মুক্তবাণী রিপোর্ট : বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর একটি নাটকীয় অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। প্রায় ১৭ বছরের প্রবাসজীবন শেষে দেশে ফিরে বিএনপির নেতৃত্বের আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব গ্রহণ, নির্বাচনি লড়াইয়ে সরাসরি অংশগ্রহণ এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য— সবমিলিয়ে তারেক রহমান এখন দেশের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের ভূমিধস ফলাফল বলছে, তিনিই বাংলাদেশের সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী। এর মধ্য দিয়ে গড়ে উঠবে তার নেতৃত্বের নতুন অধ্যায়।
উত্তরাধিকার থেকে একক নেতৃত্ব:
তারেক রহমানের রাজনৈতিক পরিচয়ের শুরু পারিবারিক ঐতিহ্যের ভেতর দিয়ে। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের পুত্র এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সন্তান হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন ধরেই দলের ভেতরে প্রভাবশালী নেতা। তবে এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। খালেদা জিয়ার মৃত্যু ও দীর্ঘ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার পর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দলের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন।
লন্ডন থেকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করলেও দেশে ফেরার পর তার নেতৃত্ব দৃশ্যমান ও সরাসরি রূপ পায়। স্থায়ী কমিটির সভায় আনুষ্ঠানিক অভিষেকের মধ্য দিয়ে বিএনপি কার্যত একক নেতৃত্বে প্রবেশ করে। দলের ভেতরে সম্ভাব্য বিভাজন বা দ্বৈত নেতৃত্বের প্রশ্ন আপাতত স্তিমিত হয়েছে।
নির্বাসনের রাজনীতি ও প্রত্যাবর্তন:
২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেফতার এবং পরবর্তী সময়ে লন্ডনে অবস্থান— তারেক রহমানের রাজনৈতিক জীবনের বড় অধ্যায়। প্রায় দেড় বছর কারাবাসের পর বিদেশে চলে যাওয়া অনেকের কাছে রাজনৈতিক পশ্চাদপসরণ মনে হলেও বাস্তবে সেটি ছিল দূরবর্তী নেতৃত্বের এক পরীক্ষা।
বিদেশে অবস্থান করেও তিনি দলীয় সিদ্ধান্ত, সাংগঠনিক পুনর্গঠন এবং তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, ভার্চুয়াল সভা ও সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে বিএনপিকে সক্রিয় রাখার কৌশল নিয়েছেন। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে ফেরার সিদ্ধান্তটি ছিল রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ, কিন্তু সময়োপযোগী। খালেদা জিয়ার অসুস্থতা ও মৃত্যু, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের পরিবর্তন এবং নির্বাচনের প্রস্তুতি— সবমিলিয়ে প্রত্যাবর্তন ছিল এক কৌশলগত পদক্ষেপ।
ক্ষমতার সমীকরণ:
সম্প্রতি ডয়চে ভেলেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন যে, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন সুষ্ঠু হবে এবং জনগণের রায়ে বিএনপি এককভাবে সরকার গঠন করতে পারবে। নির্বাচনের ফলাফলে বিএনপি উল্লেখযোগ্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করায় সেই আশাবাদ বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ঢাকা-১৭ ও বগুড়া-৬ আসনে তার জয় প্রতীকী গুরুত্ব বহন করে। একদিকে রাজধানীর কূটনৈতিক ও অভিজাত এলাকা, অন্যদিকে তার পারিবারিক রাজনৈতিক ভিত্তি বগুড়া; এই দুই আসনে বিজয় তাকে জাতীয় ও আঞ্চলিক উভয় ক্ষেত্রেই শক্ত অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে।
সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত হলে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী দলীয় প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথ তার জন্য উন্মুক্ত। তবে ক্ষমতায় আসা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন; কীভাবে তিনি সরকার পরিচালনা করবেন এবং দলীয় ঐক্য বজায় রাখবেন।
ক্ষমতায় গেলে তার প্রথম চ্যালেঞ্জ হবে রাজনৈতিক বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতা আরও সুসংহত করা। বিরোধীদলগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং আইনের শাসন নিশ্চিতের প্রশ্নে তার অবস্থান গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ হবে।
দলীয় ঐক্য ও নতুন প্রজন্মের রাজনীতি:
বিএনপির সামনে এখন দ্বৈত চ্যালেঞ্জ, একদিকে সরকার পরিচালনা, অন্যদিকে সংগঠনকে আধুনিক ও কার্যকর রাখা। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের রাজনীতি থেকে প্রশাসনিক দায়িত্বে রূপান্তর সবসময় সহজ নয়। তরুণ ভোটারদের প্রত্যাশা, ডিজিটাল যুগের স্বচ্ছতা এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতা— এসব বিবেচনায় দলকে নতুন ধারায় পরিচালিত করতে হবে।
তারেক রহমান যদি দলকে ব্যক্তিনির্ভর কাঠামো থেকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় রূপান্তর করতে পারেন, তবে তার নেতৃত্ব দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যথায় ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতির পুনরাবৃত্তি ফের বিতর্ক ডেকে আনতে পারে বলে মনে করছেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা।
এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা:
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নির্বাসন শেষে প্রত্যাবর্তন করে নেতৃত্বের শীর্ষে ওঠার নজির বিরল নয়, তবে প্রতিটি প্রেক্ষাপট আলাদা। তারেক রহমানের ক্ষেত্রে এটি কেবল পারিবারিক উত্তরাধিকার নয়; বরং দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াই, বিতর্ক, অনুপস্থিতি এবং প্রত্যাবর্তনের সমন্বয়ে গঠিত এক জটিল বাস্তবতা।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফল তাকে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এখন নজর থাকবে, কীভাবে তিনি ক্ষমতার ব্যবহারে পরিমিতি, নীতি-অঙ্গীকারে দৃঢ়তা এবং রাজনৈতিক সহনশীলতার উদাহরণ স্থাপন করেন।
‘নির্বাসন থেকে ফিরে ক্ষমতার কেন্দ্রে’— এই যাত্রা যতটা নাটকীয়, সামনে পথ ততটাই কঠিন। ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে তারেক রহমানের নেতৃত্ব বাংলাদেশের রাজনীতিকে কোন দিকে নিয়ে যাবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।