মঙ্গলবার, ২৬ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১২ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
৮ জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

সীমান্তে বিজিবির বাড়তি দায়িত্বের নতুন সন্ধিক্ষণ

মোস্তফা কামাল :

হিম্মত-হেডম কাকে বলে, আবারো দেখালো বাংলাদেশের সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী বিজিবি। সিলেট গোয়াইনঘাটের সোনারহাট সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) আকস্মিক গুলির জবাবে তাৎক্ষণিক পাল্টা ফায়ারে বিজিবির কড়া বার্তা, আগের দিন বাঘে খেয়ে ফেলেছে।

বিজিবির এমন দৃঢ়, সাহসী ও পেশাদার পদক্ষেপে বিনা রক্তপাতে দ্রুত নিয়ন্ত্রণে চলে আসে সীমান্ত পরিস্থিতি। উদ্ভূত ঘটনার পর থেকে সীমান্ত এলাকায় বিজিবির টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি ব্যাপক জোরদার করা হয়েছে। সীমান্তে যেকোনো ধরনের উসকানিমূলক ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা রুখে দিতে ক’দিন ধরে বাহিনীটি অবস্থানে আরো সতর্ক। সেদিনের ঘটনা ছিল থ্রিলে ভরা।

বিএসএফ আসছিল সীমান্তে ১৫০ গজের ভেতরে বেড়া দেওয়ার জন্য। বিএসএফের সঙ্গে আরো বেশ কয়েকজন সিভিলিয়ান ছিল। বিজিবি সেখানে নিষেধ করে বেড়া না দিতে। তারপর ভারতীয় সিভিলিয়ানরা বিজিবির সঙ্গে তর্কাতর্কিতে লিপ্ত হয়।
এক পর্যায়ে সিভিলিয়ান বিজিবিকে বলে ‘এই তুমি কে’? এরপর বিজিবি সদস্যদের পাল্টা প্রশ্ন- ‘তুমি কে’? তোমার এখানে কাজ কী? এখানে কথা হবে বিজিবি এবং বিএসএফের! তুমি কে? আর একটা কথাও বলবা না!

দীর্ঘক্ষণ বিজিবির দৃঢ় অবস্থান ও তর্কাতর্কির এক পর্যায়ে সেই সিভিলিয়ান পিছু হটতে বাধ্য হয়। এ সময়ের জন্য সীমান্তে এটি বিএসএফকে চোখে চোখ রেখে বিজিবির স্পষ্ট বার্তা। বেশ ইন্টারেস্টিং ছিল, বিজিবি একবারের জন্যও হিন্দিতে কথা বলেনি। ছাফছাফ বাংলায় জানিয়ে দিয়েছে, বুঝলে বুঝবে না বুঝলে শিখে নেবে। বিএসএফ ঠিকই বুঝেছে এবং বুঝেশুনে মাথা নুইয়ে ফিরে গেছে।
সীমান্তে অবৈধ খুঁটি স্থাপন ও বিনা উসকানিতে গুলি চালানোর এ কড়া প্রতিবাদ বিজিবির সাম্প্রতিক সময়ে বীরত্বপূর্ণ ও অনমনীয় অবস্থানের জানান দেয়া।

পাটগ্রাম সীমান্তেও বিএসএফ অবৈধভাবে খুঁটি স্থাপনের চেষ্টা করলে বিজিবির কঠোর বাধার মুখে তা অপসারণ করতে বাধ্য হয়। বিজিবির এমন দৃঢ় পদক্ষেপ দেশজুড়ে প্রশংসিত। সেইসাথে অপ্রকাশিত তথ্য হচ্ছে, সীমান্তে বিজিবি সদস্যরা এবার আরো ঈদ আনন্দহীন। দায়িত্বের চাপে এমনিতেই চারদিকে যখন ঈদের আনন্দ আর নাড়ির টানে বাড়ি ফেরার উৎসব, তখন সীমান্তের দুর্গমে বিজিবি সদস্যদের দিনাতিপাত অনেকেরই অজানা। পরিবারের সঙ্গে সেমাই-পায়েসের স্বাদ নয়, বরং হাতে রাইফেল আর বুকে দেশপ্রেম নিয়ে সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরা দেয় তারা। গত মাস কয়েক ধরে তাদের কাজের চাপ আরো বাড়বাড়ন্ত। বিশেষ করে সীমান্ত দিয়ে যাতে কোনোভাবেই জ্বালানি তেল পাচার না হতে পারে, সে লক্ষ্যে তাদের কাজের পরিধি সাধারণের ধারণারও বাইরে।

সীমান্তের প্রহরী বলা হলেও বিজিবি কেবলই সীমান্তের বাহিনী নয়। কাজের পরিধি বিস্তর। বাহিনীটি পথচলায় শুধু ইতিহাস নয়, গর্বেরও। সীমান্ত নিরাপত্তা ও জাতীয় আস্থার প্রতীক হিসেবে ৩৬৫ দিনের প্রতিটি ঘণ্টা তাদের কাজ করতে হয়। রোদ-বৃষ্টি-ঝড়েও দুর্গম সীমান্ত এলাকায় দিনরাত টহল দেওয়া, অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলন বন্ধ করা এবং বন্যা বা অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে ত্রাণ ও চিকিৎসা সহায়তা দিয়ে অভ্যস্ত তারা। মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান, মানব পাচার, অবৈধ পণ্য প্রবাহ এবং পুশ-ইন প্রতিরোধে বিজিবি কাজ করছে ঘটা করে নয়, নিয়মিত কাজের মতো করে। কক্সবাজার ও বান্দরবান সীমান্তে বিজিবির কাজের পরিধি অনেকের ধারণার বাইরে।

বাংলাদেশের ২৭১ কিলোমিটার সীমান্ত দিয়ে মিয়ানমার থেকে ইয়াবা, আইসের (ক্রিস্টাল মেথ) মতো মাদক পাচার বন্ধ করা বড় কঠিন কাজ। এই কঠিনকে জয় করেই তাদের এগিয়ে চলা। আর এমন অভিযাত্রার মধ্যেই মাঝেমধ্যে শুনতে হয় সীমান্ত হত্যার মন্দ খবর।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিএসএফের হাতে ৩৪ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ২৪ জন গুলিতে এবং ১০ জন শারীরিক নির্যাতনে মারা যান। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৩০, ২০২৩ সালে ৩১, ২০২২ সালে ২৩ এবং ২০২১ সালে ১৮ জন। আর ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসেই, অর্থাৎ গত সপ্তাহের হত্যাকাণ্ডের আগেই আরও অন্তত চারজনের নাম এই তালিকায় যুক্ত হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার সময় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, আগের সরকারগুলোর ‘নিষ্ক্রিয় ও নতজানু’ নীতির অবসান ঘটাবে তারা। এই সীমান্তকে বিশ্বের ‘সবচেয়ে প্রাণঘাতী সীমান্ত’ আখ্যা দেয়া হয়েছিল। সীমান্ত হত্যাকে ‘ইচ্ছাকৃত’ দাবি করে জাতিসংঘের তদন্ত দাবি করাও হয়েছে। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারেও রয়েছে ‘সীমান্ত হত্যা, পুশ-ইন এবং চোরাচালান’ বন্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার প্রতিশ্রুতি। এর বিপরীতে বিএসএফের মাঝে তাদের চরিত্র বদলানোর নমুনা নেই। মাঝে মাঝে একটু আধটু ঝিম ধরে। বিরতি দিয়ে আবার ঘটায় একই ঘটনা। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির শুভেন্দু অধিকারীদের বিজয়ের পর সীমান্তে নতুন করে টোকা দেয়া হচ্ছে। পুশ-ইনের ডঙ্কাও বাজানো হচ্ছে। বর্তমানের সীমান্ত পরিস্থিতি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি ভিন্ন।

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২০৭টি আসনে বিজেপির বিশাল জয়ের পেছনে একটি বড় নিয়ামক ছিল বাংলাদেশ, অবৈধ অনুপ্রবেশ ও জনমিতি পরিবর্তনের (ডেমোগ্রাফিক চেঞ্জ) বয়ান। সেই নির্বাচনী বাগাড়ম্বর এখন সরকারি নীতিতে পরিণত হয়েছে। আসাম ও ত্রিপুরায় বিজেপির টানা আধিপত্য এবং ভারতের পূর্বাঞ্চলের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে তাদের প্রভাব—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের পশ্চিম ও উত্তর-পূর্ব সীমান্তে হিন্দুত্ববাদী শক্তির এমন একচ্ছত্র আধিপত্য আগে কখনো দেখায়নো যায়নি। কথায় কথায় পুশ-ইনের হুমকি, সীমান্তে বেড়া দেয়া তাদের একটি রাজনীতি। বিষয়টি একদম নতুনও নয়।

আশির দশকে ভারতে অবৈধ অনুপ্রবেশ একটি বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৮৯ সাল থেকে নয়াদিল্লি সীমান্ত বেড়া দেওয়ার কাজ শুরু করে। তখন থেকেই বিএসএফের হাতে বাংলাদেশি নাগরিকদের মৃত্যুর ঘটনা নিয়মিত হয়ে ওঠে।

মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের বরাত দিয়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) জানিয়েছে, ২০০১ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে—বাজপেয়ী সরকারের শেষ বছর এবং মনমোহন সিংয়ের ইউপিএ প্রশাসনের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুর সময়টায় প্রায় এক হাজার বাংলাদেশি বিএসএফের হাতে নিহত হন। বিজেপি সরকারের আমলেও সীমান্ত হত্যা অব্যাহত রয়েছে। সেখানে এখন যোগ হয়েছে রাজনৈতিক রং-বেরং।

পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পরিসরে এখন বাঙালি সংহতি প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে। সীমান্তের প্রতি ইঞ্চি এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া দেওয়াকে দায়িত্ব হিসেবে নিয়েছে নতুন রাজ্য সরকার। আর কথিত অনুপ্রবেশকারীদের পুশ-ইন বা খেদানো হলো তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ।

বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ৭ মে থেকে এ বছরের ২৬ জানুয়ারির মধ্যে ৩২টি জেলার সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে ২ হাজার ৪৭৯ জনকে বাংলাদেশে ‘পুশ-ইন’ করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ১২০ জনকে ভারতীয় হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।

আলামত বলছে, সামনে পুশ-ইন আরও ব্যাপকতা পাবে। ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী প্রচারণায় অনুপ্রবেশকে প্রধান ইস্যু করেছিলেন। তার সঙ্গে সুর মিলিয়েছেন বিজেপির সর্বস্তরের নেতারা।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘ভারতের আইন, পদ্ধতি ও দ্বিপক্ষীয় চুক্তি অনুযায়ী, অবস্থানরত সব অবৈধ বিদেশি নাগরিককে তাদের দেশে ফেরত পাঠানো হবে।’

তিনি আরও জানান, বাংলাদেশে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য ২ হাজার ৮৬২টি মামলা এখনো ঝুলে আছে। ভারতের সঙ্গে সীমান্ত উত্তেজনার কেন্দ্রে রয়েছে এই কাঁটাতারের বেড়া। ৪ হাজার ৯৬.৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তের মধ্যে ৩ হাজার ২৩২ কিলোমিটার এরই মধ্যে ঘেরা হয়ে গেছে। ভারতের এই বেড়া নির্মাণ ১৯৭৫ সালের যৌথ নির্দেশনার লঙ্ঘন। ওই নির্দেশনায় সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে প্রতিরক্ষামূলক কোনো স্থাপনা নির্মাণের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কিন্তু ভারত এই তারের বেড়াকে প্রতিরক্ষামূলক স্থাপনা বলে মনে করে না। এই সংজ্ঞা নিয়ে বিরোধের আজ পর্যন্ত কোনো সুরাহা হয়নি।

মালদহ জেলায় বিএসএফ-বিজিবি সংঘর্ষের পর ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বেড়া নির্মাণের কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ করে বিএসএফ। কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তা আবার শুরু হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকার প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকেই সীমান্ত বেড়া নির্মাণে বিএসএফকে প্রায় ৬০০ একর জমি হস্তান্তরের অনুমোদন দিয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা দিয়েছেন, জমি হস্তান্তর ৪৫ দিনের মধ্যে শেষ হবে। তবে বর্তমানে ভারত কেবল বেড়া দেওয়াতেই আটকে নেই। ২০২৬ সালের ২৬ মার্চ বিএসএফের এক অভ্যন্তরীণ নথিতে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের মাঠপর্যায়ের ইউনিটগুলোকে একটি নির্দেশ দেওয়া হয়।

বাংলাদেশ এসবের বিরুদ্ধে কড়া প্রতিবাদ করে আসছে। ‘বাংলাদেশ কাঁটাতারের বেড়া নিয়ে ভীত নয়’- বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা এম হুমায়ুন কবীর।

ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনারকে ডেকে এনে জানিয়ে দেয়া হয়েছে, বাংলাদেশ সীমান্তে আর কোনো হত্যা দেখতে চায় না। ভারতের মতিগতি তার মতোই। বাংলাদেশের জন্য এটি উদ্বেগের। আর সীমান্ত বাহিনীর জন্য কাজের বাড়তি ভলিউম। সামনের দিনগুলোতে আরো বেশি কাজ করতে হবে তাদের। মাঠপর্যায়েও বিজিবির গোয়েন্দা তৎপরতাসহ নজরদারি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বেনাপোল সীমান্তে গত ৭ মে থেকে যশোর-৪৯ বিজিবি ও খুলনা-২১ বিজিবির অধীনে প্রায় ১০২ কিলোমিটার এলাকার নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। রঘুনাথপুর, শিকারপুর, সাদিপুর, ঘীবা, পুটখালী, গোগা, দৌলতপুর এবং রুদ্রপুরের মতো একাধিক পয়েন্টে অতিরিক্ত জওয়ান মোয়েন করা হয়েছে। সীমান্ত এলাকায়, বিশেষ করে রাতে অপ্রয়োজনীয় চলাফেরার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রামসহ বেশ কিছু সীমান্তে বিজিবির কর্মযজ্ঞ বেশি দৃশ্যমান। রাডার সিস্টেম, থার্মাল ইমেজিং ক্যামেরা, হাই-স্পিড বোট এবং ড্রোনের মাধ্যমে দুর্গম নদী এলাকা, ঘন বন ও সুন্দরবনেও চলছে বিজিবির বাড়তি নজরদারি। সামনের দিনগুলোতে অনিবার্যভাবে তাদের কাজের ভলিউম বা আওতা আরো বাড়তে পারে।

লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন