সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২২ আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২০ মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

কালচারাল ফ্যাসিস্টদের আস্ফালনের হেতু কী

এম আবদুল্লাহ:

একটি ফ্যাসিস্ট বা স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা শুধু পুলিশ, র‍্যাব, সামরিক বা সিভিল প্রশাসনের জোরে টিকে থাকে না; এর পেছনে প্রয়োজন হয় একটি শক্তিশালী কালচারাল বা সাংস্কৃতিক কাঠামো, যা সেই শাসনের অত্যাচার-অনাচার, নিপীড়ন ও সব ধরনের অন্যায়কে জনগণের কাছে যৌক্তিকতা দেয়, নরমালাইজ করে তোলে। জগৎজুড়ে সব ফ্যাসিস্ট শাসনে একদল কালচারাল সহযোগীর অস্তিত্ব মেলে। দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল যথার্থভাবে বলেছিলেন, ‘পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ক্ষতি শাসকের নিষ্ঠুরতার জন্য হয় না; বরং হয় বুদ্ধিজীবীদের নীরবতা এবং তাদের চাটুকারিতার জন্য।’ পতিত শেখ হাসিনার দেড় দশকের শাসনে তা দেখা গেছে খুল্লমখুল্লাভাবে।

কালচারাল ফ্যাসিজম বা সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদ এমন একটি স্বৈরাচারী ও কট্টর আদর্শিক ব্যবস্থা, যেখানে কোনো রাষ্ট্র, গোষ্ঠী বা কর্তৃত্ববাদী সমাজ জোরপূর্বক একটি নির্দিষ্ট সংস্কৃতি, চিন্তাধারা, মূল্যবোধ ও জীবনযাত্রা সবার ওপর চাপিয়ে দেয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো সংস্কৃতির অজুহাতে সমাজের ভিন্নমত, বৈচিত্র্য ও মুক্তচিন্তা সম্পূর্ণভাবে দমন করা। রাজনৈতিক ফ্যাসিবাদের মতোই যখন অপছন্দের সংস্কৃতি বা মুক্তচিন্তাকে রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক শক্তি প্রয়োগ করে ধ্বংস করার চেষ্টা করা হয়, তখন তাকে সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদ বলা হয়। শেখ হাসিনার দুর্বিনীত শাসনে এটি করা হয়েছিল দক্ষতার সঙ্গে, সফলভাবে।

২০১৪ সালের বিনা ভোটের নির্বাচন, ২০১৮ সালের রাতের ভোট আর ২০২৪ সালের ডামি নির্বাচন—প্রতিটি পর্বেই ক্ষমতার ছায়ায় ছিল একদল ‘কালচারাল ফ্যাসিস্ট’। যখন বিএনপি-জামায়াত কর্মীরা গুম-খুন ও দমন-পীড়নের শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগে দেশ উত্তাল, তখন তাদের অধিকাংশের ভূমিকা ছিল উটপাখির; কেউ কেউ আবার প্রকাশ্যেই ক্ষমতাসীনের দমন-পীড়ন ও বিরোধী গোষ্ঠীকে নির্মূল-নীতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান চলাকালে এরা হত্যাযজ্ঞের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন নির্লজ্জ দালাল হিসেবে। আজ সেই একই গোষ্ঠী আবার রাষ্ট্র, সংস্কৃতি, গণমাধ্যম, বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরসহ বিভিন্ন স্তরে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। অনেক পুরোনো মুখের পাশাপাশি কতিপয় নতুন মুখও নতুন ভাষা ও নতুন কৌশলে ইতিহাসকে শেখ হাসিনার ভাষায় লিখতে চান এবং অতীতের দায় এড়িয়ে যেতে চান। এতগুলো মানুষের রক্ত ও জীবন এদের কাছে তুচ্ছ।

স্বৈরাচারী বা ফ্যাসিস্ট শাসনের সাংস্কৃতিক সহযোগীরা কয়েকটি শ্রেণিতে সক্রিয় থেকে কাজ করেন। আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শাসনের ১৫ বছরের দিকে তাকালে দেখা যাবে, একটি শ্রেণি ছিল সুবিধাবাদী বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষাবিদ, যারা নিজেদের পদ-পদবি, পুরস্কার বা সুযোগ-সুবিধার বিনিময়ে শাসকের প্রতিটি নিপীড়নমূলক পদক্ষেপকে তত্ত্ব দিয়ে সঠিক প্রমাণ করার চেষ্টা করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি-অধ্যাপকদের নিচে নামার কোনো স্তর ছিল না। তারা ইতিহাসকে বিকৃত করেন এবং শাসকের গুণকীর্তনকে ‘বুদ্ধিবৃত্তিক রূপ’ দেন। আরেকটি শ্রেণি ছিল দলদাস শিল্পী, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক। তারা কবিতা, গান, সিনেমা বা সংবাদমাধ্যমে শেখ হাসিনার দুঃশাসন ও অপশাসনকে লেজিটিমাইজ করেছেন। নামিদামি শিল্পী ও সেলিব্রেটিদের দেখা গেছে ভুয়া নির্বাচন নিয়ে উন্মাতালভাবে নাচানাচি করতে। শিল্পীসত্তাটিকে বিসর্জন দিয়ে দলবাজি ও ক্ষমতার হালুয়া-রুটির জন্য নগ্ন প্রতিযোগিতায় নেমেছিলেন তারা।

সাংস্কৃতিক আমলাতন্ত্রও ফ্যাসিবাদী শাসনে আরেক সহায়ক শক্তি হিসেবে সক্রিয় ছিল। বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, যেমন বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি, নজরুল একাডেমিসহ সংস্কৃতি-বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তারা সরকারি বেতনভোগের বিনিময়ে আত্মা বিক্রি করেছেন। বিবেক বন্ধক দিয়ে, ন্যায়-অন্যায়ের পরখ না করে ‘জি-হুজুর জাহাঁপনা’ টাইপের সমর্থন জুগিয়েছেন। তারা ভিন্নমতের শিল্পী, লেখক, কলামিস্ট ও দেশপ্রেমিক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের কণ্ঠ রোধ করেছেন এবং কেবল ফ্যাসিবাদের পক্ষের প্রোপাগান্ডামূলক কাজকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছেন।

আরেকটি শ্রেণি সক্রিয় ছিল, যাদের অনলাইন ইনফ্লুয়েন্সার ও প্রোপাগান্ডিস্ট হিসেবে দেখা গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যারা সূক্ষ্মভাবে বা সরাসরি শাসকের পক্ষে জনমত গঠন করে এবং শাসকের বিরোধিতাকারীদের ওপর সাইবার বুলিং বা চরিত্রহননের যাবতীয় অস্ত্র ও উপাদান নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন, তাদেরও সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে নানাভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া হয়। সরকারি সফরে সঙ্গী করা হয়। রাজউকের আবাসন প্রকল্পে প্লট-ফ্ল্যাট দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়।

চব্বিশের ৫ আগস্টে ফ্যাসিস্ট শাসনের পতনের পর বা সাময়িক সংকটের সময়েও কালচারাল ফ্যাসিস্ট বা ফ্যাসিস্ট-সহযোগীদের তৎপরতা থামেনি। কিছুদিন ঘাপটি মেরে ছিল একটি অংশ। পরিস্থিতি বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত নিজেদের রূপ পরিবর্তন করে একটি অংশ। তারা এমন ভাব করেন যেন তারা পরিস্থিতির শিকার ছিলেন, কিন্তু সবসময় নিপীড়নের বিরুদ্ধে ও শোষিতের পক্ষেই ছিলেন। এই অংশটির কাছে আদর্শের চেয়ে আত্মরক্ষা ও সুযোগ সন্ধান বড়। তারা বর্তমান সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছাকাছিও চলে যান বিস্ময়করভাবে। পদ-পদবি বাগিয়ে নিতে সক্ষম হন অনেকে।

কালচারাল ফ্যাসিস্টদের আরেকটি অংশ বিভ্রান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিতে নিয়োজিত হয়েছেন। তাদের মধ্যে এক ধরনের নিমকহারামির প্রবণতা আছে। শেখ হাসিনার দেড় দশকে ক্ষমতার উচ্ছিষ্ট ভোগ করে এখন চক্ষুলজ্জার কারণে হোক বা নির্বাসিত ফ্যাসিস্টদের চাপে হোক, তারা কখনো সরাসরি আবার কখনো সূক্ষ্মভাবে সমাজে বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেন যে, ‘আগের শাসনই ভালো ছিল, এখন চারদিকে শুধু ব্যর্থতা ও বিশৃঙ্খলা।’ এটি মূলত জনগণকে আবার একটি স্বৈরাচারী ব্যবস্থার প্রতি আগ্রহী করে তোলার এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক খেলা। এদের মধ্যে কেউ কেউ জুলাই অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তির মধ্যে বিভেদ-বিভাজন দেখে বেশ আশাবাদী হয়ে ওঠেন। খোলস থেকে মাথা বের করে ভেংচি দেওয়ার চেষ্টা করেন। মাঝেমধ্যে বেপরোয়া হয়ে জুলাই-শক্তির নার্ভ টেস্ট করেন।

অপর একটি অংশ অত্যন্ত চাতুর্যের সঙ্গে সতর্কভাবে পা ফেলে পতিত ফ্যাসিবাদের পুনর্বাসনের চেষ্টায় রয়েছে। তারা চুপচাপ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে এবং সুযোগ বুঝে আবার মূলধারার সংস্কৃতিতে জায়গা করে নেওয়ার চেষ্টা করছেন, যাতে তাদের অতীতের অপরাধ, অপকর্ম বা দুঃশাসন টিকিয়ে রাখতে সহযোগিতার ইতিহাস মানুষ ভুলে যায়।

রাজনৈতিক ফ্যাসিবাদের লক্ষ্য যেমন থাকে ক্ষমতার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ, সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের লক্ষ্য তেমনি মানুষের চিন্তা, বিশ্বাস, ভাষা, শিল্প এবং সংস্কৃতির ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। এটি সমাজের বহুত্ববাদ এবং মুক্তবুদ্ধির চর্চাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়। শেখ হাসিনা তার ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে এটি শক্তভাবে প্রয়োগ করেছিলেন।

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংস্কার এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার যে নতুন পথ উন্মোচিত হয়েছে, সেখানে পুরোনো নিকৃষ্ট স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার অনুসারী কালচারাল ফ্যাসিস্টদের তৎপরতা গভীর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে কয়েকজন সিনিয়র সাংবাদিক, টিভি-টকিস্ট, উপস্থাপক ও অভিনেত্রীদের ঔদ্ধত্য ও আস্ফালন জুলাইয়ের মহিমাকে ক্ষতবিক্ষত করছে। এসব গণমাধ্যম, বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পরিচিত মুখের সাম্প্রতিক ‘জুলাইবিরোধী’ কিংবা জুলাই বিপ্লবের মর্যাদাকে হেয় করার অপচেষ্টাকে সাধারণ কোনো মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হিসেবে দেখার সুযোগ কম। ফ্যাসিবাদের পতন-পরবর্তী সময়ে তাদের এই প্রকাশ্য আস্ফালন কীভাবে ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থানে ভূমিকা রাখতে পারে এবং দেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে, তা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

শাওন-সোমারা যখন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের গৌরবময় ঐতিহাসিক অর্জন, ছাত্র-জনতার ত্যাগ ও শহীদদের রক্তকে তাচ্ছিল্য করে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেন, তখন তা মূলত পুরোনো ফ্যাসিবাদের অপরাধগুলো আড়াল করার একটি চেষ্টা হিসেবে হাজির হয়। এটি সমাজে এক ধরনের ‘সাংস্কৃতিক হেজেমনি’ বা সাংস্কৃতিক আধিপত্য পুনর্নির্মাণের অপচেষ্টা, যা ফ্যাসিবাদের নৃশংসতাকে বৈধ বা স্বাভাবিক করে তুলতে সাহায্য করে।

ফ্যাসিবাদী শক্তির পুনরুত্থানের প্রথম ধাপ হলো ইতিহাসের বিকৃতি এবং বর্তমান ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করা। কতিপয় সাংবাদিক পরিচয়ধারী ও সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারের লেখা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বক্তব্যগুলো লক্ষ করলে দেখা যায়, তারা চলমান রূপান্তর প্রক্রিয়ার ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো এমনভাবে বড় করে দেখান, যেন মনে হয় স্বৈরাচারী আমলই এর চেয়ে ভালো ছিল। এ ধরনের ন্যারেটিভ বা বয়ান সাধারণ মানুষের মনে বিভ্রান্তি তৈরি করে। বিপ্লব-পরবর্তী অর্থনৈতিক বা প্রশাসনিক সংকটকে পুঁজি করে যখন তারা জুলাইয়ের চেতনাকে আক্রমণ করেন, তখন তা ফ্যাসিবাদের অবশিষ্টাংশকে আবার সংগঠিত হওয়ার তাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক জ্বালানি জোগায়।

জুলাই আন্দোলনের সময় যে ভয়াবহ ও নৃশংস গণহত্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে, তার সুনির্দিষ্ট বিচার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা একটি নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শর্ত। কিন্তু এই বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতিকর্মীরা যখন জুলাই বিপ্লবের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, কিংবা একে কোনো নির্দিষ্ট ভূ-রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে চিত্রায়িত করার চেষ্টা করেন, তখন তারা পরোক্ষভাবে গণহত্যাকারীদের পক্ষে সাফাই গান। এটি ফ্যাসিবাদী কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত অপরাধীদের মনে এই আত্মবিশ্বাস তৈরি করে যে, তারা হয়তো পার পেয়ে যাবেন। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি বজায় রাখার পরিবেশ তৈরি করা ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থানের অন্যতম বড় নিয়ামক।

রক্তস্নাত চব্বিশের জুলাইয়ের চব্বিশ মাস না পেরোতেই সোমা ইসলামরা যখন লাইভ শোতে বলেন, ‘১৫ বছরের লুটপাট ও দুঃশাসনকে ছাড়িয়ে গেছে ড. ইউনূসের ১৮ মাস’—এটাকে পতিত ফ্যাসিবাদকে নরমালাইজ ও পুনর্বাসনের স্পর্ধা হিসেবেই দেখতে হবে। তারা যখন জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা থেকে তৈরি হওয়া প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারগুলোকে ক্রমাগত প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত করতে থাকেন, তখন তা রাষ্ট্রের নতুন প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণের অনাস্থা তৈরি করে। মনে রাখতে হবে, ফ্যাসিবাদ সবসময় প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতা বা দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে পুনরুত্থিত হয়। সংস্কার প্রক্রিয়া যদি জনগণের আস্থা হারায়, তবে সেই শূন্যতা পূরণ করতে আবার কোনো একনায়কতান্ত্রিক ব্যবস্থার উত্থান ঘটা অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে।

একটি সফল গণঅভ্যুত্থানের পর স্বৈরাচারের সুবিধাভোগী অংশটি সামাজিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়ে। কিন্তু যখন মূলধারার গণমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ধরনের পরিচিত মুখগুলো জুলাইয়ের চেতনাকে চ্যালেঞ্জ করে অব্যাহতভাবে নির্বিঘ্নে আস্ফালন দেখায়, তখন মাঠপর্যায়ে লুকিয়ে থাকা বা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়া ফ্যাসিবাদী কর্মীরা নতুন করে আশার আলো দেখেন। তারা মনে করেন, সমাজে এখনো তাদের পক্ষে কথা বলার মতো প্রভাবশালী কণ্ঠস্বর রয়ে গেছে। এই মনস্তাত্ত্বিক বলপ্রয়োগ তাদের আবার সংগঠিত হতে, অর্থায়ন করতে এবং উসকানিমূলক তৎপরতা চালাতে উদ্বুদ্ধ করে।

জুলাই বিপ্লব বা ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের যে আবেগ ও ত্যাগ রয়েছে, তাকে সাধারণ মানুষের চোখে মূল্যহীন করার জন্য নানা ধরনের বিদ্রুপাত্মক প্রচারণা চালানোও একটি পরিকল্পিত কৌশল। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের মূল উদ্দেশ্য হলো রাজনৈতিক ন্যারেটিভ পরিবর্তন করা। তারা আন্দোলনকে ‘গণঅভ্যুত্থান’ থেকে সরিয়ে ‘সাজানো নাটক’ হিসেবে প্রচার করে আগের সরকারের পতনের বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চান। এটি রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডার একটি পুরোনো কৌশল। এর মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে সরাসরি আক্রমণ না করে তাদের আন্দোলনের ভিত্তি বা অংশগ্রহণকারীদের ব্যক্তিত্বকে আক্রমণ করা হয়।

ইতিহাসের শিক্ষা বলে, ফ্যাসিবাদ একবার বিদায় নিলেও তার চিরতরে অবসান ঘটে না। যদি তার সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তিগুলো উপড়ে ফেলা না যায়, তবে তা ছদ্মবেশে আবার ফিরে আসে। কালচারাল ফ্যাসিস্টদের এই আস্ফালন ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থানের পথকে মসৃণ করার একটি সূক্ষ্ম প্রোপাগান্ডা বা অপপ্রচার মেকানিজম। চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের রক্তস্নাত অর্জন টিকিয়ে রাখতে হলে এই বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। নতুন বাংলাদেশের নাগরিকদের কেবল রাজনৈতিক ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধেই নয়, বরং যারা পতিত ফ্যাসিবাদের পক্ষে বয়ান তৈরি করে তা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে, তাদের বিরুদ্ধেও সমভাবে সচেতন ও সোচ্চার হতে হবে। তবেই জুলাই শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান দেখানো হবে, একটি সত্যিকারের সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণ সম্ভব হবে।

লেখক : যুগ্ম সম্পাদক, আমার দেশ এবং সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট