শনিবার, ৩১ জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৭ মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
১১ শাবান, ১৪৪৭ হিজরি

পোস্টাল ভোটে প্রবাসীদের অংশগ্রহণে বদলাতে পারে ফলাফল

নিজস্ব প্রতিবেদক : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিতে নিবন্ধন করেছেন ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮২ জন ভোটার। তাঁদের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই প্রবাসী বাংলাদেশি। এবারই প্রথমবারের মতো প্রবাসীরা ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার নিবন্ধনে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি সাড়া পাওয়া গেছে।

কিছু আসনে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে নিবন্ধনকারীর সংখ্যা ১০ হাজারের বেশি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এসব আসনে জয়-পরাজয়ের নির্ধারক হতে পারে পোস্টাল ব্যালট।

তফসিল অনুযায়ী আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন কমিশন (ইসি) ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ নামের অ্যাপের মাধ্যমে দেশ-বিদেশের ভোটারদের নিবন্ধন সম্পন্ন করে। সরকারি কর্মচারী, ভোট গ্রহণ কর্মকর্তা, কারাগারের কয়েদি এবং বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিরা এই অ্যাপে নিবন্ধন করেন। একাধিকবার সময় বাড়িয়ে শেষ পর্যন্ত ৫ জানুয়ারি নিবন্ধন কার্যক্রম শেষ হয়। দেশ থেকে নিবন্ধন করেছেন ৭ লাখ ৬১ হাজার ১৪০ জন এবং বিদেশ থেকে ৭ লাখ ৭২ হাজার ৫৪২ জন প্রবাসী।

ইসির ওয়েবসাইট অনুযায়ী, জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ১৮টিতে ১০ হাজারের বেশি ভোটার পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে নিবন্ধন করেছেন। ৯৭টি আসনে নিবন্ধনকারীর সংখ্যা ৫ হাজার থেকে ১০ হাজারের মধ্যে এবং ১৮৫টি আসনে ৫ হাজারের কম।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ বলেন, যেসব আসনে পোস্টাল ব্যালটের নিবন্ধন বেশি, সেগুলোতে পোস্টাল ভোট ডিসাইডিং ফ্যাক্টর হতে পারে। তবে সব ভোট একদিকে যাবে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন।

নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, অনেক আসনে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয় খুব কম ভোটের ব্যবধানে। কখনো ৫-১০ ভোটের ব্যবধানেও ফলাফল পাল্টে যায়। সেখানে প্রবাসীদের ভোট জয়-পরাজয়ের নিয়ামক হিসেবে কাজ করতে পারে।

দেশে পোস্টাল ভোটের নিয়ম পুরোনো হলেও অতীতে তা আলোচনায় আসেনি। সরকারি কর্মকর্তা ও নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা কর্মচারী এবং কারাগারের কয়েদিদের জন্য এ সুযোগ থাকলেও প্রচার না থাকায় তেমন ব্যবহার হয়নি। এবার আইন সংশোধনের মাধ্যমে প্রবাসীদের ভোটাধিকারের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

প্রবাসীরা প্রথমবার ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়ে আনন্দ প্রকাশ করেছেন। যুক্তরাজ্যের শিক্ষার্থী তাহিম আমানত খান বলেন, বিদেশে থেকেও ভোট দিতে পারব—এটি আমার জীবনের প্রথম ভোট। মালয়েশিয়ার শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ আবিরও একই অনুভূতি প্রকাশ করেছেন।

মালয়েশিয়া প্রবাসী আরিফুল ইসলাম বলেন, পোস্টাল ভোট প্রবাসীদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। একই সঙ্গে অনেকের জাতীয় পরিচয়পত্র সমস্যারও সমাধান হয়েছে।

সবচেয়ে বেশি নিবন্ধন হয়েছে ফেনী-৩ আসনে, ১৬ হাজার ৯৩ জন। চট্টগ্রাম-১৫ আসনে ১৪ হাজার ৩০১ জন, কুমিল্লা-১০ আসনে ১৩ হাজার ৯৭৭ জন, নোয়াখালী-১ আসনে ১৩ হাজার ৬৫৮ জন, নোয়াখালী-৩ আসনে ১২ হাজার ৮২৯ জন, ফেনী-২ আসনে ১২ হাজার ৭৯৭ জন, কুমিল্লা-১১ আসনে ১২ হাজার ৫৮৩ জন, সিলেট-১ আসনে ১২ হাজার ৪৫৮ জন, কুমিল্লা-৫ আসনে ১২ হাজার ৩৭৩ জন, কুমিল্লা-৬ আসনে ১১ হাজার ৯৪৩ জন, চাঁদপুর-৫ আসনে ১১ হাজার ৮৫২ জন এবং নোয়াখালী-৫ আসনে ১১ হাজার ৬৭৫ জন। সবচেয়ে কম নিবন্ধন হয়েছে বাগেরহাট-৩ আসনে, ১ হাজার ৫৯৫ জন। প্রবাসীদের মধ্যে সৌদি আরব থেকে সর্বোচ্চ ২ লাখ ৩৯ হাজার ১৮৬ জন নিবন্ধন করেছেন। এরপর মালয়েশিয়া থেকে ৮৪ হাজার ২৯২ এবং কাতার থেকে ৭৬ হাজার ১৩৯ জন।

অতীতের নির্বাচনে দেখা গেছে, ২০-৩০টি আসনে ফলাফল নির্ধারণ হয়েছে ৫ হাজার ভোটে। অনেক আসনে ১০ হাজার ভোটের ব্যবধানেই জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়েছে। ফলে এবার প্রবাসীদের ভোট অনেক আসনের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে পোস্টাল ব্যালট সঠিকভাবে প্রয়োগ হলে তা অনেক আসনের ফলাফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তবে কিছু প্রবাসী আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, তাঁদের ভোটের গোপনীয়তা রক্ষা হবে কি না। ইসি জানিয়েছে, ভোটারদের শতভাগ সুরক্ষা দেওয়া হবে এবং রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে ব্যালট পৌঁছানোর তথ্য জানার সুযোগ থাকবে।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, পোস্টাল ভোটের একাধিক ধাপ আছে। সেগুলো সঠিকভাবে প্রয়োগ না হলে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। কারসাজির অভিযোগও উঠতে পারে। তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন, নির্বাচন কমিশন সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করবে।

ইসির পক্ষ থেকে নিবন্ধনকারী প্রবাসীদের ফিরতি খামসহ নির্বাচনী প্রতীক ও গণভোটের ব্যালট পাঠানো হচ্ছে। ইতিমধ্যে অনেক প্রবাসী পোস্টাল ব্যালট পাওয়ার কথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন।

রেইনট্রি সফটওয়্যার মালয়েশিয়ার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, একজন রেমিট্যান্স যোদ্ধা হিসেবে দেশের উন্নয়নে সরাসরি অংশগ্রহণ করতে পারছি—এটি আমাদের জন্য রাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠ সম্মান।

সলিডব্রেইন টেক এসডিএন বিএইচডি-মালয়েশিয়ার সিইও ফয়সাল আহমেদ বলেন, ভোট শুধু একটি কাগজে সিল মারা নয়; এটি একটি স্বপ্নের প্রতি সমর্থন, একটি ভবিষ্যতের পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত।