নিজস্ব প্রতিবেদক : আওয়ামী লীগ আমলে বিসিএসের ফলাফলে নজিরবিহীন জালিয়াতি করা হয়েছে। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার শাসনামলে মেধার তোয়াক্কা না করে রাজনৈতিক বিবেচনা ও বিপুল অর্থের বিনিময়ে প্রশাসনে বহু ক্যাডার নিয়োগ দেওয়া হয়। সব ধরনের নিয়ম-কানুনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অকৃতকার্য প্রার্থীদের নিয়োগের সুপারিশ করে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি)। নন-ক্যাডার তালিকা থেকে সরাসরি ক্যাডার পদে নিয়োগ দেওয়া হয় অন্তত ৬২ জনকে। সিভিল সার্ভিসের ইতিহাসে এমন জালিয়াতি আগে কখনো দেখা যায়নি বলে মত সংশ্লিষ্টদের।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিসিএস ক্যাডার নিয়োগে দুর্নীতি ও দলীয়করণের অভিযোগে ইতোমধ্যে অনুসন্ধান ও তদন্ত শুরু হয়েছে বলে সংসদে জানিয়েছেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী। তদন্ত শেষ হলে আইনানুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
সূত্র জানায়, জালিয়াতির মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া এসব কর্মকর্তার বিষয়ে খোঁজ নিচ্ছে জাতীয় নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট একটি সংস্থা। এসব কর্মকর্তার বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্ত জোরদারসহ আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হচ্ছে। ওই সব কর্মকর্তাকে বিশেষভাবে নজরদারির আওতায় আনা হচ্ছে।
ওই জালিয়াতি তদন্তে অর্ন্তবর্তী সরকারের সময় পিএসসির পক্ষ থেকে গঠিত তিন সদস্যের কমিটি দীর্ঘদিনেও কার্যকর কোনো প্রতিবেদন দিতে পারেনি। এ নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করা হয়েছে নিরাপত্তা সংস্থার পক্ষ থেকে। পাশাপাশি দুদকের তদন্ত তৎপরতা আরো জোরদারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখাও এ অনিয়মের বিষয়ে অবাক হওয়ার মতো নীরবতা পালন করছে।
জানা গেছে, বিসিএস বিধিমালা ও পিএসসির দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোই ছিল আওয়ামী শাসনামলের ‘ওপেন সিক্রেট’। বিশেষ করে ২৯, ৩০ ও ৩১তম বিসিএসে নজিরবিহীন কারসাজির মাধ্যমে অবৈধ এ নিয়োগগুলো সম্পন্ন করা হয়। পিএসসির মূল সুপারিশের বাইরে গিয়ে সম্পূর্ণ আলাদা গেজেট প্রকাশ করে তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়, যা কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। অবৈধ এসব কর্মকর্তা গত এক যুগে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়েছেন, দখল করেছেন স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ পদ। এমনকি জুলাই অভ্যুত্থানেও গোষ্ঠীটি ফ্যাসিবাদের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে বলে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
রহস্যময় পৃথক গেজেট:
সিভিল সার্ভিস বিধিমালা অনুযায়ী, পিএসসির চূড়ান্ত সুপারিশের পর ক্যাডার তালিকায় নতুন নাম যুক্ত করার কোনো আইনি সুযোগ নেই। কিন্তু আওয়ামী শাসনামলে এই অসম্ভবই সম্ভব হয়েছে। ২৯তম বিসিএসে ২১ জনকে অবৈধভাবে নিয়োগ দিয়ে অনিয়মের যে বিষবৃক্ষ রোপণ করা হয়েছিল, তার পূর্ণ রূপ দেখা যায় ৩০ ও ৩১তম বিসিএসে। সাধারণত বিসিএস পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলাফলের পর পিএসসি একটি সুপারিশ তালিকা প্রকাশ করে। যারা ক্যাডার পান না, যোগ্যতা অনুযায়ী তাদের প্রথম বা দ্বিতীয় শ্রেণির নন-ক্যাডার পদে বা অপেক্ষমাণ তালিকায় রাখা হয়। কিন্তু ৩০ ও ৩১তম বিসিএসের ক্ষেত্রে ঘটে তুঘলকি কাণ্ড। মূল গেজেট প্রকাশের কয়েক মাস পর দৃশ্যমান কোনো কারণ ছাড়াই এবং প্রচলিত আইন ভেঙে পৃথক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ৪১ প্রার্থীকে প্রশাসন ও পুলিশের মতো লোভনীয় ক্যাডারে বসানো হয়। এই ৪১ কর্মকর্তার নিয়োগের পেছনে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন শীর্ষ কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে শক্তিশালী সিন্ডিকেট কাজ করে বলে জানা গেছে। ওই সিন্ডিকেটে তৎকালীন সিনিয়র সচিব আবদুস সোবহান সিকদারের নাম বারবার আলোচনায় আসছে। এখানে মেধার চেয়ে বড় যোগ্যতা ছিল দলীয় আনুগত্য, ভুয়া ‘মুক্তিযোদ্ধা কোটা’ ব্যবহার এবং মোটা অঙ্কের টাকা লেনদেন।
৩০তম বিসিএস: জালিয়াতির মহাঅধ্যায়:
৩০তম বিসিএসের ক্যাডার/নন-ক্যাডার পদে চাকরি পাননি এমন মুক্তিযোদ্ধা সন্তানদের মধ্য থেকে ১৮ জনকে চাকরি দেওয়া হয় পুলিশ ও প্রশাসনসহ বিভিন্ন ক্যাডারে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, জালিয়াতির মাধ্যমে চাকরি পাওয়া ১৮ নারী প্রার্থী ক্যাডার তো দূরে থাক, নন-ক্যাডার কিংবা অপেক্ষমাণ কোনো তালিকায়ও ছিলেন না।
জানা গেছে, ২০১২ সালের ১৭ মে এই বিসিএসের চূড়ান্ত গেজেটে দুই হাজার ২৬২ জনকে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়। নিয়মানুযায়ী নিয়োগ প্রক্রিয়া সেখানেই শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু পিএসসির সুপারিশের আলোকে নির্দিষ্ট সময়ের পাঁচ মাস পর ২৩ অক্টোবর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় নজিরবিহীনভাবে ১৮ নারীকে বিভিন্ন ক্যাডারে নিয়োগ দিয়ে পৃথক গেজেট জারি করে।
ওই ১৮ জনের তালিকায় ছিলেন প্রশাসন ক্যাডারে নাসরিন আক্তার, রুবাইয়াৎ ফেরদৌসী, সুবর্ণা রানী সাহা এবং পারভীন সুলতানা। পুলিশ ক্যাডারে যুক্ত করা হয় মোছা. সুলতানা রাজিয়া এবং শামীমা নাসরিনকে। এছাড়া অডিট, আনসার, পরিবার পরিকল্পনা ও তথ্য ক্যাডারেও এমন রহস্যময় নিয়োগ দেওয়া হয়। সে সময় এমন আলাদা গেজেট প্রশাসনে ব্যাপক গুঞ্জন সৃষ্টি করলেও শেখ হাসিনা সরকারের প্রচণ্ড দাপটের কারণে কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পাননি।
৩১তম বিসিএস: অনিয়মের রূপ:
৩০তম বিসিএসের ধারাবাহিকতায় ৩১তম বিসিএসে জালিয়াতির মাত্রা সব সীমা ছাড়িয়ে যায়। ২০১২ সালের ২৭ ডিসেম্বর মূল গেজেট প্রকাশের সাড়ে ছয় মাস পর ২০১৩ সালের ১২ জুন হঠাৎ ২৩ জনের নামোল্লেখ করে আরেকটি গেজেট জারি করা হয়। তাদের নন-ক্যাডার তালিকা থেকে তুলে এনে সরাসরি ক্যাডার পদে বসানো হয়। এদের মধ্যে প্রশাসন ক্যাডারে সর্বোচ্চ ১১ জন এবং পুলিশ ক্যাডারে ছয়জন নিয়োগ পান। প্রশাসন ক্যাডারে নিয়োগ পাওয়াদের মধ্যে এইচএম সালাউদ্দিন মনজু, সাঈকা সাহাদাত, একেএম হেদায়েতুল ইসলাম এবং মোছা. আকতারুন নেছার মতো কর্মকর্তারা গত দেড় দশকে মাঠ প্রশাসনে বেশ ‘প্রভাবশালী’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
দুদকের তদন্তে ধীরগতি:
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৯তম বিসিএসের ২১ কর্মকর্তার নিয়োগ জালিয়াতি নিয়ে দুদক তদন্ত শুরু করলেও তেমন কোনো অগ্রগতির খবর নেই। ৩০ ও ৩১তম বিসিএসের ৪১ জনের ক্ষেত্রে এখনো তেমন কোনো জোরালো অগ্রগতির কথা জানা যায় না। অভিযোগ উঠেছে, একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এ জালিয়াতি ধামাচাপা দিতে এখনো টাকা ঢালছে।
সূত্র বলছে, এটি পুরোপুরি নথিনির্ভর বা ‘ডকুমেন্টস বেজড’ জালিয়াতি। পিএসসির মূল গেজেট আর অবৈধ পৃথক গেজেট পাশাপাশি রাখলেই অপরাধ প্রমাণিত হয়। তবুও অদৃশ্য কারণে তদন্তের গতি বাড়ানো হচ্ছে না। এই কর্মকর্তারা এখনো প্রশাসনে ঘাপটি মেরে থাকায় তদন্ত বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
চাকরিচ্যুতি ও বিচার:
সিভিল সার্ভিস রুলস অনুযায়ী, জালিয়াতি প্রমাণ হলে শুধু চাকরিচ্যুতিই যথেষ্ট নয়; বরং গত এক যুগে তারা রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে যে বিপুল পরিমাণ বেতন-ভাতা গ্রহণ করেছেন, তা ফেরত দেওয়া এবং তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা বাধ্যতামূলক। ২৯, ৩০ ও ৩১তম বিসিএসে জালিয়াতির মাধ্যমে ঢোকা ৬২ কর্মকর্তাকে আইনের আওতায় আনার বিষয়ে করণীয় খতিয়ে দেখা যেতে পারে বলেও অভিমত নিরাপত্তা সংস্থার।
তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই নিয়োগ প্রক্রিয়া যে সম্পূর্ণ বেআইনি এবং সংবিধানপরিপন্থী, তা নিয়ে প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও কোনো দ্বিধা নেই। পিএসসির চূড়ান্ত সুপারিশের পর নন-ক্যাডার তালিকা থেকে ক্যাডার সার্ভিসে নিয়োগ দেওয়ার কোনো আইনগত বিধান নেই। এটি পিএসসির সুপারিশের স্পষ্ট লঙ্ঘন এবং আইনের ভাষায় ‘ভয়েড অ্যাব ইনিশিও’ বা শুরু থেকেই বাতিলযোগ্য।
পিএসসির বর্তমান একাধিক উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা বলেন, নন-ক্যাডার থেকে ক্যাডারে আত্তীকরণের কোনো সুযোগ নীতিমালায় নেই। এটি স্রেফ জালিয়াতিমূলক গেজেট ছিল, যার কোনো বৈধ ভিত্তি নেই।
খতিয়ে দেখছে সরকার :
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিসিএস ক্যাডার নিয়োগে দুর্নীতি ও দলীয়করণের অভিযোগে ইতোমধ্যে অনুসন্ধান ও তদন্ত শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী। তদন্ত শেষ হলে আইনানুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান। বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে এ তথ্য তুলে ধরেন তিনি। সংসদ সদস্য শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের প্রশ্নের লিখিত জবাবে প্রতিমন্ত্রী এ কথা বলেন। এ সময় অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিসিএস নিয়োগে দুর্নীতি ও দলীয়করণের অভিযোগ গুরুত্বসহকারে তদন্ত করছে দুদকসহ সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। তদন্ত প্রতিবেদন ও সুপারিশ পাওয়ার পর আইনানুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।