আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হয়েছেন। প্রায় চার দশক ধরে ইসলামিক রিপাবলিক শাসন করা এ নেতার মৃত্যুতে দেশটিকে এখন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি হতে হচ্ছে, কারণ বর্তমানে তার কোনো নির্ধারিত উত্তরসূরি নেই।
স্থানীয় সময় রবিবার (১ মার্চ) ভোরে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ইরনা ৮৬ বছর বয়সী এই নেতার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে।
এর কয়েক ঘণ্টা আগে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার মৃত্যুর ঘোষণা দিয়ে বলেন, এটি ইরানি জনগণের জন্য দেশ ‘পুনরুদ্ধারের সর্বোত্তম সুযোগ’। তিনি ইরানিদের এই শাসনতন্ত্রকে উৎখাত করারও আহ্বান জানান।
খামেনির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তেহরানের কিছু এলাকার বাসিন্দাদের ছাদের ওপর গিয়ে আনন্দ প্রকাশ করতেও দেখা গেছে।
তার মৃত্যু এমন এক সময়ে হলো যখন খামেনির নেতৃত্বের ওপর বছরের পর বছর ধরে চাপ বাড়ছিল। ক্ষমতার শেষ প্রদর্শন হিসেবে তিনি তার শাসনের সবচেয়ে ভয়াবহ দমন-পীড়নের তদারকি করেছিলেন, যার উদ্দেশ্য ছিল দেশব্যাপী বিক্ষোভ দমন করা। সেই বিক্ষোভে আন্দোলনকারীরা সরাসরি ‘খামেনির মৃত্যু চাই’ বলে স্লোগান দিয়েছিলেন।
শনিবারের হামলার প্রাথমিক লক্ষ্যবস্তুগুলোর মধ্যে তার কম্পাউন্ড ছিল বলে জানা গেছে। তবে এর আগেও খামেনি প্রচণ্ড চাপের মধ্যে ছিলেন। গত এক বছর ধরে ট্রাম্প সতর্ক করেছিলেন যে, তিনি চাইলে ইরানি নেতাকে হত্যা করতে পারেন।
সাম্প্রতিক সময়ে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চাপ দিতে এই অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি করছিল, তখন খামেনি হামলা ঠেকানোর চেষ্টা করেছিলেন। তিনি সতর্ক করেছিলেন যে, যেকোনো মার্কিন হামলা আঞ্চলিক যুদ্ধ ডেকে আনবে। একইসঙ্গে তিনি ওয়াশিংটনের সঙ্গে পারমাণবিক কার্যক্রম নিয়ে আলোচনায় বসার অনুমতিও দিয়েছিলেন।
তবে বছরের পর বছর ধরে চলা নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা এবং দুর্নীতি আগে থেকেই ইরানের অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করে দিয়েছিল। এরপর সাম্প্রতিক বিক্ষোভে তার কঠোর দমন-পীড়ন জনরোষ আরও স্পষ্ট করে তোলে।
গত বছর ইসরায়েলি এবং মার্কিন হামলায় ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এবং সামরিক সক্ষমতা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি ও মার্কিন হামলায় গাজার হামাস, লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের নিয়ে গঠিত ইরানের আঞ্চলিক মিত্র নেটওয়ার্কও দুর্বল হয়ে পড়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইরানের প্রভাব কমিয়ে দিয়েছে।
ইসলামিক রিপাবলিকে রূপান্তর
১৯৮৯ সালে খামেনি যখন ক্ষমতায় বসেন, তখন তার কর্তৃত্ব নিয়ে অনেকের মনে সন্দেহ ছিল। সে সময় তিনি তুলনামূলকভাবে ছোটমানের আলেম ছিলেন এবং তার পূর্বসূরী আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মতো ধর্মীয় উচ্চতা তার ছিল না। তা সত্ত্বেও, খামেনি খোমেনির চেয়ে অনেক বেশি সময় শাসন করেছেন এবং দেশটির ওপর আরও গভীর প্রভাব রেখে গেছেন।
তিনি ধর্মীয় পরিষদের শাসনকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন এবং রাজনৈতিক পদমর্যাদার শীর্ষে শিয়া মুসলিম আলেমদের অবস্থান নিশ্চিত করেছিলেন।
কট্টরপন্থিদের কাছে খামেনি ছিলেন চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী, মর্যাদায় যার স্থান ছিল ঈশ্বরের পরেই। এছাড়া তিনি আধাসামরিক বাহিনী রেভল্যুশনারি গার্ডকে ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেন। সামরিক এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতি উভয় ক্ষেত্রেই এই বাহিনীর আধিপত্য রয়েছে। এর বিনিময়ে তারা খামেনির সবচেয়ে বিশ্বস্ত রক্ষক হিসেবে কাজ করেছে।
অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জসমূহ
খামেনির ক্ষমতার ওপর প্রথম গুরুতর চ্যালেঞ্জ আসে সংস্কারবাদী আন্দোলনের সময়। তবে খামেনি আলেম সমাজকে সংগঠিত করেন এবং অনির্বাচিত সংস্থাগুলোর মাধ্যমে সংস্কার বাধাগ্রস্ত করেন।
২০০৯ সালের নির্বাচনে ভোট কারচুপির অভিযোগে দেশব্যাপী বিশাল বিক্ষোভ শুরু হয়। নিষেধাজ্ঞার ভারে ২০১৭ এবং ২০১৯ সালে অর্থনৈতিক বিক্ষোভও ছড়িয়ে পড়ে। ২০২২ সালে মাহশা আমিনির মৃত্যুর পর আরও বিক্ষোভ দেখা দেয়।
প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিরাপত্তারক্ষীদের কঠোর দমন-পীড়নে শত শত মানুষ নিহত হয় এবং ব্যাপক গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটে।
সাম্প্রতিক দমন-পীড়ন
সাম্প্রতিক বিক্ষোভ শুরু হয় গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে তেহরানের প্রধান বাজারে, যখন ইরানি মুদ্রা রিয়ালের মান মার্কিন ডলারের বিপরীতে রেকর্ড ১ কোটি ৪২ লাখে নেমে আসে।
খামেনি তখন ঘোষণা করেছিলেন, দাঙ্গাকারীদের তাদের উপযুক্ত শিক্ষা দিতে হবে। ৮ ও ৯ জানুয়ারির বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনী সরাসরি গুলি চালায়।
আন্দোলনকারীদের মতে, গুলিতে নিহতের সংখ্যা ৭ হাজার ছাড়িয়ে গেছে, যদিও সরকার ৩ হাজার জনের বেশি মৃত্যুর কথা স্বীকার করেছে।
পারমাণবিক আলোচনা
পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় সম্মত হয়ে খামেনি মূলত মার্কিন হামলা ঠেকানোর জন্য সময়ক্ষেপণ করতে চেয়েছিলেন। তবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করা এবং মজুত হস্তান্তর করার মতো ওয়াশিংটনের মূল দাবিগুলো তেহরান প্রত্যাখ্যান করেছিল।
ট্রাম্প প্রথমে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের হত্যা বন্ধে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন এবং পরে সেই হুমকি ব্যবহার করেই ইরানকে আলোচনায় বসতে বাধ্য করার চেষ্টা করেন।
কোনো উত্তরসূরি নেই
ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, শিয়া আলেমদের একটি কাউন্সিল পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করার দায়িত্বে রয়েছে। খামেনির ছেলেসহ বেশ কয়েকজনের নাম আলোচনায় এলেও কেউই আনুষ্ঠানিকভাবে মনোনীত হননি।
ইসরায়েলের নিরাপত্তা গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের ইরান বিশেষজ্ঞ ড্যানি সিট্রিনোভিচ বলেন, খামেনি মৃত্যুর পরে ক্ষমতার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা জরুরি। প্রয়োজন হলে ক্ষমতা সাময়িকভাবে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের ছোট কমিটিতে স্থানান্তরিত হতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, খামেনি হয়তো রুদ্ধদ্বার বৈঠকে কোনো উত্তরসূরির নাম নির্দেশ করে গেছেন।
তবে যুদ্ধের এই সংকটময় সময়ে উত্তরসূরি নির্বাচন নিয়ে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও ক্ষমতার লড়াই শুরু হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে অত্যন্ত শক্তিশালী রেভল্যুশনারি গার্ড সরাসরি ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করতে পারে, যা প্রায় সাড়ে ৮ কোটি মানুষের এই খনিজ তেলসমৃদ্ধ দেশে ভয়াবহ সংঘাতের সৃষ্টি করতে পারে।