মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৯ আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
৭ মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

বাজেট আলোচনায় সংসদে পক্ষে-বিপক্ষে সরকারি ও বিরোধীদলীয় সদস্যরা

নিজস্ব প্রতিবেদক : জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন সরকারি ও বিরোধীদলীয় সদস্যরা। সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা বলেছেন, এটি জনবান্ধব ও জনকল্যাণমুখী বাজেট।
একই সঙ্গে মসজিদ-মাদরাসায় রাজনীতি বন্ধ এবং স্বাধীনতাবিরোধীদের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবি জানান তারা।

অন্যদিকে বিরোধীদলীয় সদস্যরা প্রস্তাবিত বাজেটের কঠোর সমালোচনা করে একে ‘অবাস্তব, বাস্তবায়ন-অযোগ্য ও বৈষম্যের দলিল’ বলে মন্তব্য করেন।

সোমবার (২২ জুন) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে বাজেট আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

আলোচনায় অংশ নিয়ে বিএনপির সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম জামাল জামায়াতে ইসলামীকে ইঙ্গিত করে তাদের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি জানান।
তিনি বলেন, এই দলটি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। যে দল বাংলাদেশের সৃষ্টির বিরোধিতা করেছে, তারা যেন দেশে রাজনীতি করতে না পারে।
তাদের রাজনীতিও ফ্যাসিস্টদের মতো নিষিদ্ধ করা হোক।

তিনি বলেন, নামের সঙ্গে ইসলাম থাকলেই ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয় না। গত নির্বাচনে ভোটের বিনিময়ে মানুষকে বেহেশতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এমনকি বিড়ির সুখটানের মধ্য দিয়েও পাপ মোচনের কথা বলা হয়েছে। ইসলামের নামে একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হয়েছে।

রফিকুল ইসলাম জামাল বলেন, বাংলাদেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসে এবারই প্রথম বাজেট ঘোষণার পর বাজারে কোনো নিত্যপণ্যের মূল্য বাড়েনি। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর সম্পূরক শুল্ক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৪ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। এছাড়া দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ইমাম-মুয়াজ্জিনদের জন্য বাজেটে বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

আলোচনায় অংশ নিয়ে বিএনপির সংসদ সদস্য রেজা আহাম্মেদ দেশে মসজিদ ও মাদরাসায় সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং সভা-সমাবেশ বন্ধে আইন প্রণয়নের দাবি জানান।

তিনি বলেন, মসজিদ আল্লাহর ঘর। সেখানে মানুষ নামাজ আদায় করবে, কোরআন শরিফ পড়বে। কিন্তু একটি রাজনৈতিক দল মসজিদে গিয়ে রাজনীতি করছে। মসজিদের রাজনীতি বন্ধ করতে হবে। আমরা যেমন ফুটবল মাঠ, স্কুল কিংবা হলরুমে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করি, তাদেরও একইভাবে তা করতে হবে। মসজিদ-মাদরাসায় রাজনৈতিক সভা-মিটিং নিষিদ্ধ করা হোক।

‘অবাস্তব ও বৈষম্যের দলিল’ বাজেট:

বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মাহবুব আলম প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘অবাস্তব, বাস্তবায়ন-অযোগ্য ও বৈষম্যের দলিল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

তিনি বলেন, এ বাজেটে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত হয়নি। উত্তরবঙ্গকে চরমভাবে অবহেলা করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী নিজেই সম্পদের অসম বণ্টন, সুশাসনের অভাব এবং দুর্নীতির কারণে বৈষম্য সৃষ্টির কথা স্বীকার করেছেন। কিন্তু তা নিরসনে কার্যকর কোনো কৌশল বাজেটে নেই।

তিনি আরও বলেন, এনবিআরের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা অবাস্তব। নতুন বাজেটে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর করের চাপ বাড়ানো হয়েছে। ক্ষুদ্র ব্যবসার টার্নওভারের ওপর ১ শতাংশ কর আরোপ করায় ছোট ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

মাহবুব আলম অভিযোগ করেন, তিস্তা প্রকল্প, কুড়িগ্রাম ইপিজেড এবং একটি মেডিকেল কলেজের কথা বলা হলেও এসব প্রকল্পে কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি। কৃষি খাতেও পর্যাপ্ত বরাদ্দ নেই। তিনি গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধিরও সমালোচনা করেন।

ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ‘ডিভোর্স’ হতে পারে না: জিএম সিরাজ

বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে বিএনপির সংসদ সদস্য গোলাম মোহাম্মদ (জিএম) সিরাজ বলেন, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ হতে পারে, কিন্তু প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ‘ডিভোর্স’ হতে পারে না।

তিনি বলেন, ভারত আমাদের প্রতিবেশী। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ক্ষণস্থায়ী হতে পারে, তাদের মধ্যে ডিভোর্সও হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রতিবেশী সম্পর্কের কোনো ডিভোর্স হতে পারে না। ভারত যেমন বাংলাদেশকে অস্বীকার করতে পারবে না, তেমনি বাংলাদেশও ভারতকে অস্বীকার করতে পারবে না।

তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ ও সম্মানজনক সম্পর্ক বজায় রাখা প্রয়োজন। সম্প্রতি ভারতের নতুন হাইকমিশনার দুই দেশের বন্ধুত্ব নিয়ে কাব্যিক ভাষায় কথা বলেছেন। কিন্তু এরপরও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভারতবিরোধী নানা প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, তা নিয়ে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে।

ভারতের ‘পুশ-ইন’ ও ‘পুশ-ব্যাক’ কার্যক্রমের সমালোচনা করে জিএম সিরাজ বলেন, এসব কার্যক্রম বন্ধ হওয়া উচিত। মানুষের হৃদয় জয় করতে হবে। দুই দেশের মানুষের মধ্যে হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।

তিনি আরও বলেন, সীমান্তে পুশ-ইনের পাশাপাশি মাদক পাচারও বড় উদ্বেগের বিষয়। মাদকের কারণে দেশের যুবসমাজ, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনা এখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে অপ্রাসঙ্গিক। তাকে নিয়ে আমাদের কোনো মাথাব্যথা নেই।’

সংসদে ‘মবক্রেসি’ শব্দ নিয়ে বিতর্ক:

জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে ‘মবক্রেসি’ শব্দ ব্যবহারকে কেন্দ্র করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়।

পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য রাশেদুল ইসলাম বলেন, বাজেটের প্রতিক্রিয়ায় জামায়াতে ইসলামী যে মিছিল ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছে, তা নিয়ে আলোচনার সময় এক সদস্য ‘মবক্রেসি’ শব্দ ব্যবহার করেছেন। তিনি শব্দটি কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার দাবি জানান।

জবাবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘মবক্রেসি’ কোনো অশ্লীল শব্দ নয় এবং এটি কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার মতো বিষয়ও নয়। সংশ্লিষ্ট সদস্য চাইলে পরে বক্তব্য দেওয়ার সময় এর জবাব দিতে পারেন।

এ সময় বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান আপত্তি জানিয়ে বলেন, শব্দটি ইতিবাচক অর্থ বহন করে না এবং এটি আপত্তিকর হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। অতীতে বিএনপিসহ অন্যান্য দলও বাজেটের প্রতিক্রিয়ায় কর্মসূচি দিয়েছে। সেগুলোও কি তাহলে ‘মবক্রেসি’ ছিল?

তবে স্পিকার তার সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন। তিনি বলেন, ‘মবক্রেসি’ বর্তমানে বহুল ব্যবহৃত একটি রাজনৈতিক পরিভাষা। এটি কোনো অশ্লীল বা অসংসদীয় শব্দ নয়। তাই কার্যবিবরণী থেকে শব্দটি বাদ দেওয়ার কোনো কারণ নেই।

সংসদে মন্ত্রীদের অনুপস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ:

বাজেট অধিবেশনে সংসদ কক্ষে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীদের অনুপস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন।

তিনি বলেন, আমরা প্রস্তুতি নিয়ে সংসদে আসি। সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যরা বক্তব্য দেন। কিন্তু এখানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী উপস্থিত নেই। মন্ত্রীদের আসন খালি পড়ে আছে।

জবাবে স্পিকার বলেন, অধিবেশনে মন্ত্রীদের আরও বেশি উপস্থিতি দেখতে চাই। তবে অর্থমন্ত্রী উপস্থিত আছেন। অন্যান্য মন্ত্রীদেরও সংসদে উপস্থিত থাকার জন্য অনুরোধ জানানো হবে।

পরে চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম বলেন, অনেক মন্ত্রী রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যস্ত থাকেন। তবে তাদের সংসদে উপস্থিত থাকা উচিত। অর্থমন্ত্রী শুরু থেকে অধিবেশনে উপস্থিত আছেন। বাজেটসংক্রান্ত সব বিষয়ে শেষ পর্যন্ত তাকেই জবাব দিতে হয়। তবু আশা করব, যেসব মন্ত্রী উপস্থিত নেই, তারা যেন সংসদে উপস্থিত থাকেন।