মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১ বৈশাখ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
২৫ শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি

সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়ন নিয়ে এসব কী হচ্ছে ?

মেহেদী হাসান পলাশ :

গণমাধ্যমের সংবাদ, সংরক্ষিত মহিলা আসনগুলোর জন্য বিএনপি ইতোমধ্যে ৮ শতাধিক মনোনয়নপত্র বিক্রি করেছে। কীসের ভিত্তিতে এ সকল মনোনয়নপত্র বিক্রি হচ্ছে আমি জানি না। দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের ব্যাপক ভিড়। ত্যাগী নেত্রীদের অভিযোগ, ১৭ বছরে যাদের দলীয় কার্যক্রমের ধারেপাশে দেখা যায়নি তারাও এসে মনোনয়ন চাইছেন। কেউ কেউ অভিযোগ করছেন, দলীয় কার্যালয়ের সিঁড়ি কোথায় এটাও জানেনা এমন লোক এদের কাছেও মনোনয়ন বিক্রি করা হচ্ছে। কারো মতে, ফ্যাসিবাদী সরকারের সাথে ঘনিষ্ঠ অনেকেই মনোনয়ন তুলেছেন। ফলে ত্যাগীরা শঙ্কিত।

জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক ফাতেমা বাদশা দাবি করেছেন, সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়ন নিশ্চিত করতে তাঁর কাছে ১২ কোটি টাকা দাবি করা হয়েছিল। বিষয়টি তিনি ঢাকাভিত্তিক ইংরেজি দৈনিক ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তুলে ধরেন, যা সরকারি দলের মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় টাকার প্রভাব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

চট্টগ্রাম নগরের ডবলমুরিং থানা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত বাদশা মিয়ার স্ত্রী ফাতেমা বাদশা ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’-কে বলেন, ঢাকা থেকে একটি দল মাইক্রোবাসে করে চট্টগ্রামে এসে সরাসরি তাঁর সঙ্গে দেখা করে। ওই বৈঠকে তাঁকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়, ১২ কোটি টাকা দিলে সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন এবং পরবর্তী সময়ে সংসদ সদস্য হওয়া নিশ্চিত করা হবে। তবে তিনি জানান, প্রস্তাবটি এখানেই শেষ হয়নি।

ফাতেমা বাদশা দাবি করেছেন, টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁকে বিকল্প একটি প্রস্তাব দেওয়া হয়। সেই প্রস্তাব অনুযায়ী, তিনি এমপি হতে পারবেন ঠিকই, তবে আগেভাগে এমন কিছু নথিতে স্বাক্ষর করতে হবে, যেখানে তাঁর নামে বরাদ্দ হওয়া উন্নয়ন প্রকল্পের টাকা ব্যবহারের অনুমোদন থাকবে। বাস্তবে ওই টাকার নিয়ন্ত্রণ থাকবে ওই গোষ্ঠীর হাতে, যার মাধ্যমে তারা প্রকল্প থেকে অর্থ তুলে নিতে পারবে।

তবে কারা তার কাছে এমন অনৈতিক দাবি করেছে তাদের পরিচয় প্রকাশ করেননি এই নেত্রী। ফলে গণমাধ্যমটি সংবাদের সত্যতা যাচাই করতে পারেনি। তবুও অভিযোগটি ভয়ানক। আমার জানা নেই, দলীয়ভাবে বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে কিনা।

সোশ্যাল মিডিয়ায় মনোনয়ন তোলা অনেক নারীর ছবি দেখেছি যারা বিএনপির রাজনীতির ধারে কাছেও নেই। তাদের কাছে কেন মনোনয়ন বিক্রি করা হলো আমার ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে আসে না। যদি ধরেও নিই তাদেরকে মনোনয়ন দেয়া হবে না। দল তাদেরকে সিলেক্ট করবে না। তবুও প্রশ্ন থাকে, একটি দলের মনোনয়ন পত্র যে কেউ চাইলেই কিনতে পারবে? যে কেউ চাইলেই তার কাছে বিক্রি করা হবে? মিনিমাম কি যাচাই-বাছাই ও বিবেচনা করা হবে না? এখন যদি অপু উকিল, তারানা হালিম বা শমী কায়সারদের মত নেত্রীরা বিএনপি’র দলীয় মনোনয়নপত্র কিনতে চায় তারা কি কিনতে পারবে? তাদের কাছে কি বিক্রি করা হবে? অথচ উনাদের মত পরিচিত মুখ না হলেও কাছাকাছি এমন অনেকের কাছে দলীয় মনোনয়নপত্র বিক্রি করা হয়েছে বলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবি এসেছে। তাদের সাথে বিএনপির রাজনীতির ন্যূনতম কোন সম্পর্ক নেই।

সরকার গঠনের পর সচিবালয়ে, মন্ত্রী এমপি ও প্রভাবশালী নেতাদের বাসায়, ব্যক্তিগত অফিসে সারা দেশের নারী নেত্রীরা ফুল নিয়ে দেখা করতে গিয়েছেন। এটা দোষনীয় নয়। কিন্তু মন্ত্রী, এমপি ও প্রভাবশালী নেতাদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের ম্যানেজ করে সুবিধাবাদী, হাইব্রিড ও ভিন্ন মতাবলম্বী অনেকেই রং পাল্টিয়ে মন্ত্রী, এমপিদের কাছে পৌঁছে গেছেন। এমনকি এদের এতটাই দাপট যে ত্যাগিরাও এই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েছে অনেক জায়গায়। এভাবে যদি সর্বত্র ত্যাগিরা উপেক্ষিত হয়, অবমূল্যায়িত হয় তাহলে ভবিষ্যতে দলের কঠিন দিনে বিপদে পড়তে হবে। কেননা এ সকল হাইব্রিডরা থাকবে না।

মনে রাখা প্রয়োজন, অর্থ, শক্তি, ক্ষমতা, জ্ঞান, শ্রম- যে মানুষের মধ্যে যে যোগ্যতা থাকে তিনি সেই যোগ্যতা দিয়েই তার সমস্যার সমাধান করতে চান বা মূল্যায়ন চান। আর যার এগুলোর কিছুই থাকে না তিনি তৈল মর্দন করেন। প্রভাবশালীদের জুতার তলা চাটেন। আমাদের দেশে এই শেষোক্তটি সবচেয়ে বড় ও অব্যর্থ যোগ্যতা। ফলে প্রকৃত যোগ্য ও ত্যাগিরা যখন দেখেন তাদের যোগ্যতা ও ত্যাগের চেয়ে মোসাহেবরা মূল্যায়িত হচ্ছে তখন তারা অভিমানে সরে যান। এটি দলের জন্য আখেরে চরম ক্ষতিকর হয়। এজন্য একটি দলের প্রকৃত দায়িত্ব থাকে ত্যাগী, মেধাবী ও যোগ্য নেতাদের মূল্যায়ন করা এবং সঠিক স্থানে কাজে লাগানো। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি এ ব্যাপারে ভুল করবে না এ প্রত্যাশা রাখতে চাই।