মো. হাফিজ উদ্দিন :
পবিত্র হজের অন্যতম অপরিহার্য রুকন হলো সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে সায়ী করা। এই সায়ী শুধু একটি শারীরিক অনুষ্ঠান নয়, বরং ইসলামের ইতিহাসের এক অমর অধ্যায়কে জীবন্ত করে তোলে। এটি হজরত হাজেরা (আ.)-এর সেই অবিস্মরণীয় সংগ্রাম, ধৈর্য, ত্যাগ ও আল্লাহর প্রতি অটুট বিশ্বাসের স্মৃতিকে চিরকালের জন্য ধরে রাখে। যখন কোনো মুসলিম হাজি সাফা থেকে মারওয়ায় এবং মারওয়া থেকে সাফায় সাতবার যাতায়াত করেন, তখন তিনি কেবল একটি ইবাদত সম্পন্ন করেন না, বরং নিজের অন্তরে সেই মরুভূমির তৃষ্ণার্ত মায়ের আর্তনাদ, শিশু ইসমাইল (আ.)-এর কান্না এবং আল্লাহর অসীম দয়ার প্রকাশকে অনুভব করেন। এই সায়ীর মাধ্যমে প্রত্যেক হাজি শিখতে পারেন যে, জীবনের প্রতিকূলতায় শুধু দোয়া নয়, সর্বোচ্চ চেষ্টা ও আল্লাহর উপর পূর্ণ নির্ভরতার সমন্বয়ই সাফল্যের চাবিকাঠি।
ইব্রাহিম (আ.)-এর জীবন ছিল আল্লাহর একনিষ্ঠতা ও আনুগত্যের জ্বলন্ত উদাহরণ। আল্লাহর নির্দেশে তিনি তাঁর প্রিয় স্ত্রী হাজেরা (আ.) ও দুগ্ধপোষ্য পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে নির্জন মক্কা উপত্যকায় রেখে চলে যান। সেই সময় মক্কা ছিল সম্পূর্ণ জনশূন্য, পানি ও খাদ্যের কোনো উৎস ছিল না। কয়েকদিনের মধ্যেই তাদের সঙ্গে থাকা সামান্য পাথেয় শেষ হয়ে যায়। শিশু ইসমাইল (আ.) তৃষ্ণায় কাতর হয়ে কাঁদতে থাকেন। মায়ের হৃদয় তখন ব্যাকুল হয়ে ওঠে। হাজেরা (আ.) শিশুপুত্রকে একটি নিরাপদ স্থানে রেখে পানির অন্বেষণে বেরিয়ে পড়েন। তিনি প্রথমে সাফা পাহাড়ে উঠে চারদিকে তাকান। কিন্তু কোথাও কোনো জনমানবের চিহ্ন নেই। তারপর তিনি দ্রুত মারওয়া পাহাড়ের দিকে ছুটে যান। সেখান থেকেও কিছু দেখতে না পেয়ে আবার সাফায় ফিরে আসেন। এভাবে তিনি সাতবার সাফা ও মারওয়ার মাঝে ছুটাছুটি করেন। তাঁর এই অক্লান্ত প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় একজন মায়ের অসীম ভালোবাসা এবং আল্লাহর উপর গভীর আস্থা।
এই ছুটাছুটির এক পর্যায়ে আল্লাহ তাঁর দয়ায় শিশু ইসমাইল (আ.)-এর পায়ের নিচে পানির ফোয়ারা বের করে দেন। সেই পানির উৎসই আজকের বিখ্যাত জমজম কূপ। এই ঘটনা শুধু একটি অলৌকিক ঘটনা নয়, বরং তাওয়াক্কুলের জীবন্ত প্রমাণ। হাজেরা (আ.) আল্লাহর নির্দেশ মেনে স্বামীর সঙ্গে এই নির্জন স্থানে এসেছিলেন। তিনি জানতেন আল্লাহ কখনো তাঁর সৃষ্টিকে অরক্ষিত রাখবেন না। তবুও তিনি নিষ্ক্রিয় বসে থাকেননি। তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। এখান থেকেই আমরা শিখি যে, তাওয়াক্কুল মানে অলসতা নয়, বরং চেষ্টার পর আল্লাহর উপর ভরসা করা। সহিহ বুখারিতে বর্ণিত হয়েছে যে, এই ঘটনার স্মৃতিতেই মুসলিমরা সায়ী করে থাকেন।
কুরআনুল কারিমে আল্লাহ স্পষ্টভাবে সাফা ও মারওয়াকে তাঁর নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত বলে ঘোষণা করেছেন। সুরা বাকারার ১৫৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং যারা কাবাঘরে হজ বা ওমরা করে, তাদের জন্য এ দুটিতে প্রদক্ষিণ করাতে কোনো সমস্যা নেই।” এই আয়াতটি সায়ীর বৈধতা ও গুরুত্বকে সুস্পষ্ট করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে সায়ী করেছেন এবং সাহাবায়ে কেরামকে এর নির্দেশ দিয়েছেন। হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে যে, নবীজি (সা.) সাফা পাহাড়ে উঠে কাবার দিকে মুখ করে দীর্ঘ সময় দোয়া করতেন। তিনি বলতেন, “আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার…” এবং অন্যান্য দোয়া পাঠ করতেন। সাহাবিরা তাঁর এই আমল অনুসরণ করেছেন।
সায়ী হজ ও ওমরার অপরিহার্য অংশ। হানাফি মাজহাব অনুসারে এটি ওয়াজিব। যদি কোনো হাজি ইচ্ছাকৃতভাবে সায়ী ত্যাগ করেন, তাহলে তাকে দম (কোরবানি) দিতে হয়। এর ফজিলত অপরিমেয়। একটি হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন যে, সাফা-মারওয়ায় সায়ী করা সত্তর জন দাস মুক্ত করার সমতুল্য। এই কথাটি আমাদেরকে বুঝিয়ে দেয় যে, এই ইবাদতের মাধ্যমে কত বড় সওয়াব অর্জন করা যায়। সায়ী শুধু শারীরিক পরিশ্রম নয়, এটি আত্মার পরিশুদ্ধি ও আল্লাহর স্মরণের এক অনন্য মাধ্যম।
সায়ীর নিয়ম-পদ্ধতি অত্যন্ত সুন্নাহভিত্তিক। সাফা পাহাড় থেকে সায়ী শুরু করতে হয়। সাফায় উঠে কাবার দিকে মুখ করে তাকবির, তাহলিল ও দোয়া পাঠ করা সুন্নত। তারপর মারওয়ার দিকে যেতে হয়। একবার সাফা থেকে মারওয়া গেলে এক চক্কর পূর্ণ হয়। এভাবে সাত চক্কর সম্পন্ন করতে হয়, যার শেষ চক্কর মারওয়ায় শেষ হবে। পুরুষদের জন্য সাফা ও মারওয়ার মাঝখানের সবুজ আলোকিত অংশে দ্রুত চলা বা হালকা দৌড়ানো (রমল) সুন্নত। নারীরা স্বাভাবিক গতিতে হেঁটে সায়ী করবেন। সায়ীর সময় অজু থাকা উত্তম, তবে বাধ্যতামূলক নয়। পুরো সময় জুড়ে আল্লাহর জিকির, দরূদ শরিফ পাঠ এবং কুরআন তিলাওয়াত করা অত্যন্ত উত্তম।
আধুনিক যুগে সায়ীর পথটি সম্পূর্ণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এবং আরামদায়ক করা হয়েছে। এয়ার কন্ডিশনিং, সুবিধাজনক রাস্তা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা হাজিদের জন্য সহজ করে দিয়েছে। কিন্তু এই আরামের মধ্যেও আমাদের সেই প্রাচীন মরুভূমির তাপ, ধুলো ও তৃষ্ণার কথা স্মরণ করা উচিত। হাজেরা (আ.) যখন পাথুরে মাটিতে পা ফেলছিলেন, তখন কোনো আরাম ছিল না। তাঁর পায়ের চিহ্ন আজও আমাদের অন্তরে জাগ্রত রাখতে হবে। অনেক হাজি সায়ীর সময় মোবাইলে ছবি বা ভিডিও তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এতে ইবাদতের একাগ্রতা নষ্ট হয়। সায়ীকে খাঁটি ইবাদত হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। চোখ বন্ধ করে হাজেরা (আ.)-এর সেই মুহূর্তগুলো কল্পনা করলে অন্তরে এক অপূর্ব অনুভূতি জাগবে।
সায়ীর আধ্যাত্মিক শিক্ষা অত্যন্ত গভীর। এটি আমাদের শেখায় যে, জীবনের প্রতিটি সংকটে আমরা যেন হাল ছেড়ে না দিই। হাজেরা (আ.)-এর জীবন আমাদের বলে যে, আল্লাহর উপর ভরসা রেখে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। আজকের দুনিয়ায় আমরা অনেক সমস্যার সম্মুখীন হই—অর্থনৈতিক, সামাজিক, পারিবারিক। এসব ক্ষেত্রে শুধু দোয়া করে বসে থাকলে চলবে না। হাজেরা (আ.)-এর মতো আমাদেরও ছুটতে হবে, চেষ্টা করতে হবে। তারপর ফলাফল আল্লাহর উপর ছেড়ে দিতে হবে। এই শিক্ষা আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে বদলে দিতে পারে। যে ব্যক্তি সায়ী করে তার অন্তরে ধৈর্য, সংকল্প এবং আস্থা বৃদ্ধি পায়।
সায়ী শুধু হজের অংশ নয়, এটি মানব জীবনের একটি প্রতীক। সাফা থেকে মারওয়া যাওয়া যেন আশা থেকে আশায় যাত্রা। কখনো সফলতা, কখনো হতাশা—কিন্তু সাতবার যাতায়াতের মাধ্যমে ধৈর্যের পরীক্ষা সম্পন্ন হয়। শেষ পর্যন্ত আল্লাহর রহমতে জমজমের মতো বরকতময় ফল লাভ হয়। আজকের হাজিরা যখন এই পথে চলেন, তখন তাদের সঙ্গে লাখ লাখ মুসলিমের ইতিহাস মিশে যায়। বিভিন্ন দেশ, বিভিন্ন ভাষা, বিভিন্ন বর্ণের মানুষ একই ইবাদতে অংশ নেয়। এটি ইসলামের ঐক্যেরও প্রতীক।
হজের অন্যান্য কাজের সঙ্গে সায়ী সম্পন্ন করার পর হাজিরা এক অপূর্ব প্রশান্তি অনুভব করেন। তাদের মনে হয় যেন তারা হাজেরা (আ.)-এর সঙ্গে সেই মরুভূমিতে ছিলেন। এই অনুভূতি তাদের জীবনকে নতুন করে সাজাতে সাহায্য করে। অনেকে ফিরে এসে বলেন যে, সায়ীর সময় তাদের চোখে অশ্রু এসেছে, অন্তরে পরিবর্তন এসেছে। এটাই হজের সার্থকতা।
সায়ীর ফজিলত সম্পর্কে আরও অনেক হাদিস বর্ণিত আছে। বিভিন্ন ইসলামী স্কলাররা এর তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেছেন। ইমামগণ বলেন যে, সায়ী মানুষকে তার নফসের সাথে সংগ্রাম করতে শেখায়। শারীরিক ক্লান্তি সত্ত্বেও ইবাদত চালিয়ে যাওয়া আত্মশক্তির পরিচয়। বিশেষ করে গরমের সময় বা ভিড়ের মধ্যে এই ইবাদত করা আরও বেশি সওয়াবের কারণ হয়।
আমাদের উচিত সায়ীকে শুধু হজের সময় সীমাবদ্ধ না রেখে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে তার শিক্ষা অনুসরণ করা। যখন কোনো সমস্যা আসে, তখন হাজেরা (আ.)-এর মতো চেষ্টা করব, দোয়া করব এবং আল্লাহর উপর ভরসা রাখব। এই মানসিকতা আমাদেরকে সফলকামী করে তুলবে।
সাফা-মারওয়ার সায়ী তাই শুধু একটি হজের অনুষ্ঠান নয়, বরং একটি জীবনদর্শন। এটি প্রজন্মের পর প্রজন্মকে শেখায় যে, আল্লাহ যাদেরকে ভালোবাসেন, তাদেরকে পরীক্ষা করেন। আর সেই পরীক্ষায় যারা ধৈর্য ধরে চেষ্টা করে, আল্লাহ তাদেরকে সম্মানিত করেন। হাজেরা (আ.) আজও প্রত্যেক মুসলিম নারীর কাছে আদর্শ। তাঁর ত্যাগের কারণে আজ বিশ্বের লাখ লাখ মানুষ জমজমের পানি পান করে বরকত লাভ করে।
প্রত্যেক হাজির উচিত সায়ীর সময় মনকে পুরোপুরি ইবাদতে নিমগ্ন রাখা। পরিবারের জন্য, উম্মাহর জন্য, নিজের গুনাহ মাফের জন্য দোয়া করা। এতে সায়ীর পূর্ণ সওয়াব লাভ হবে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিকভাবে হজ ও ওমরা আদায় করার তাওফিক দান করুন এবং সাফা-মারওয়ার সায়ীর মাধ্যমে আমাদের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করুন। আমিন।