রোলের দাম বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়বে পণ্য পরিবহণ খরচ, বাস ও ট্রাকভাড়া এবং সেবামূল্যের ওপর। ফলে বাজারে সব ধরনের নিত্যপণ্যের দাম বাড়বে, যা সীমিত আয়ের এবং খেটে খাওয়া মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়কে আরও অসহনীয় করে তুলবে। বিশেষ করে সেচনির্ভর কৃষি খাত এবং গ্রামীণ অর্থনীতি এই মূল্যবৃদ্ধির কারণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। শিল্পের উৎপাদন ব্যয় এবং গ্যাস সংকটে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচও বাড়তে পারে। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের বিরোধের কূটনৈতিক সমাধানের আশায় আন্তর্জাতিক বাজারে এক সপ্তাহের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে জ্বালানি তেলের দাম। বৈশ্বিক এই ইতিবাচক প্রবণতাকে আমলে না নিয়ে অভ্যন্তরীণ বাজারে তেলের দাম বাড়িয়ে দেওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
আমরা মনে করি, বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু আমদানিনির্ভরতা ও লোকসানের হিসাব দেখিয়ে তেলের দাম ক্রমাগত বৃদ্ধি করা কোনো টেকসই সমাধান হতে পারে না। জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, দুর্নীতি রোধ এবং বিপিসির অভ্যন্তরীণ অপচয় হ্রাসের মাধ্যমে লোকসান কমানোর পথ খুঁজতে হবে। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে যখনই তেলের দাম কমতে শুরু করবে, সরকারের উচিত সেই বাজারদরের সঙ্গে দ্রুত ও যথাযথ সমন্বয় করে দেশের বাজারেও জ্বালানি তেলের দাম কমিয়ে আনা। জনগণের কষ্ট লাঘবে এবং দেশের অর্থনীতিকে সম্ভাব্য বড় ধাক্কা থেকে রক্ষা করতে সরকারের নীতিনির্ধারকরা দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে, এটাই প্রত্যাশা।