নিজস্ব প্রতিবেদক : আসন্ন ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে রাজধানীর সদরঘাটে ঢাকা নদীবন্দর ঘিরে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এবারের ঈদে সদরঘাট হয়ে দেশের দক্ষিণাঞ্চলসহ বিভিন্ন জেলায় প্রায় ৮ থেকে ১০ লাখ মানুষ নদীপথে বাড়ি ফিরবেন বলে আশা প্রকাশ করছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। এই বিশাল যাত্রীচাপ সামাল দিতে নিরাপত্তা জোরদার, লঞ্চের ফিটনেস যাচাই, অতিরিক্ত যাত্রীসেবা এবং বিকল্প ঘাট চালুসহ নানা পদক্ষেপ নিয়েছে তারা ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।
সোমবার (১৬ মার্চ) সকাল থেকে সরেজমিনে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল এলাকায় দেখা যায়, ঈদযাত্রাকে কেন্দ্র করে পন্টুন সংস্কার ও বিভিন্ন অবকাঠামোগত প্রস্তুতিতে ব্যস্ত বন্দর কর্তৃপক্ষ। গুরুত্বপূর্ণ স্থানে জরুরি সেবার হেল্পলাইন নম্বর টানানো হয়েছে। কোন ঘাট থেকে কোন এলাকার লঞ্চ ছাড়বে সে সম্পর্কেও নির্দেশনা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন স্থানে।
দিনভর যাত্রীদের উপস্থিতি থাকলেও বিকেল ও সন্ধ্যার দিকে ভিড় বাড়তে দেখা যায়। নিরাপত্তা কর্মীদের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো।
অন্যদিকে লঞ্চগুলো ধুয়ে-মুছে প্রস্তুত করছেন মালিকপক্ষের কর্মীরা। যাত্রী ডাকাডাকিও চলতে দেখা যায় বিভিন্ন পন্টুনে।
বিকল্প দুই ঘাটে বিশেষ লঞ্চ সার্ভিস
সদরঘাটে অতিরিক্ত যাত্রীচাপ কমাতে এবং যাতায়াত সহজ করতে এ বছর ঈদযাত্রায় দুটি বিকল্প ঘাট চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বছিলা ব্রিজ সংলগ্ন লঞ্চঘাট এবং পূর্বাচল কাঞ্চন ব্রিজ সংলগ্ন শিমুলিয়া ট্যুরিস্ট ঘাট থেকে বিশেষ লঞ্চ সার্ভিস চালু থাকবে।
নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে জানা গেছে, আগামীকাল মঙ্গলবার থেকে ঈদের আগের দিন পর্যন্ত বছিলা ঘাট থেকে ছয়টি এবং শিমুলিয়া ট্যুরিস্ট ঘাট থেকে তিনটি বিশেষ লঞ্চ বিভিন্ন নৌ-পথে যাত্রী পরিবহন করবে।
ফ্রি কুলি সেবা ও হুইলচেয়ার সুবিধা
ঈদযাত্রায় যাত্রীদের সেবা বাড়াতে বিশেষ কিছু উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। আগামীকাল (মঙ্গলবার) থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত ১২ দিন টার্মিনাল থেকে লঞ্চ পর্যন্ত যাত্রীদের মালামাল বহনে বিনামূল্যে কুলি বা পোর্টার সেবা দেওয়া হবে। এজন্য ২০০ স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ দিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ।
এছাড়া অসুস্থ, প্রবীণ ও শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী যাত্রীদের সুবিধার্থে সদরঘাট ও বরিশাল নদীবন্দরে হুইলচেয়ার সেবার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
কথা হয় বরগুনাগামী যাত্রী মো. আব্দুল হালিমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ঈদের সময় ঘাটে অনেক ভিড় থাকে। তখন বয়স্ক মানুষ ও বেশি মালামাল নিয়ে চলাচল করা বেশ কষ্টকর হয়ে যায়। কর্তৃপক্ষ যদি বিনামূল্যে কুলি ও হুইলচেয়ার সেবা দেয়, তাহলে যাত্রীদের জন্য এটি খুবই সহায়ক হবে। বিশেষ করে বৃদ্ধ ও অসুস্থ যাত্রীদের ভোগান্তি অনেকটা কমবে বলে তিনি মনে করেন।
কুলি হয়রানি বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা
সদরঘাটে যাত্রীদের অন্যতম অভিযোগ কুলি হয়রানি। এবার নির্দিষ্ট পোশাক পরিহিত অনুমোদিত কুলিদের মাধ্যমে সেবা দেওয়া হবে। অন্য কোনো ব্যক্তি কুলি হিসেবে কাজ করতে পারবেন না।
বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, যাত্রীদের জন্য ট্রলি সেবার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। যাত্রীরা চাইলে নিজেরাই ট্রলি ব্যবহার করে মালামাল বহন করতে পারবেন। অসুস্থ বা বয়স্ক যাত্রীদের সহায়তায় প্রশিক্ষিত ক্যাডেটদেরও দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
বরিশালগামী যাত্রী আবদুল কাদের বলেন, ঈদের সময় ঘাটে কুলিদের নিয়ে অনেক সময় ঝামেলা হয়। কেউ কেউ জোর করে ব্যাগ নিয়ে বেশি টাকা দাবি করেন। যদি নির্দিষ্ট পোশাকের অনুমোদিত কুলি থাকে এবং ট্রলি ব্যবস্থাও ঠিকভাবে চালু থাকে, তাহলে যাত্রীদের ভোগান্তি অনেক কমবে বলে মনে করি।
কত লঞ্চ প্রস্তুত
বিআইডব্লিউটিএর ঢাকা নদীবন্দর সদরঘাটের নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে নৌ-পথে প্রায় ১৬৬ থেকে ১৭০টি লঞ্চ যাত্রী পরিবহনের জন্য প্রস্তুত রয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে ৩৮টি রুটের মধ্যে ৩৩টি রুটে লঞ্চ চলাচল করছে। ঢাকা নদীবন্দর থেকে প্রতিদিন গড়ে ৫৫ থেকে ৬০টি লঞ্চ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের উদ্দেশে ছেড়ে যাচ্ছে।
সূত্রটি জানায়, গত ঈদের শেষ সময়ে সর্বোচ্চ ১৩৭টি লঞ্চ ঢাকা বন্দর ছেড়েছিল।
নিরাপত্তায় সমন্বিত আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা
বিআইডব্লিউটিএর ঢাকা নদীবন্দর সদরঘাটের নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের যুগ্ম-পরিচালক মুহম্মদ মোবারক হোসেন বলেন, প্রতি বছর ঈদকে ঘিরে নদীপথে যাত্রীর চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। বিষয়টি বিবেচনায় রেখে আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এবারের ঈদে প্রায় ৮ থেকে ১০ লাখ মানুষ নদীপথে যাতায়াত করবে বলে আশা করা হচ্ছে। ঈদযাত্রা নিরাপদ রাখতে র্যাব, নৌ-পুলিশ, ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) এবং অন্যান্য সংস্থা যৌথভাবে দায়িত্ব পালন করবে। সদরঘাট এলাকায় চার থেকে পাঁচটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ বা কন্ট্রোল রুম সার্বক্ষণিক চালু থাকবে।
পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে মোবাইল টিম ও মোবাইল ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করবেন। প্রতিটি লঞ্চে বিআইডব্লিউটিএ, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও র্যাবের হটলাইন নম্বর প্রদর্শনেরও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালের র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) কন্ট্রোল রুমে দায়িত্বরত সদস্য হুমায়ুন কবির বলেন, ‘দক্ষিণাঞ্চলের নদীপথের যাত্রীদের নিরাপত্তা ও সমন্বয় নিশ্চিত করতে আমরা সার্বক্ষণিক কাজ করছি। এখন পর্যন্ত বড় কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি।’
পন্টুনে হকার নিষিদ্ধ, তবু দেখা মিলছে
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এবারের ঈদযাত্রায় পন্টুন এলাকা ক্যানভাসার ও হকারমুক্ত রাখা হবে। তবে সরেজমিনে দেখা গেছে, কিছু হকার ফল, পানি, রুটি ও নাস্তা বিক্রি করছেন পন্টুনের আশপাশে।
চাঁদপুরগামী যাত্রী শারমিন আক্তার বলেন, ‘পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে প্রতি বছরই লঞ্চে যাতায়াত করি। এবার ঘাটে নিরাপত্তা ও নির্দেশনা আগের তুলনায় একটু বেশি চোখে পড়ছে। তবে পন্টুন এলাকায় এখনও কিছু হকার দেখা যাচ্ছে।’
লঞ্চ প্রস্তুতিতে ব্যস্ত মালিকপক্ষ
সদরঘাটে নোঙর করা লঞ্চগুলো ধুয়ে-মুছে প্রস্তুত করতে দেখা গেছে মালিকপক্ষের কর্মীদের। যাত্রীদের আকর্ষণ করতে লঞ্চগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা হচ্ছে।
ঢাকা-বরিশাল রুটের পারাবত-১৮ লঞ্চের মাস্টার (চালক) খোরশেদ আলম বলেন, ‘আগে আমাদের কোম্পানির লঞ্চ দিনে দুই থেকে তিনটি ট্রিপ দিত। ঈদের সময় যাত্রী বাড়লে ডাবল ট্রিপের ব্যবস্থাও করা হয়। যাত্রীদের নিরাপত্তা ও সুবিধা-অসুবিধার বিষয়টি আমরা গুরুত্ব দিয়ে দেখি।’
ঢাকা-চাঁদপুর রুটের রফ রফ-৭ লঞ্চের কেবিন অপারেটর খন্দকার মোহাম্মদ সোহাগ বলেন, সকাল ৬টা থেকে রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত চাঁদপুর রুটে লঞ্চ পাওয়া যাবে। ঈদের সময় যাত্রীচাপ বাড়লে লঞ্চের সংখ্যাও বাড়ানো হয়।
তেল সংকটের প্রভাব পড়বে না
দেশে জ্বালানি তেল সংকট নিয়ে আলোচনা থাকলেও এর প্রভাব ঈদযাত্রায় পড়বে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
লঞ্চ মালিক সমিতির দপ্তর সম্পাদক প্রদীপ বাড়ৈ বলেন, ‘আপাতত তেল সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। ঈদযাত্রায় যাত্রীদের কোনো সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে না বলে আমরা আশা করছি।’
সরকার অনুমোদিত ভাড়ায় ১০ শতাংশ ছাড়
বাংলাদেশ লঞ্চ মালিক সমিতির দপ্তর সম্পাদক প্রদীপ বাড়ৈ বলেন, সরকারের অনুরোধে যাত্রীদের স্বস্তির জন্য প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত ভাড়া কম নেওয়া হচ্ছে। লঞ্চে ঢাকা-বরিশাল নৌ-পথের সরকারি অনুমোদিত ভাড়ার একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। এই তালিকায় সাধারণ ডেক থেকে শুরু করে বিলাসবহুল ভিআইপি কেবিন পর্যন্ত সব শ্রেণির ভাড়ার বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। বর্তমানে ডেক শ্রেণির ভাড়া ৩৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। যারা সিঙ্গেল কেবিনে যাতায়াত করতে চান, তাদের জন্য এসি ও নন-এসি উভয় শ্রেণির ভাড়াই ১ হাজার ২০০ টাকা রাখা হয়েছে। একইভাবে ডাবল কেবিনের ক্ষেত্রেও এসি ও নন-এসি উভয় প্রকারের ভাড়া ২ হাজার ৪০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
পরিবার নিয়ে ভ্রমণের জন্য ফ্যামিলি কেবিনের (এসি) ভাড়া রাখা হয়েছে ৫ হাজার টাকা। এছাড়া যারা আরও উন্নত ও আরামদায়ক সেবা খুঁজছেন, তাদের জন্য রয়েছে ভিআইপি কেবিনের ব্যবস্থা। ভিআইপি ২ টিকিটের ভাড়া ৬ হাজার টাকা, ভিআইপি ৩ টিকিটের ভাড়া ১০ হাজার টাকা এবং ভিআইপি ৪ টিকিটের ভাড়া ১২ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সদরঘাটে কথা হয় বরিশালগামী যাত্রী মো. রফিকুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ঈদের সময় লঞ্চে ভিড় থাকলেও নদীপথে যাত্রা তুলনামূলক আরামদায়ক। তবে টিকিট পাওয়া আর ঘাটে ভিড় সামলানো একটু কঠিন হয়ে যায়। কর্তৃপক্ষ যদি শৃঙ্খলা ঠিক রাখতে পারে তাহলে যাত্রা আরও স্বস্তিদায়ক হবে।’
মাদারীপুরগামী আরেক যাত্রী আবদুল কাদের বলেন, ‘ঈদের সময় যাত্রী বেশি থাকায় অনেক সময় অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ শোনা যায়। তবে এবার সরকার নির্ধারিত ভাড়া ও ছাড়ের বিষয়টি কার্যকর থাকলে যাত্রীদের জন্য ভালো হবে।’