এম আবদুল্লাহ :
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার দু’মাস পূর্ণ করেছে। এ উপলক্ষে সরকারের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন ডেকে সাফল্য ও বিভিন্ন অর্জনের বিবরণ দেওয়া হয়েছে। আগের এক লেখায় উল্লেখ করেছিলাম তারেক রহমান সরকারের সকালটা আলোকজ্জ্বল ও আশাবাদের। ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হয়ে তিনি নানা ইতিবাচক পদক্ষেপের মাধ্যমে জনমনে আশার সঞ্চার করেছেন। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দ্রুত বাস্তবায়নে উদ্যোগী হওয়া ছাড়াও সরকার প্রধানের দৈনিন্দিন কাজ ও জীবনাচারে কিছু গুণগত পরিবর্তন আনার বার্তা দিয়েছেন।
দায়িত্ব নিয়েই দু’মাসের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড, ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের সম্মানি প্রদান, ক্রীড়াবিদদের কার্ড ও ভাতা প্রদান, কৃষক কার্ড বিতরণ, খাল খনন ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পরীক্ষামূলকভাবে সূচনা করেছেন। যদিও পূর্ণাঙ্গভাবে এসব সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন সময় ও বিপুল ব্যয়সাপেক্ষ। প্রয়োজনীয় অর্থের যোগান চ্যালেঞ্জিং। সরকারি দলের এমপিদের শুল্কমুক্ত গাড়ি ও সরকারি প্লট না নেওয়ার সিদ্ধান্ত, প্রধানমন্ত্রী হয়েও প্রটোকল না নিয়ে ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে চলা, নির্ধারিত সময়ে অফিসে উপস্থিত হওয়া, নিজের কার্যালয়ের পরিবর্তে তদারকি ও কাজের সুবিধার্থে সচিবালয়ে অফিস করা, যানজট ও জ্বালানি অপচয়ের কথা বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহরের সংখ্যা ১৪টি থেকে কমিয়ে চারটিতে আনা, ঢাকার ফুটপাত দখলমুক্ত করাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ মানুষের প্রশংসা কুড়িয়েছে।
ই-হেলথ কার্ড বিতরণের প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন আছে। দুই লাখ শিশুকে বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস দেওয়ার ঘোষণা এসেছে। জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট ও বৈশ্বিক বাজারে দাম বৃদ্ধির পরও দেশের বাজারে দাম বাড়াননি। এসবই নতুন সরকারের দু’মাসে সাফল্যের মুকুটে পালক হিসেবে যুক্ত হয়েছে।
বিপরীতে কিছু নেতিবাচক ঘটনা সরকারের আলোকোজ্জ্বল যাত্রাকে অনেকখানি ম্লান করেছে। জ্বালানির মূল্য না বাড়িয়ে সরকার যেটুকু প্রশংসা কুড়িয়েছে, সরবরাহ সংকট ও অব্যবস্থাপনায় সীমাহীন ভোগান্তি তার চেয়ে বেশি ক্ষোভ-নিন্দার মুখে ফেলেছে। সংস্কার ইস্যুতে বিচ্যুতি জবাবদিহি ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারের সদিচ্ছাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। অর্থনৈতিক সংস্কারে বিপথগামিতা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চাপের মুখে ফেলেছে। আইএমএফ জুনের নির্ধারিত ঋণকিস্তি বাতিল করে সরকারকে কড়া বার্তা দিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের অধ্যাদেশগুলো সংসদে পাশ না করায় রাষ্ট্রকাঠামোর আমূল সংস্কার-প্রত্যাশী মানুষের মধ্যে হতাশার সৃষ্টি করেছে। ব্যাংকি খাতের গুরুত্বপূর্ণ আইনে বিতর্কিত সংশোধনীর মাধ্যমে লুটেরাদের ফেরার ব্যবস্থা সরকারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।
এরই মধ্যে প্রশাসনসহ নানা খাতে সমন্বয়হীনতা প্রকট হয়ে উঠেছে। প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে পদায়নের ক্ষেত্রে যোগ্যতা, দক্ষতার পরিবর্তে অন্ধ দলীয় আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়া ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। প্রশাসনে দ্বন্ধ এবং উপদেষ্টা-মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে। প্রধানমন্ত্রীর ইতিবাচক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রচেষ্টার বিপরীতে গিয়ে উচ্ছৃঙ্খল নেতা-কর্মীদের চাঁদাবাজি, দখলবাজির কারণেও সরকারের ইমেজ ক্ষুন্ন হচ্ছে। সহনশীল রাজনীতির যে বার্তা তারেক রহমান দিয়েছেন তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক অনেক পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে। ফেসবুক পোস্টে সমালোচনার কারণে নারী গ্রেফতার হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কটুক্তি করায় এক সময় জোট সঙ্গী জাগপা নেতা রাশেদ প্রধানের বাসার সামনে শক্তির মহড়া দেওয়া হয়েছে। আপত্তিকর ভিডিওর অভিযোগে ডিবি কর্তৃক এক কন্টেন্ট ক্রিয়েটরকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া পতিত ফ্যাসিবাদী শাসনের প্রবণতার পুনরাবৃত্তি হিসেবে দেখছে মানুষ।
এদিকে নানা ধরনের সংকট মানুষকে ভোগাচ্ছে। তার সমাধানে মানুষ প্রত্যাশা অনুযায়ী পদক্ষেপ দেখছে না। দেশের ইতিহাসে এই মুহূর্তে সর্বোচ্চ পরিমাণ পরিশোধিত জ্বালানি তেল মজুত রয়েছে বলে দাবি করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম। শুক্রবার চট্টগ্রামে তিনি যখন এ বক্তব্য দিচ্ছিলেন তখন রাজধানীসহ সারাদেশের ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইনে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষারত যানবাহন মালিক-চালকদের ক্ষোভ বিস্ফোরিত হচ্ছিল। টিভির বুমের সামনে তারা ক্ষোভ ঝাড়ছিলেন, প্রকাশ করছিলেন কষ্টগাঁথা। অনেকে সরকারের তীব্র সমালোচনা করছিলেন। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে তেল নিতে হচ্ছে গাড়িগুলোকে। সেখানেও চাহিদার পুরোটুকু পাওয়া যাচ্ছে না। দূরপাল্লার বাস ও গণপরিবহনে জ্বালানি সরবরাহে রেশনিং ব্যবস্থা সরকার অনেক আগেই তুলে দিলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন নেই।
রাজধানীর বিভিন্ন বাস কাউন্টার ও টার্মিনাল ঘুরে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে সংবাদকর্মীরা পত্রিকার পাতায় যে চিত্র তুলে ধরছেন তাতে চরম ভোগান্তিই ফুটে উঠছে। আগে এক ফিলিং স্টেশন থেকেই পর্যাপ্ত তেল সংগ্রহ করতে পারত প্রতিটি পরিবহন। এখন পাঁচ থেকে ছয়টি পাম্প ঘুরে তা নিতে হচ্ছে। এতে অতিরিক্ত সময় যাওয়ায় বিলম্বে গাড়ি ছাড়তে হচ্ছে। কোম্পানিগুলো এ অবস্থায় ট্রিপ বা যাত্রাসংখ্যা কমিয়ে দিয়েছে। অধিকাংশ পেট্রোল পাম্পেই জ্বালানি তেলের সংকট চলছে। কোথাও তেল নেই, আবার কোথাও সীমিত পরিমাণে সরবরাহ থাকায় বাস, মাইক্রোবাস, কাভার্ড ভ্যান, প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেলসহ সব ধরনের যানবাহনের ভিড়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পরও অনেকেই তেল না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। ক্ষোভে ফুঁসে উঠছেন ভূক্তভোগীরা।
এক হিসেবে দেশে রাইড শেয়ারিং খাতে জড়িত অন্তত ১০ লাখ মানুষ। দশ লাখ মানুষ মানে ১০ লাখ পরিবার। পাঠাও ও উবার মিলিয়ে এই বিশাল তরুণ সমাজের বড় অংশই এখন জ্বালানি সংকটের ভূক্তভোগী। লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিতেই তাদের অর্ধেকের বেশি সময় নষ্ট হয়ে যায়। ফলে উপার্জনও আগের চেয়ে কমে গেছে।
এদিকে গ্রীষ্মের দাবদাহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই দেশে লোডশেডিং পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। রাজধানীর তুলনায় দেশের মফস্বল ও গ্রামগুলোতে বিদ্যুতের হাহাকার সবচেয়ে বেশি। কোথাও কোথাও দিনে ও রাতে মিলিয়ে ১০ থেকে ১৫ ঘণ্টারও বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না বলে খবর পাওয়া গেছে। ঢাকার কাছে সাভারের এক বাসিন্দা জানান, কতক্ষণ লোডশেডিং হয় তা জানতে না চেয়ে বরং জানুন দিনে-রাতে কতক্ষণ বিদ্যুৎ থাকে। ২৪ ঘন্টায় ৫ থেকে ৬ ঘণ্টার বেশি বিদ্যুতের দেখা পান না বলে জানান ঢাকার উপকন্ঠে বসবাসকারি গৃহবধু। পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ বা পিজিসিবি এবং বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের গত কয়েক দিনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে সারা দেশে রেকর্ডেড লোডশেডিং প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট। জ্বালানি সংকট এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারিগরি ত্রুটির কারণে সামনের দিনগুলোতে এই পরিস্থিতি আরও অবনতির শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
অস্বস্তি দেখা দিয়েছে বাজারেও। জ্বালানি সংকটে বেড়েছে পরিবহন ব্যয়। যার কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরও বেড়েছে। সংকট সবচেয়ে বেশি চেপে ধরেছে চাকার ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবনে। অর্থাৎ পরিবহন সংশ্লিষ্টদের। আর তার প্রভাব পড়ছে ভোক্তাদের ওপর। খুচরা বাজারে বেশ কিছুদিন ধরে সোনালি মুরগি, সয়াবিন তেল ও সুগন্ধি চালের দাম বাড়তি। এসব পণ্যের সরবরাহ–সংকটও রয়েছে। এর সঙ্গে নতুন করে কয়েক ধরনের সবজি ও ফার্মের মুরগির ডিমের দাম বেড়েছে। খুচরা বিক্রেতারা জানিয়েছেন, সরবরাহ–সংকটের কারণ দেখিয়ে গত এক-দুই মাসে ধাপে ধাপে এসব পণ্যের দাম বাড়িয়েছেন সরবরাহ শৃঙ্খলে যুক্ত ব্যবসায়ীরা। কিন্তু কাছাকাছি সময়ে অনেকগুলো পণ্যের দাম বাড়ায় খরচ নিয়ে চাপে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। তিন-চার দিনের ব্যবধানে বাজারে ফার্মের মুরগির ডিমের দাম ডজনে ১০ টাকা বেড়েছে।
জ্বালানি সংকটের আরেক শিকার কৃষক। এর মধ্যে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন বোরো ধান চাষের সঙ্গে সম্পৃক্ত কৃষকেরা। তাঁরা বলছেন, ডিজেলের এমন সংকট দ্রুত নিরসনে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে চলতি মৌসুমে কৃষি উৎপাদনে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বছরের এ সময় কৃষকদের জমিতে সেচ দেওয়া, উৎপাদিত ধান কাটা ও ফসল পরিবহনের জন্য ডিজেলের ওপর নির্ভর করতে হয়। পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে মুন্সিগঞ্জের এক ফিলিং স্টেশনের মালিক আনোয়ার হোসেনকে উদ্বৃত করে জানানো হয়, চাহিদা মেটাতে বছরের এ সময় প্রতিদিন ১৬-২০ হাজার লিটার ডিজেলের দরকার হয় তাদের। সেখানে দুই–তিন দিন পর মাত্র সাড়ে ৪ হাজার লিটার ডিজেল বরাদ্দ পাচ্ছেন তারা, যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। এতে করে কৃষকেরা চাহিদা অনুসারে তেল পাচ্ছেন না। ধানগাছ শুকিয়ে যাচ্ছে, কৃষক হাহাকার করছে।
এই যে বহুমুখি সংকট সরকারকে ঘিরে ধরেছে তার মূলে ইসরায়েলি আগ্রাসনে ইরান যুদ্ধ। বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রভাবে দেশে দেশে অর্থনীতি, আমদানি-রফতানি, বাজার ব্যবস্থা ভয়াবহ সংকটে পড়েছে। এ সংকটের দায় সরকারের ওপর কমই বর্তায়। কিন্তু সেটা সরকার জনসাধারণের সামনে খোলাসা করার পরিবর্তে লুকোচাপা করলে দায় এড়ানোর সুযোগ কমে যায়। সংকটের শুরু থেকে জ্বালানি তেল নিয়ে সরকার আশ্বস্ত করে আসছে, পর্যাপ্ত মজুদ আছে বলে। কিন্তু সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। এখন প্রায় পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও হরমুজ প্রণালী কেন্দ্রিক তেল সরবরাহে যে বাধা তা কেটে যাচ্ছে। হরমুজ খুলে দিয়েছে ইরান। বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার মজুদ ধরে না রেখে অভ্যন্তরীন সরবরাহ কেন বাড়াচ্ছে না? পেট্রোল অকটেনের মজুদ নিয়ে বসে থেকে রাস্তায় মানুষকে ভোগানোর মধ্যে সরকারের অর্জন কী? বিদ্যুৎ কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় জ্বালানি সররবাহ না করে লোডশেডিংয়ের অন্ধকারে ডুবিয়ে দেওয়ার হেতু কি? কৃষকরা ডিজেল না পেলে, তার বোরো ধান পানির অভাবে খরতাপে ঝলসে গেলে সরকারের দাবিকৃত ‘পর্যাপ্ত মজুদ’ দিয়ে কী হবে? সে মজুদ কার জন্যে? নাকি দাবি ও বাস্তবতায় শুভঙ্করের ফাঁক আছে?
সরকার দিন দিন বন্ধুহীন হয়ে যাচ্ছে কিনা সে প্রশ্নও সামনে এসেছে। বিএনপি ঘরানার হিসেবে পরিচিত বুদ্ধিজীবী, লেখক, কলামিস্ট, টকশো’ ব্যক্তিত্বদের মধ্যে অনেকেই এখন ভিন্ন সুরে কথা বলছেন বা বলতে বাধ্য হচ্ছেন। তারা বিএনপিকে ওউন করে কথা বলতে দ্বিধা করছেন। ক্ষমতার দু’মাস না যেতেই ড. মাহবুব উল্লাহ’র মত মানুষকে কেন সরকারের সমালোচনায় মুখর হতে হচ্ছে। একই কাতারে আরও অনেকের নাম উল্লেখ করা যায়। এত দ্রুত বন্ধুহীন হতে শুরু করলে পাঁচ বছর কিভাবে সরকার চালাবে দলটি। বিএনপি’র বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ পুরনো। এ দল সত্যিকারের বন্ধু আর শত্রু পরখ করতে পারে না। অনুকূল সময়ে মতলববাজ, ধান্ধাবাজদের খপ্পরে পড়ে। দুঃসময়ের সতীর্থ ও ত্যাগীদের দূরে ঠেলে দেয়। পরিনাম যা হওয়ার তা হয়।
একটি সংঘবদ্ধ আওয়ামী ল্যাসপেন্সার চক্র ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ভিলেন বানানোর মিশনে নেমেছে। পরিকল্পনা মাফিক তারা টকশোতে, কনটেন্টে ড. ইউনূস শাসনকে জগতের নিকৃষ্ট শাসন হিসেবে তুলে ধরার অপচেষ্টায় লিপ্ত। সরকার এ ক্ষেত্রে শুধু নির্বিকার নয়, সরকারঘনিষ্ট অনেকে তাদের সঙ্গে মাখামাখি করে প্রকারান্তরে সায় দিচ্ছেন। ইউনূস শাসনকে ভিলিফাই করে তারা লুটেরা শ্রেণীর বিরুদ্ধে ওই সময়ের পদক্ষেপগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাইছে। জুলাই গণহত্যা ও পনের বছরের লুট-নিপীড়নের শাসনকে নরমালাইজ করাই তাদের লক্ষ্য। ভারতের চোখে চোখ রেখে দেশ শাসন করাও ড. ইউনূসের অন্যতম অপরাধ। দিল্লী ও আওয়ামী লীগের পৃষ্ঠপোষকতায় অন্তর্বর্তী সরকারকে তারা কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চায়। যে আনু মোহাম্মদ একবারের জন্যে শেখ হাসিনা বা তার সরকারের খুনি-লুটেরাদের বিচার চাননি, তিনি এখন ড. ইউনূস সরকারের বিচারের দাবি তুলছেন। এরাই সময়ের ব্যবধানে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগকে ফেরানোর মিশনে তারেক সরকারের বিরুদ্ধে আদা-জল খেয়ে নামবে তা নিশ্চিত করে বলতে পারি।
বিএনপি’র রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী ও দলটির প্রতি সহানুভূতিশীল বিশিষ্ট নাগরিক ও পেশাজীবীদের অনেকের কন্ঠে ইতিমধ্যে হতাশার সুর বেজে উঠেছে। বিএনপি’র থিঙ্কট্যাঙ্ক গ্রুপের সদস্য এবং টকশো’ ও লেখালেখি করে বিএনপি’র পক্ষে লড়াই করা অনেকেই এখন অচ্ছুত। তাদেরকে নানা ট্যাগিং-ফ্রেমিং করে দূরে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। নব্য জাতীয়তাবাদীদের ল্যাং মারা খেয়ে তাদের অনেকে নিজ থেকে গুটিয়ে নিচ্ছেন। আগের মতো সরকার ও বিএনপি নেতৃত্বকে ডিফেণ্ড করে কথা বলছেন না, বা বলতে পারছেন না। ডা. শায়ন্ত সাখাওয়াতের মত নিবেদিতপ্রাণ একটি বক্তব্যে বলছিলেন, যে আমরা সরকারের পক্ষে কথা বলার মতো যুক্তি খুঁজে পাচ্ছি না। বিএনপি’র জোটসঙ্গী শীর্ষ নেতা মাহমুদুর রহমান সংস্কার ইস্যুতে সরকারের অবস্থানে হতাশা প্রকাশ করে দ্বিধা-দ্বন্ধে ভোগার কথা জানিয়েছেন। নব্য বিএনপিপ্রেমিরা (আসলে ক্ষমতা ও হালুয়ারুটি প্রেমি) সরকারকে নানা মুখি চাপ থেকে কতটা প্রোটেক্ট করতে পারে সেটাই এখন দেখার বিষয়।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিস্ট ও যুগ্ম সম্পাদক, দৈনিক আমার দেশ।