বিশেষ প্রতিনিধি : ঢাকায় চাকরিজীবী ছেলে, তাঁর স্ত্রী ও একমাত্র সন্তানকে নিয়ে ব্যস্ত জীবনে কাটছিল দিন। গ্রামের বাড়ি কুমিল্লায় থাকা বাবা খোরশেদুল আলম তাই গতকাল মুঠোফোনে ছেলেকে বলেছিলেন— স্ত্রী–সন্তান নিয়ে অন্তত এক সপ্তাহের জন্য বাড়িতে আসতে। কিন্তু ব্যস্ততার কারণে রাজি হননি ছেলে।
শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) সকালে সেই ছেলেই আর নেই। রাজধানীর উত্তরায় আবাসিক ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন খোরশেদুল আলমের একমাত্র ছেলে ফজলে রাব্বি, তাঁর স্ত্রী আফরোজা আক্তার ও তাঁদের আড়াই বছরের শিশু সন্তান মো. রিশান। একই ঘটনায় মোট ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে।
ফজলে রাব্বি কর্মরত ছিলেন এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডে, আর তাঁর স্ত্রী আফরোজা কাজ করতেন স্কয়ার গ্রুপে। শুক্রবার সকাল পৌনে আটটার দিকে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের ১৮ নম্বর সড়কের যে ভবনে আগুন লাগে, তার পঞ্চম তলায় থাকতেন তাঁরা।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, আগুনের সূত্রপাত হয় ভবনের দোতলায়। দ্রুত তা ছড়িয়ে পড়ে তৃতীয় তলায়। এই দুই তলার বাসিন্দারা প্রাণে বাঁচলেও ধোঁয়া ওপরের দিকে উঠে পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলার ছয়জনের মৃত্যু হয়। ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারা জানান, আগুন বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শুক্রবার বিকেলে উত্তরা বড় মসজিদে ফজলে রাব্বি, তাঁর স্ত্রী ও সন্তানের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। মরদেহ অ্যাম্বুলেন্সে তোলার সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন বাবা খোরশেদুল আলম। তিনি বলেন, “ছেলেটা পরিবারসহ চলে গেল, আমি কিছুই করতে পারলাম না।”
খোরশেদুল আলম জানান, তাঁর একমাত্র ছেলে ফজলে রাব্বি ছাড়া আর একটি মেয়ে আছে, যার বিয়ে হয়ে গেছে। স্ত্রীকে নিয়ে তিনি গ্রামের বাড়িতে থাকেন। ছেলে–নাতি দুজনই মারা যাওয়ায় পরিবারে আর আলো জ্বালানোর মতো কেউ রইল না। তিনি বলেন, গতকাল ছেলেকে কুমিল্লায় আসতে বলেছিলেন, কিন্তু ব্যস্ততার কারণে রাজি হয়নি। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, “কুমিল্লায় গেলে হয়তো পরিবারসহ মৃত্যুর সংবাদটা শুনতে হতো না।”
আত্মীয় জিয়াদ জানান, ছেলের মৃত্যুর খবর শুনে ফজলে রাব্বির মা শোকে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন। একসঙ্গে পরিবারের তিন সদস্য হারিয়ে বাকিরাও ভেঙে পড়েছেন। আফরোজার পরিবারও উত্তরা এলাকায় থাকে। এ ঘটনায় তাঁর বাবা–মা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন আফরোজার বোন আফরিন জাহান।
খোরশেদুল আলম জানান, নিহত ফজলে রাব্বি, তাঁর স্ত্রী ও সন্তানকে আগামীকাল তাঁদের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার চিওড়ায় দাফন করা হবে।
এই অগ্নিকাণ্ডে ভবনের ষষ্ঠ তলায় থাকা অপর একটি পরিবারের আরও তিনজন প্রাণ হারিয়েছেন। তাঁরা হলেন মো. হারিস (৫২), তাঁর ছেলে মো. রাহাব (১৭) ও ভাতিজি রোদেলা আক্তার (১৭)।