বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৩ বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২৭ শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি

যুক্তরাজ্যে ভুয়া আশ্রয় প্রার্থনার বাজার উন্মোচন করল বিবিসি

নিজেকে ব্যারিস্টার পরিচয় দেওয়া জাহিদ হাসান আখন্দ : বিবিসি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা ব্যবস্থাকে ঘিরে এক বিস্ময়কর প্রতারণার চিত্র উন্মোচন করেছে বিবিসির গোপন অনুসন্ধান।

বুধবার (১৫ এপ্রিল) প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ভুয়া ওয়েবসাইট, সাজানো রাজনৈতিক বিক্ষোভ ও মিথ্যা পরিচয়ের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে এক ‘ফেক অ্যাসাইলাম ইন্ডাস্ট্রি’। এ প্রক্রিয়ায় কিছু পরামর্শদাতা ও আবেদনকারী মিলে নকল প্রমাণপত্র তৈরি করে আশ্রয় পাওয়ার চেষ্টা করছেন।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আশ্রয়ের আবেদনকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে নানা ধরনের মিথ্যা কৌশল ব্যবহার করা হচ্ছে। কেউ নিজেকে সমকামী, কেউ নাস্তিক বা রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন, যদিও বাস্তবে তাদের কেউ এমনটি নন। এ কাজে সহায়তা করছেন কিছু তথাকথিত আইনজীবী ও পরামর্শদাতা, যারা মোটা অঙ্কের বিনিময়ে আবেদনকারীদের ‘প্রশিক্ষণ’ দিয়ে থাকেন।

বিবিসি জানায়, পূর্ব লন্ডনের একটি অফিসে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর ছদ্মবেশে অংশ নেন একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক। সেখানে নিজেকে ব্যারিস্টার পরিচয় দেয়া জাহিদ হাসান আখন্দ নামের এক ব্যক্তি আশ্রয় পাওয়ার তিনটি সম্ভাব্য পথ তুলে ধরেন- সমকামী পরিচয়, নাস্তিকতা বা রাজনৈতিক সক্রিয়তা।

তিনি জানান, আইনি সহায়তার জন্য ১ হাজার ৫০০ পাউন্ড ফি লাগবে, তবে সফল হতে হলে আবেদনকারীকে নিজেই ‘প্রমাণপত্র’ তৈরি করতে হবে।

নাস্তিক পরিচয়ের ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্মীয় অবমাননাকর পোস্ট দেয়ার পরামর্শ দেন তিনি, যাতে হুমকি পাওয়া যায় এবং তা প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যায়। এমনকি অর্থের বিনিময়ে ভুয়া ব্লগ বা ম্যাগাজিনে লেখা প্রকাশের ব্যবস্থা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে লেখা তৈরির পরামর্শও দেয়া হয়।

রাজনৈতিক আশ্রয়ের পথকে কঠিন বলে উল্লেখ করে তিনি জানান, সমকামী পরিচয় দেয়াই সহজ। এ ক্ষেত্রে ভুয়া ক্লাবের সদস্যপদ, সাজানো সম্পর্ক এমনকি নকল সঙ্গী পর্যন্ত জোগাড় করে দেয়া হয়।

তবে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, জাহিদ আখন্দ বৈধভাবে আইনচর্চার অনুমোদনপ্রাপ্ত নন। নিজেকে ব্যারিস্টার হিসেবে পরিচয় দেয়াও আইনত অপরাধ হতে পারে।

সংশ্লিষ্ট আইন সংস্থা জানিয়েছে, তিনি তাদের কর্মী নন এবং বহু আগে প্রতিষ্ঠানটি ছেড়ে গেছেন।

এই প্রতারণা কেবল একজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ২০১৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে আরেক বাংলাদেশি আইনজীবীর সহায়তায় বহু ভুয়া আশ্রয় আবেদন জমা পড়েছে। এসব আবেদনে ভুয়া সংবাদ ওয়েবসাইটে প্রকাশিত নিবন্ধ ব্যবহার করা হয়েছে, যার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই।

এছাড়া সাজানো রাজনৈতিক বিক্ষোভের ছবি, মিথ্যা মামলা, ভুয়া মানসিক অসুস্থতা বা এইচআইভি আক্রান্ত হওয়ার ভান- সবই প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। আবেদনকারীদের সাক্ষাৎকারে কীভাবে আচরণ করতে হবে, এমনকি কীভাবে কাঁদতে হবে- তাও প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে।

এই অনুসন্ধান যুক্তরাজ্যের আশ্রয় ব্যবস্থার দুর্বলতা ও অপব্যবহারের একটি গুরুতর দিক তুলে ধরেছে। একই সাথে এটি দেখিয়েছে, কীভাবে কিছু অসাধু চক্র মানবিক একটি প্রক্রিয়াকে ব্যবসায় পরিণত করেছে, যেখানে সত্য-মিথ্যার সীমারেখা ইচ্ছাকৃতভাবে ঝাপসা করে দেয়া হচ্ছে।