মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২৯ বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২৪ জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

নির্বাচনের পর মুসলমানদের উপর ভারতে অমানবিক নির্যাতন, অথচ ওরা বলে ‘হিন্দু খতরে মে হ্যায়’

মো: হাফিজ উদ্দিন:

২০২৬ সালের মে মাসে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে যা ঘটেছে, তা কেবল একটি রাজ্যের ক্ষমতা পরিবর্তনের গল্প নয়—এটি ভারতীয় গণতন্ত্রের ভিত্তিতে একটি গভীর ফাটলের দলিল। ৪ মে ২০২৬ তারিখে ঘোষিত ফলাফলে বিজেপি ২৯৪ আসনের মধ্যে ২০৭টি আসন জিতে পশ্চিমবঙ্গে ১৫ বছরের তৃণমূল কংগ্রেস শাসনের অবসান ঘটিয়েছে। কিন্তু এই বিজয়ের পথে কী ঘটেছে? ভোটের আগে ৯০ লক্ষেরও বেশি ভোটারের নাম তালিকা থেকে মুছে দেওয়া হয়েছে—যার সিংহভাগ মুসলমান। ভোটের পরে মসজিদে হামলা হয়েছে, মুসলিম ব্যবসায়ীদের দোকান গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এবং “হিন্দু রাষ্ট্র” প্রতিষ্ঠার ডাক দিয়ে রাস্তায় মিছিল বেরিয়েছে।
এই ঘটনাবলিকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। এটি ২০১৪ সাল থেকে শুরু হওয়া একটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক প্রকল্পের সর্বশেষ অধ্যায়—যেখানে “হিন্দু বিপদে আছে” এই বয়ান ব্যবহার করে মুসলিম সংখ্যালঘুদের ক্রমাগত কোণঠাসা করা হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের ২০২৬ সালের নির্বাচন এই প্রকল্পের একটি পরীক্ষাগার হয়ে উঠেছে—এবং সেই পরীক্ষার ফলাফল ভারতের ভবিষ্যৎ গণতন্ত্রের জন্য গভীর প্রশ্ন তুলেছে।

এসআইআর: ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার হাতিয়ার

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের আগে সবচেয়ে বড় বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল ভারতের নির্বাচন কমিশনের (ইসিআই) “স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন” বা এসআইআর প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ৯০ লক্ষ নাম মুছে ফেলা হয়েছে—অর্থাৎ রাজ্যের মোট ৭ কোটি ৬০ লক্ষ ভোটারের প্রায় ১২ শতাংশ।
আলজাজিরার বিশেষ প্রতিবেদনে উত্তর ২৪ পরগনার গোবিন্দপুর, গোব্রা ও বালকি গ্রামে প্রায় এক ডজন মুসলিম পরিবারের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। তারা জানিয়েছেন, তাদের কাগজপত্র ঠিক থাকলেও নাম কাটা গেছে। ৭৩ বছর বয়সী নবিজান মণ্ডল বলেছেন, ৫০ বছর ধরে প্রতিটি নির্বাচনে ভোট দিয়ে আসছেন, অথচ এবার তার নাম নেই। মুর্শিদাবাদের সগরপাড়ার ৪৯ বছর বয়সী সোহিদুল ইসলাম বলেছেন, “আমি গভীর যন্ত্রণায় আছি। কে আমার কথা শুনবে?”


তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে মুসলিম-অধ্যুষিত জেলাগুলোতে নাম কাটার হার ছিল সর্বোচ্চ। মুর্শিদাবাদে ৪ লক্ষ ৬০ হাজার, উত্তর ২৪ পরগনায় ৩ লক্ষ ৩০ হাজার এবং মালদায় ২ লক্ষ ৪০ হাজার ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। নান্দিগ্রামে যারা তালিকাচ্যুত হয়েছেন তাদের ৯৫.৫ শতাংশই মুসলমান। ইসিআই বলছে এটি “নকল ভোটার ও মৃত ব্যক্তিদের” নাম বাদ দেওয়ার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু বিরোধীরা এবং সংখ্যালঘু সংগঠনগুলো বলছে, এটি পরিকল্পিতভাবে মুসলিম ভোটকে নিষ্ক্রিয় করার অভিযান।
ডিপ্লোম্যাট ম্যাগাজিনের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ইসিআই এই মুছে ফেলার একটি বড় অংশ “লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি” নামের একটি বিশেষ ক্যাটাগরিতে রেখেছে—যা শুধু পশ্চিমবঙ্গের জন্যই তৈরি করা হয়েছে। নামের বানানে সামান্য গরমিল, একজন বাবার সাথে ছয়ের বেশি ভোটারের সম্পর্ক, বা দাদা-নাতির বয়সের ব্যবধান ৪০ বছরের কম হলেই নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। বাস্তবে এই মানদণ্ডগুলো মুসলিম পরিবারগুলোকে অসামঞ্জস্যভাবে বেশি আঘাত করেছে, কারণ তাদের পারিবারিক নামকরণের ধরন ও নথিপত্র প্রায়ই আলাদা।
সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন থাকা ৩৩ লক্ষ ভোটারকে এবারের নির্বাচনে ভোট দিতে দেওয়া সম্ভব নয়। অর্থাৎ লাখো মানুষের ভোটাধিকার বিচারের অপেক্ষায় আটকে থেকে গেছে। বিরোধী দলগুলো এই প্রক্রিয়াকে “রক্তপাতহীন রাজনৈতিক গণহত্যা” বলে অভিহিত করেছে।

নির্বাচনী প্রচারণা: ঘৃণার রাজনীতি ও মেরুকরণের কৌশল

পশ্চিমবঙ্গের ২০২৬ নির্বাচনী প্রচারণা ছিল একটি পরিকল্পিত মেরুকরণের পাঠশালা। বিজেপি তাদের প্রচারণায় “হিন্দু অস্মিতা” বা হিন্দু পরিচয়কে কেন্দ্রে রেখেছে এবং মুসলমানদের “অনুপ্রবেশকারী” ও “অবৈধ বাংলাদেশি” বলে চিহ্নিত করার কৌশল অব্যাহত রেখেছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বারবার বলেছেন যে এসআইআর প্রক্রিয়া বাংলাদেশ ও মিয়ানমার থেকে আসা “অবৈধ অভিবাসীদের” তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার জন্য

দ্য ওয়্যারের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে একটি চমকপ্রদ তথ্য। বিজেপি মুর্শিদাবাদে ২০২৪-২০২৫-২০২৬ সালে ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের চক্রকে—শক্তিপুর রাম নবমী সংঘাত, বেলডাঙা সংঘাত, ওয়াকফ-সংক্রান্ত বিক্ষোভ এবং রঘুনাথগঞ্জ-জঙ্গিপুর রাম নবমী ঘটনা—রাজনৈতিকভাবে পুঁজি করেছে। প্রতিটি সংঘর্ষের পর “হিন্দু বিপদে আছে” বলে প্রচারণা চালানো হয়েছে এবং হিন্দু ভোটকে একত্রিত করা হয়েছে। বেলডাঙা থেকে টিএমসির পক্ষ থেকে বিজেপির পক্ষে ভোট সরেছে ১৩,২০৮টি এবং জঙ্গিপুরে সরেছে ১০,৫৪২টি।
নির্বাচনের গাণিতিক বিশ্লেষণে দ্য ওয়্যার দেখিয়েছে, ১০ শতাংশের কম মুসলিম জনসংখ্যার আসনে বিজেপি ৮৮টির মধ্যে ৮৭টি জিতেছে—জয়ের হার ৯৮.৯ শতাংশ। ১০-২০ শতাংশ মুসলিম জনসংখ্যার আসনে জয়ের হার ৯৩.১ শতাংশ। অর্থাৎ মেরুকরণের কৌশল হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনগুলোতে পূর্ণমাত্রায় কার্যকর হয়েছে। এটি ঘটনার স্বাভাবিক পরিণতি নয়—এটি পরিকল্পিত সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের ইচ্ছাকৃত ফসল।
আলজাজিরার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গ ভারতের রাজনৈতিক কল্পনায় বিশেষ স্থান ধারণ করে। ১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে বিভক্ত এই রাজ্যটি বাংলাদেশের সঙ্গে ২,২০০ কিলোমিটারেরও বেশি সীমান্ত ভাগ করে নেয়। রাজ্যের ২৭ শতাংশ মুসলিম জনগোষ্ঠী ঐতিহাসিকভাবে বিজেপিকে ঠেকাতে কৌশলগতভাবে ভোট দিয়ে এসেছেন। ঠিক এই কারণেই বাংলাকে জয় করা মোদির জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল—এবং সেই জয়ের জন্য মুসলিম ভোটকে নিষ্ক্রিয় করার প্রকল্প ছিল সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার।

নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা: মসজিদে হামলা, দোকান ভাঙা, হুমকির মিছিল

৪ মে ২০২৬ ফলাফল ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। নিউজগ্রামের প্রতিবেদনে জানা গেছে, অন্তত চারজন রাজনৈতিক কর্মী নিহত হয়েছেন, দলীয় কার্যালয়ে আগুন দেওয়া হয়েছে, একটি মসজিদ ভাঙচুর করা হয়েছে এবং মুসলমানদের লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। কলকাতার হাওড়া, বীরভূম, মুর্শিদাবাদ, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনাসহ একাধিক জেলায় সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়েছে।
বারাসাতের ময়না এলাকায় বিজেপি সমর্থকরা একটি “মসজিদ বাড়ি রোড” নামফলক ভেঙে ফেলে “নেতাজি পল্লী রোড” লিখে দিয়েছে। স্থানীয় বিজেপি নেতা নিতীশ মণ্ডল এটিকে “দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ” বলে বর্ণনা করেছেন। কলকাতার নিউ মার্কেটে মাংসের দোকান ও মুসলিম মালিকানাধীন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। টিএমসি নেতারা দাবি করেছেন, পুলিশের অনুমতিতেই বুলডোজার আনা হয়েছিল।

দার্জিলিংয়ের জোড়া পোখরির জামে মসজিদ ভাঙচুর করা হয়েছে। উত্তর দিনাজপুর, কোচবিহার ও কলকাতার পার্ক সার্কাস এলাকায় মুসলিম মালিকানাধীন দোকান ও বাড়িতে হামলার অভিযোগ উঠেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, বিজয়ী মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা মুসলিম মালিকানাধীন বিরিয়ানি ও মাংসের দোকান বন্ধ করে দেওয়ার বা স্থানান্তর করার হুমকি দিচ্ছে। ব্যাপকভাবে প্রচারিত একটি ভিডিওতে অঙ্কিত তিওয়ারি নামের এক ব্যক্তিকে মুসলিম নারী, শিশু ও ধর্মীয় নেতাদের বিরুদ্ধে সহিংসতার আহ্বান জানাতে দেখা যাচ্ছে।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও উত্তেজনা ছড়িয়েছে। সেখানে গেরুয়া পতাকা ও “জয় শ্রীরাম” স্লোগান দিয়ে ক্যাম্পাস ছেয়ে গেছে এবং “নকশালমুক্ত ক্যাম্পাস” গড়ার দাবিতে পুলিশ পোস্ট স্থাপনের আহ্বান জানানো হয়েছে। সামগ্রিকভাবে নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতিকে আলজাজিরা বর্ণনা করেছে “ভারতীয় গণতন্ত্রের ক্ষয়ের উন্মোচন” হিসেবে।

“হিন্দু খতরে মে হ্যায়”: পরিসংখ্যানের আলোয় একটি মিথ

“হিন্দু বিপদে আছে”—এই বয়ানটি পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনেও পূর্ণমাত্রায় ব্যবহৃত হয়েছে। প্রচারণায় বলা হয়েছে, মুসলিম “অনুপ্রবেশকারীরা” হিন্দুদের জমি দখল করছে, তাদের মেয়েদের নিরাপত্তা বিপন্ন করছে এবং হিন্দু সংস্কৃতিকে ধ্বংস করছে। কিন্তু বাস্তব পরিসংখ্যান এই দাবির ঠিক বিপরীত চিত্র দেখায়।
পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানরা জনসংখ্যার ২৭ শতাংশ। কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতা, সরকারি চাকরি, উচ্চশিক্ষা এবং অর্থনৈতিক সম্পদে তাদের প্রতিনিধিত্ব এই অনুপাতের অনেক নিচে। যে ভোটার তালিকা থেকে ৯০ লক্ষ নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, তার বেশিরভাগ মুসলমান—এটি ঘৃণার শিকার, হুমকির মুখে থাকা সংখ্যালঘুর চিত্র, বিপদে থাকা সংখ্যাগুরুর নয়।
দ্য ওয়্যারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিজেপির বিজয় মূলত হিন্দু ভোটের একত্রীকরণের মাধ্যমে এসেছে—মুর্শিদাবাদের সাম্প্রদায়িক সহিংসতার চক্রকে রাজনৈতিক সুযোগে রূপান্তরিত করে। অর্থাৎ “হিন্দু বিপদে আছে” বলা হয়েছে ভোট পাওয়ার জন্য—আর সেই ভোটের পর বিপদে পড়েছে মুসলমানরাই।
ভারতের সংবিধানে লেখা আছে এটি একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র যেখানে প্রতিটি নাগরিক সমান। কিন্তু যখন একটি রাজনৈতিক দল তার প্রচারণায় একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়কে “অনুপ্রবেশকারী” বলে, ভোটার তালিকা থেকে তাদের নাম মুছে ফেলে, এবং বিজয়ের পরে তাদের মসজিদ ও দোকান ভাঙে—তখন সংবিধানের সেই বাণী কেবল কাগজের উপরেই থাকে।

ভোটার তালিকা থেকে নাগরিকত্ব: একটি ভয়াবহ যাত্রাপথ


পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচনের একটি অশুভ মাত্রা হলো ভোটার তালিকা থেকে নাগরিকত্ব পর্যন্ত বিস্তৃত এই রাজনৈতিক প্রকল্পের ধারাবাহিকতা। এসআইআর প্রক্রিয়ায় যাদের নাম কেটেছে, তারা শুধু এবারের ভোট দিতে পারেননি—তারা “অবৈধ অভিবাসী” তকমার ঝুঁকিতে পড়েছেন। বিজেপি বলছে, এই প্রক্রিয়া বাংলাদেশ থেকে আসা “অনুপ্রবেশকারীদের” চিহ্নিত করছে।
ডিপ্লোম্যাট ম্যাগাজিনের প্রতিবেদনে মেটিয়াবুরুজের ৬৫ বছর বয়সী মাসুদা বিবির কথা আছে। তার নাম ভোটার তালিকা থেকে কেটে গেছে। তিনি বলছেন, “আপনি কি এখানে কোনো বাংলাদেশি দেখতে পাচ্ছেন?” তার ৯ বছরের নাতনি তাকে সান্ত্বনা দিতে জড়িয়ে ধরেছে। তার পরিবারের ৮০ জন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটারের মধ্যে ৩০ জনেরই নাম কেটে গেছে—শুধু “লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি” কারণে।
নাগরিকত্ব সংশোধন আইন (সিএএ) এই প্রেক্ষাপটে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা যোগ করেছে। এই আইন হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পারসি ও খ্রিষ্টান ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতিবেশী দেশ থেকে দ্রুত নাগরিকত্ব দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে—কিন্তু একই সংকটে থাকা মুসলমানদের বাদ দিয়েছে। বিজেপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এলে সিএএ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা হবে। অর্থাৎ ভোটার তালিকা থেকে মুসলমানদের বাদ দেওয়া এবং নাগরিকত্ব আইন থেকে মুসলমানদের বাদ রাখা—এই দুটি প্রক্রিয়া একসূত্রে গাঁথা।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও ভারতীয় গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ


পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশিত হয়েছে। আলজাজিরার সম্পাদকীয় মতামতে বলা হয়েছে, এই নির্বাচন ভারতীয় নির্বাচন প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে পরাজয়ের পরও পদত্যাগ করতে অস্বীকার করেছিলেন—বলেছেন নির্বাচনে অনিয়ম হয়েছে। রাজ্যপাল পরে বিধানসভার মেয়াদ শেষে তাকে অপসারণ করেছেন।
এই প্রেক্ষাপটে ভারতের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক সূচকে অবনতি উদ্বেগজনক। ফ্রিডম হাউস ভারতকে “আংশিক স্বাধীন” হিসেবে চিহ্নিত রেখেছে। ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। জাতিসংঘ-সংযুক্ত মানবাধিকার সংস্থা ভারতের জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের স্বীকৃতি স্থগিত রেখেছে। কিন্তু ভূরাজনৈতিক কারণে পশ্চিমা দেশগুলোর সরাসরি সমালোচনা সীমিত থাকছে।
ভারতের অভ্যন্তরেও প্রশ্ন উঠছে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির এই বিজয় কি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক ফলাফল, নাকি ভোটার তালিকা থেকে ৯০ লক্ষ মানুষের নাম মুছে দেওয়ার অনিয়মের ফসল? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু বাংলার জন্য নয়, ভারতের সামগ্রিক গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্যও নির্ধারক।

উপসংহার: গণতন্ত্রের নামে গণতন্ত্রের মৃত্যু?


২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচন ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বাঁকবদলের মুহূর্ত। এই নির্বাচনে বিজেপির বিজয় নিছক একটি দলের জয় নয়—এটি একটি মতাদর্শের বিজয়, যে মতাদর্শ বিশ্বাস করে ভারত কেবল হিন্দুদের দেশ। কিন্তু ভারতের সংবিধান, স্বাধীনতা সংগ্রামের চেতনা এবং মানবতার মৌলিক নীতি—কোনোটিই এই মতাদর্শকে স্বীকৃতি দেয় না।
“হিন্দু খতরে মে হ্যায়”—এই স্লোগান যখন ক্ষমতার মসনদ থেকে নেমে আসে, তখন সমাজে একটি বিষবৃক্ষ রোপিত হয়। সেই বিষের ফল খায় সমাজের সবচেয়ে দুর্বল মানুষ—যারা ৫০ বছর ধরে নিষ্ঠার সাথে ভোট দিয়ে এসেছেন, যাদের মসজিদ ভাঙা হয়, যাদের দোকান বুলডোজারে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়, যাদের হুমকি দিয়ে এলাকা ছেড়ে যেতে বলা হয়।
ইতিহাস সাক্ষী, যে রাজনীতি সংখ্যালঘুকে শত্রু বানিয়ে ক্ষমতায় আসে, সে রাজনীতি শেষ পর্যন্ত সংখ্যাগুরুকেও মুক্তি দেয় না। কারণ যে রাষ্ট্র তার ২২ কোটি নাগরিককে দ্বিতীয় শ্রেণির মানুষে পরিণত করে, সে রাষ্ট্র প্রথম শ্রেণির নাগরিকদেরও প্রকৃত মুক্তি দিতে পারে না—সে কেবল তাদের ঘৃণার অস্থায়ী আনন্দ দেয়। ভারতের বর্তমান পথ যদি এভাবেই চলতে থাকে, তাহলে ক্ষতি হবে কেবল মুসলমানদের নয়—ক্ষতি হবে ভারতের সেই মহান গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের, যা একদিন সারা বিশ্বের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস ছিল।