শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৬ মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
১০ শাবান, ১৪৪৭ হিজরি

খালেদা জিয়া : মাদার অব ডেমোক্রেসি ও এক অবিনাশী মহাকাব্য

জাহিদ ইকবাল : বাংলাদেশের রাজনৈতিক দিগন্তের এক মহাজাগতিক নক্ষত্রের পতন ঘটেছে। আজ যেন মহাকালের সূর্য এক বিষণ্ণ সন্ধ্যায় অস্তমিত। বাংলাদেশের তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিদায় কেবল একটি প্রাণস্পন্দনের অবসান নয়; বরং এটি একটি জীবন্ত ইতিহাসের প্রস্থান, একটি দীর্ঘ সংগ্রামের সমাপ্তি এবং কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে প্রোথিত এক গভীর আশার অবসান। তিনি কেবল একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন না; তিনি ছিলেন বাংলাদেশের গণতন্ত্রের মানসকন্যা, এক অকুতোভয় নারী এবং আত্মমর্যাদার এক অবিনাশী প্রতীক।

১৯৮১ সালের ৩০ মে। চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নিথর দেহ পড়ে থাকার খবর যখন ঢাকায় পৌঁছাল, তখন ৩২ বছরের এক গৃহবধূর পৃথিবী ওলটপালট হয়ে গিয়েছিল। কোলে দুই শিশু সন্তান—তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকো। ব্যক্তিগত শোকের সেই হিমালয়সম পাহাড়কে জয় করে তিনি রাজনীতিতে পা রাখলেন এমন এক সময়ে, যখন দল ছিন্নভিন্ন আর দেশ সামরিক জান্তার কবলে। যিনি কোনোদিন জনসভায় ভাষণ দেননি, সেই সাধারণ গৃহবধূ রাজপথের ধুলোবালিতে নেমে এলেন। সামরিক শাসক এরশাদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া চষে বেড়ালেন তিনি। বারবার গৃহবন্দি হয়েছেন, বারবার কারাবরণ করেছেন, কিন্তু আপস করেননি। তাঁর সেই বজ্রকণ্ঠ—”আমি জনগণের কাতারে আছি, থাকব”—তাঁকে আপসহীন নেত্রী হিসেবে ইতিহাসে অমর করে দেয়। নয় বছরের দীর্ঘ স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তিনি ছিলেন গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের মূল চালিকাশক্তি।

১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারি। এক ঐতিহাসিক নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি বাংলাদেশের প্রথম এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রনায়কসুলভ কৃতিত্ব ছিল ক্ষমতার মোহ ত্যাগ করে রাষ্ট্রপতি শাসনব্যবস্থা বাতিল করে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রবর্তন করা। তিনি নিজের হাতে থাকা একচ্ছত্র ক্ষমতা জনগণের প্রতিনিধিদের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। এটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে গণতন্ত্রের এক নতুন সূর্যোদয়। বেগম জিয়ার শাসনামল মানেই ছিল এক নীরব সামাজিক বিপ্লব। তিনি অনুধাবন করেছিলেন, অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারীকে অন্ধকারে রেখে জাতি এগোতে পারে না। তাই তিনি মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত মেয়েদের অবৈতনিক শিক্ষা ও উপবৃত্তি প্রথা চালু করেন। আজ বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামে যে শিক্ষিত নারীবাহিনী কাজ করছে, তার ভিত্তিপ্রস্তর তিনিই স্থাপন করেছিলেন। * বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা: নিরক্ষরতা দূর করতে তিনি ঘরে ঘরে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়ার ব্রত নিয়েছিলেন। * ডাল-ভাত কর্মসূচি: সাধারণ মানুষের মুখে হাসি ফোটানোই ছিল তাঁর অর্থনীতির মূল লক্ষ্য। * বিপ্লবী অবকাঠামো: যমুনা বহুমুখী সেতুর (বঙ্গবন্ধু সেতু) মতো মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়নের মাধ্যমে তিনি উত্তরবঙ্গকে ঢাকার সাথে সংযুক্ত করে অর্থনীতির গতিপথ বদলে দিয়েছিলেন। বেগম খালেদা জিয়ার দেশপ্রেম কেবল বক্তৃতায় ছিল না, ছিল তাঁর রক্তে।

২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেনের সময় যখন তাঁকে দেশ ছাড়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, তখন তিনি অটল কণ্ঠে বলেছিলেন—”বিদেশে আমার কোনো ঠিকানা নেই, এই দেশই আমার জন্মভূমি, এই দেশই আমার শেষ শয্যা।” নিজের দুই ছেলেকে নির্যাতন হতে দেখেছেন, বিদেশের মাটিতে ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর অকাল মৃত্যুতে পাথরচাপা শোক সয়েছেন, তবুও তিনি দেশের মাটির মায়া ত্যাগ করেননি। এই যে ত্যাগের মহিমা, তা আধুনিক বিশ্ব রাজনীতিতে বিরল। জীবনের শেষ সায়াহ্নে এসেও তাঁকে চরম অগ্নিপরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। রাজধানীর নাজিমুদ্দিন রোডের পরিত্যক্ত কারাগারের স্যাঁতসেঁতে কক্ষে বছরের পর বছর বন্দি থেকেছেন তিনি। শারীরিক অসুস্থতা তাঁকে জীর্ণ করলেও তাঁর মনোবল ছিল অটুট। বিদেশের উন্নত চিকিৎসা বনাম দেশীয় চিকিৎসা—এই দ্বন্দ্বে তিনি বারবার তাঁর দৃঢ়তা দেখিয়েছেন। তিনি মাথা নত করেননি কোনো অন্যায়ের কাছে, কোনো শক্তির কাছে। বেগম খালেদা জিয়া কেবল একটি রাজনৈতিক দলের নেত্রী ছিলেন না, তিনি ছিলেন ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর প্রাণভোমরা। তিনি শিখিয়েছেন কীভাবে আত্মমর্যাদা নিয়ে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হয়। তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপে প্রতিফলিত হতো বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা আর জনগণের অধিকার আদায়ের তৃষ্ণা। ব্যক্তি খালেদা জিয়া আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর আদর্শ বাংলাদেশের ধূলিকণায় মিশে আছে। যতক্ষণ এই বাংলার মানচিত্র থাকবে, যতক্ষণ এ দেশের মানুষ গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করবে, ততক্ষণ তিনি ফিরে আসবেন প্রেরণা হয়ে। তিনি কোনো নির্দিষ্ট দলের নন, তিনি ইতিহাসের। আকাশের ধ্রুবতারার মতো তিনি চিরকাল পথ দেখাবেন এই দেশ ও জাতিকে। বিদায় দেশনেত্রী! আপনি হার মানেননি, আপনি কেবল মহাকালের পাতায় নিজের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখে অনন্তের পথে যাত্রা করেছেন।

লেখক পরিচিতি : সিনিয়র সাংবাদিক ও সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন।