মো. হাফিজ উদ্দিন:
ব্যাক পেইন বা পিঠের ব্যথা এমন একটি সমস্যা যা প্রায় সব শ্রেণি ও পেশার মানুষকেই কমবেশি ভোগায়। শহরের অফিস কর্মী থেকে শুরু করে গ্রামের কৃষক, যুবক থেকে বয়স্ক সবাই এই সমস্যায় আক্রান্ত হন। এটি শুধু শারীরিক অস্বস্তি নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করে, কাজের দক্ষতা কমিয়ে দেয় এবং মানসিক চাপও বাড়ায়। সিঙ্গাপুরের কেটিপিএইচের রেসিডেন্ট ফিজিশিয়ান এবং এনাম মেডিকেল কলেজের রিউমাটোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ডা. হাবিব ইমতিয়াজ আহমাদের মতো বিশেষজ্ঞরা এই সমস্যা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন, যা আমাদের সচেতনতা বাড়াতে সাহায্য করে।
পিঠের ব্যথা সাধারণত দুই ভাগে বিভক্ত। একটি হলো আপার ব্যাক বা পিঠের উপরের অংশ, যা পাঁজরের উপরিভাগ পর্যন্ত বিস্তৃত। আরেকটি হলো লোয়ার ব্যাক বা নিচের পিঠ, যা পাঁজরের নিচ থেকে নিতম্ব পর্যন্ত চলে। অনেকেই কোমরের ব্যথাকেই ব্যাক পেইন বলে চিহ্নিত করেন এবং এটিই সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। লোয়ার ব্যাক পেইনের রোগীদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি কারণ এই অংশটি শরীরের ওজন বহন করে, নড়াচড়ার সাথে সরাসরি যুক্ত থাকে এবং দৈনন্দিন কাজকর্মে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ে। ব্যাক পেইন যেকোনো বয়সে হতে পারে, তবে বয়সভেদে এর কারণও ভিন্ন হয়। শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে আঘাত বা ভুল ভঙ্গি প্রধান কারণ হতে পারে, যেখানে বয়স্কদের ক্ষেত্রে হাড়ের ক্ষয় বা আর্থ্রাইটিস মূল ভূমিকা পালন করে।
ব্যাক পেইনের কারণগুলো নানাবিধ এবং জটিল। সবচেয়ে সাধারণ কারণ হলো মাংসপেশীতে টান পড়া বা লিগামেন্টে (রগে) আঘাত। হঠাৎ ভারী জিনিস তোলা, অস্বাভাবিকভাবে ঘুরে যাওয়া বা পড়ে যাওয়ার ফলে এমন টান লাগতে পারে যা তীব্র ব্যথার সৃষ্টি করে। সায়াটিকা রোগও একটি বড় কারণ। সায়াটিকা হলে মেরুদণ্ডের নিচের অংশ থেকে পায়ের দিকে স্নায়ুতে চাপ পড়ে, যার ফলে ব্যথা কোমর থেকে পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। এটি প্রায়শই ডিস্কের সমস্যার কারণে হয়, যেখানে মেরুদণ্ডের মাঝের নরম ডিস্ক সরে গিয়ে স্নায়ুকে চেপে ধরে। দীর্ঘসময় একই ভঙ্গিতে বসে কাজ করা, বিশেষ করে কম্পিউটারের সামনে ঝুঁকে বসা, নিচু চেয়ারে বসা বা ভুল পোসচারে দাঁড়িয়ে থাকা আধুনিক জীবনের একটি প্রধান কারণ। অফিস কর্মীরা যারা সারাদিন চেয়ারে বসে থাকেন, তাদের মেরুদণ্ডের উপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে এবং পেশীগুলো দুর্বল হয়ে যায়।
ভারী কাজ করা বা ভারী বস্তু তোলার অভ্যাসও ব্যাক পেইন ডেকে আনে। কৃষক, শ্রমিক বা গৃহিণীরা যারা প্রতিদিন ভারী জিনিস তুলতে বাধ্য হন, তাদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি বেশি। শরীরের সঠিক যান্ত্রিকতা না মেনে জিনিস তোললে মেরুদণ্ডের উপর অসম চাপ পড়ে। আর্থ্রাইটিস, বিশেষ করে স্পন্ডাইলো আর্থ্রাইটিস বা অস্টিওআর্থ্রাইটিসও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। এতে মেরুদণ্ডের জয়েন্টগুলো প্রদাহিত হয় এবং হাড়ের ক্ষয় শুরু হয়। বয়স বাড়ার সাথে সাথে হাড়ের ঘনত্ব কমে যায়, যাকে অস্টিওপোরোসিস বলা হয়। এই ক্ষয়ের ফলে হাড় ভঙ্গুর হয়ে যায় এবং সামান্য চাপেই ফ্র্যাকচার হতে পারে, যা তীব্র ব্যথার কারণ হয়। সংক্রমণজনিত কারণেও ব্যথা হতে পারে, যেমন স্পাইনাল ইনফেকশন বা টিবি। এসব ক্ষেত্রে ব্যথার সাথে জ্বর, শরীর দুর্বল হওয়া ইত্যাদি লক্ষণ দেখা যায়।
অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা মেরুদণ্ডের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। প্রতি কেজি অতিরিক্ত ওজন মেরুদণ্ডের জন্য অতিরিক্ত লোড হয়ে দাঁড়ায়। এছাড়া ক্যানসার আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে যদি ক্যানসার মেরুদণ্ডে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে ব্যাক পেইন একটি গুরুতর সংকেত হতে পারে। অন্যান্য কারণের মধ্যে রয়েছে মেরুদণ্ডের বক্রতা (স্কোলিওসিস), স্পন্ডাইলোলিস্থেসিস যেখানে একটি কশেরুকা সরে যায়, বা দীর্ঘদিন স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ সেবনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। মানসিক চাপও পরোক্ষভাবে ভূমিকা রাখে কারণ স্ট্রেসের ফলে পেশী শক্ত হয়ে যায় এবং ভঙ্গি খারাপ হয়।
ব্যাক পেইনের লক্ষণ প্রধানত ব্যথা। এটি হালকা থেকে তীব্র হতে পারে। কখনো এটি নিস্তেজ ব্যথা হয় যা সারাদিন থাকে, আবার কখনো ছুরিকাঘাতের মতো তীব্র হয় যা নড়াচড়ায় বাড়ে। লোয়ার ব্যাকের ব্যথা প্রায়শই নিতম্ব বা পায়ে ছড়িয়ে পড়ে, বিশেষ করে সায়াটিকায়। সংক্রমণ হলে জ্বর, ওজন কমে যাওয়া, ক্ষুধামন্দা দেখা দেয়। কিছু ক্ষেত্রে পা অবশ হয়ে যায়, দুর্বলতা অনুভূত হয় বা হাঁটতে সমস্যা হয়। তবে সবচেয়ে গুরুতর লক্ষণগুলোকে রেড ফ্ল্যাগ বলা হয়। যদি ব্যথার সাথে জ্বর থাকে, অকারণে ওজন কমে, শরীরের একপাশ দুর্বল হয়, পায়খানা-প্রস্রাব নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যায়, বা আগে থেকে ক্যানসারের ইতিহাস থাকে, তাহলে অবিলম্বে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত। বয়স ২০ এর নিচে বা ৬৫ এর উপরে হলে, দুর্ঘটনার পর ব্যথা হলে বা দীর্ঘদিন স্টেরয়েড খেলে এসব লক্ষণ আরও সতর্কতার দাবি রাখে। এগুলো গুরুতর রোগের ইঙ্গিত দিতে পারে যেমন টিউমার, ফ্র্যাকচার বা স্নায়ুর গুরুতর ক্ষতি।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কারণ নির্ণয়। ডাক্তার প্রথমে ইতিহাস নেন, শারীরিক পরীক্ষা করেন এবং প্রয়োজনে এক্স-রে, এমআরআই বা সিটি স্ক্যান করান। যদি ব্যথা মাংসপেশীর টান বা ভুল ভঙ্গির কারণে হয়, তাহলে বিশ্রাম, ব্যথানাশক ওষুধ এবং লাইফস্টাইল পরিবর্তনই যথেষ্ট। প্যারাসিটামল বা আইবুপ্রোফেনের মতো ওষুধ ব্যথা ও প্রদাহ কমায়। গরম সেঁক ব্যথার জায়গায় রক্ত চলাচল বাড়িয়ে আরাম দেয়, আবার নতুন আঘাতে বরফ সেঁক ফোলা কমায়। ফিজিওথেরাপি অত্যন্ত কার্যকর। এতে বিশেষ ব্যায়ামের মাধ্যমে পেশী শক্তিশালী করা হয়, নমনীয়তা বাড়ানো হয় এবং সঠিক ভঙ্গি শেখানো হয়। ম্যাসাজ থেরাপি, আকুপাংচার বা ইলেকট্রিক্যাল স্টিমুলেশনও সাহায্য করতে পারে।
আর্থ্রাইটিসের ক্ষেত্রে অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি ওষুধ বা ডিএমএআরডি জাতীয় ওষুধ দেওয়া হয়। হাড় ক্ষয় রোধে ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি এবং বিসফসফোনেট জাতীয় ওষুধ ব্যবহার হয়। সায়াটিকার জন্য নার্ভের চাপ কমানোর ওষুধ, ফিজিওথেরাপি এবং গুরুতর ক্ষেত্রে ইনজেকশন দেওয়া হয়। যদি কনজারভেটিভ ট্রিটমেন্টে উন্নতি না হয় এবং ডিস্ক সমস্যা গুরুতর হয়, তাহলে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন পড়তে পারে। মাইক্রোডিসেকটমি বা ল্যামিনেকটমির মতো সার্জারিতে চাপমুক্ত করা হয়। তবে অস্ত্রোপচার সবসময় শেষ অপশন।
প্রতিরোধই সবচেয়ে ভালো চিকিৎসা। ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত জরুরি। সুষম খাদ্যাভ্যাস, কম ক্যালরির খাবার এবং নিয়মিত ব্যায়ামের মাধ্যমে ওজন কমিয়ে মেরুদণ্ডের চাপ কমানো যায়। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটাহাঁটি করুন। যোগব্যায়াম, পাইলেটস বা সাঁতারের মতো ব্যায়াম মেরুদণ্ডকে শক্তিশালী করে। সঠিক ভঙ্গিতে বসা শিখুন। চেয়ারে বসার সময় পিঠ সোজা রাখুন, লাম্বার সাপোর্ট ব্যবহার করুন এবং প্রতি ৩০-৪৫ মিনিট পর পর উঠে হাঁটুন। নিচু টুল বা পিঁড়িতে বসা এড়িয়ে চলুন। হাই কমোড ব্যবহার করুন যাতে বাথরুমে নিচু হয়ে বসতে না হয়। ভারী জিনিস তোলার সময় হাঁটু ভেঙে নিচু হোন, পিঠ সোজা রাখুন এবং শরীরের কাছাকাছি রেখে তুলুন।
দীর্ঘক্ষণ একই ভঙ্গিতে না থেকে মাঝে মাঝে পজিশন চেঞ্জ করুন। ঘুমানোর সময় পাশ ফিরে শোয়া ভালো, হাঁটুর নিচে বালিশ রাখুন। জুতো আরামদায়ক হওয়া উচিত, উঁচু হিল এড়ান। ধূমপান ত্যাগ করুন কারণ এটি হাড়ের স্বাস্থ্য নষ্ট করে। মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নিন, স্ট্রেস কমানোর জন্য মেডিটেশন করুন। কর্মক্ষেত্রে এরগনোমিক ফার্নিচার ব্যবহার করুন। নিয়মিত চেকআপ করান, বিশেষ করে বয়স বাড়লে বোন ডেনসিটি টেস্ট করুন।
ব্যাক পেইন শুধু একটি শারীরিক সমস্যা নয়, এটি জীবনযাত্রার প্রতিফলন। আধুনিক জীবনে বসে কাজ করা, মোবাইলের অতিরিক্ত ব্যবহার, ব্যায়ামের অভাব এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এই সমস্যাকে বাড়িয়ে তুলছে। তবে সচেতনতা এবং সঠিক পদক্ষেপের মাধ্যমে এটি অনেকাংশে প্রতিরোধযোগ্য। যদি ব্যথা শুরু হয়, তাহলে সেল্ফ মেডিকেশন না করে ডাক্তারের পরামর্শ নিন। ফিজিওথেরাপিস্টের সাথে কাজ করে শক্তিশালী পেশী গড়ে তুলুন। সঠিক খাদ্যে ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি, প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার যেমন দুধ, ডিম, মাছ, সবজি অন্তর্ভুক্ত করুন।
অনেকে ভাবেন ব্যথা হলে বিছানায় শুয়ে থাকাই ভালো, কিন্তু এটি ভুল। হালকা নড়াচড়া এবং অ্যাকটিভ থাকা দ্রুত সুস্থ করে। দীর্ঘমেয়াদি ব্যথায় কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি সাহায্য করতে পারে যাতে ব্যথা মোকাবিলায় মানসিকভাবে প্রস্তুত হওয়া যায়। গবেষণায় দেখা গেছে যে ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে সঠিক চিকিৎসায় কয়েক সপ্তাহের মধ্যে উন্নতি হয়। তবে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করলে এই সমস্যা থেকে অনেক দূরে থাকা সম্ভব।
পরিশেষে বলা যায়, ব্যাক পেইন আমাদের শরীরের সতর্কবার্তা। এটি উপেক্ষা না করে সময়মতো যত্ন নিলে সুস্থ জীবনযাপন করা সম্ভব। নিয়মিত ব্যায়াম, সঠিক ভঙ্গি, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাস্থ্য সচেতনতা দিয়ে আমরা এই সাধারণ সমস্যাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারি। যদি আপনি বা আপনার পরিবারের কেউ এই সমস্যায় ভুগে থাকেন, তাহলে আজই একজন বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলুন এবং সুস্থ জীবনের পথে এগিয়ে যান।