মো. হাফিজ উদ্দিন :
একসময় শহরের কোনো বাসায় বিড়াল বা কুকুর দেখলে প্রতিবেশীদের কৌতূহলের শেষ থাকত না। কেউ বলতেন, “এত ঝামেলা কে সামলাবে?” আবার কেউ মনে করতেন, পোষা প্রাণী পালন কেবল বিত্তশালীদের বিলাসিতা। কিন্তু সময় বদলেছে। এখন ঢাকার বহুতল ভবন থেকে শুরু করে বিভাগীয় শহরগুলোর ছোট ছোট অ্যাপার্টমেন্টেও দেখা মিলছে পোষা বিড়াল কিংবা কুকুরের। তাদের জন্য আলাদা খাবার, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, টিকাদান, এমনকি জন্মদিন উদযাপনও এখন আর অস্বাভাবিক নয়।
গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের শহুরে সমাজে পোষা প্রাণী পালন শুধু একটি শখ হিসেবে নয়, বরং একটি নতুন জীবনধারা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে শুরু করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, জীবনযাত্রার পরিবর্তন, একাকিত্ব, প্রাণী অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা এবং ভেটেরিনারি সেবার সহজলভ্যতা- সব মিলিয়ে এই পরিবর্তনের গতি আরও বেড়েছে।
বদলে যাচ্ছে পরিবারের মানসিকতা:
দশ বছর আগেও পরিবারের সবাই পোষা প্রাণী রাখার পক্ষে থাকতেন না। বিশেষ করে প্রবীণ সদস্যদের অনেকের ধারণা ছিল, প্রাণীর স্থান ঘরের বাইরে। কিন্তু নতুন প্রজন্মের আগ্রহ, ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা আবেগের সম্পর্ক এবং সচেতনতার কারণে সেই ধারণা বদলাতে শুরু করেছে।
অনেক পরিবারেই দেখা যায়, প্রথমে যিনি সবচেয়ে বেশি আপত্তি করেছিলেন, কয়েক মাস পর তিনিই প্রাণীটির সবচেয়ে বড় অভিভাবক হয়ে ওঠেন। সকালে খাবার দেওয়া, অসুস্থ হলে উদ্বিগ্ন হওয়া কিংবা বাইরে গেলে তার খোঁজ নেওয়া- এসব এখন অনেক পরিবারের দৈনন্দিন অভ্যাস।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, মানুষ ও প্রাণীর মধ্যে গড়ে ওঠা এই সম্পর্ক কেবল আবেগের বিষয় নয়; এটি মানসিক সুস্থতার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।
একাকিত্বের শহরে নতুন সঙ্গী:
দ্রুত নগরায়ণের ফলে শহরের জীবন ক্রমেই একাকী হয়ে উঠছে। ছোট পরিবার, কর্মব্যস্ততা, দূরে থাকা আত্মীয়স্বজন এবং দীর্ঘ সময় একা থাকার কারণে অনেকেই মানসিক চাপ অনুভব করেন।
এই বাস্তবতায় পোষা প্রাণী অনেকের কাছে হয়ে উঠছে নীরব সঙ্গী।
অফিস থেকে ক্লান্ত হয়ে ফিরে দরজা খুলতেই যখন একটি বিড়াল দৌড়ে এসে গা ঘেঁষে বসে কিংবা একটি কুকুর আনন্দে লেজ নাড়ে, তখন দিনের ক্লান্তি অনেকটাই দূর হয়ে যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানেও মানুষের মানসিক চাপ কমাতে প্রাণীর ইতিবাচক ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারির সময় দীর্ঘ লকডাউন মানুষের জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন আনে। তখন অনেকেই প্রথমবারের মতো পোষা প্রাণী পালন শুরু করেন। সেই অভ্যাসের ধারাবাহিকতা এখনো অব্যাহত রয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব:
ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম কিংবা টিকটকে প্রতিদিন অসংখ্য বিড়াল ও কুকুরের ভিডিও কোটি কোটি মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে। কোনো প্রাণী উদ্ধার, চিকিৎসা কিংবা নতুন আশ্রয় পাওয়ার গল্পও ব্যাপক সাড়া ফেলে।
এর ফলে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন এসেছে। আগে যাদের কাছে রাস্তার বিড়াল ছিল বিরক্তির কারণ, এখন তাদের অনেকেই খাবার দেন, চিকিৎসা করান কিংবা দত্তক নেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রাণীপ্রেমীদের মধ্যে একটি বড় কমিউনিটিও তৈরি করেছে। সেখানে নতুন মালিকরা অভিজ্ঞদের কাছ থেকে পরামর্শ পান- কী খাবার দেবেন, কখন টিকা দেবেন, অসুস্থ হলে কোথায় যাবেন- এসব বিষয়ে সহজেই তথ্য পাওয়া যায়।
প্রসারিত হচ্ছে পেট কেয়ার শিল্প:
পোষা প্রাণীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে সংশ্লিষ্ট বাজার।
শহরের সুপারশপ, পেট শপ এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এখন সহজেই পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন ধরনের খাবার, খেলনা, বিছানা, লিটার, ক্যারিয়ার, শ্যাম্পু, ব্রাশ এবং পরিচর্যার নানা সামগ্রী।
কেবল রাজধানী নয়, জেলা শহরেও গড়ে উঠছে নতুন নতুন পেট শপ। অনলাইন ডেলিভারি ব্যবস্থার কারণে এখন দেশের অনেক জায়গাতেই প্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছে যাচ্ছে কয়েক দিনের মধ্যেই।
বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, কয়েক বছর আগেও এই খাত ছিল সীমিত। এখন এটি ধীরে ধীরে একটি সম্ভাবনাময় ভোক্তা বাজারে পরিণত হচ্ছে।
ভেটেরিনারি সেবায় পরিবর্তন:
আগে পোষা প্রাণী অসুস্থ হলে চিকিৎসক খুঁজে পাওয়া ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। এখন পরিস্থিতি বদলেছে।
বেসরকারি ভেট ক্লিনিক, আধুনিক ডায়াগনস্টিক সুবিধা, সার্জারি, টিকাদান, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, এমনকি জরুরি অ্যাম্বুলেন্স সেবাও কিছু প্রতিষ্ঠানে চালু হয়েছে।
ফলে প্রাণী পালন এখন আগের তুলনায় অনেক সহজ এবং নিরাপদ।
শহুরে জীবনে পোষা প্রাণী পালনের পরিবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দায়িত্বশীল মালিকানার ধারণা তৈরি হওয়া। আগে অনেকেই প্রাণী পোষাকে শুধুই শখ হিসেবে দেখতেন। কিন্তু এখন ধীরে ধীরে মানুষ বুঝতে শুরু করেছেন, একটি প্রাণীকে ঘরে আনা মানে তার পুরো জীবনের দায়িত্ব নেওয়া। খাবার দেওয়া বা খেলাধুলার সুযোগ করে দেওয়ার মধ্যেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না; নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, টিকা, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপদ পরিবেশ এবং মানসিক সুস্থতার দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হয়।
পশুচিকিৎসকদের মতে, কয়েক বছর আগেও বেশির ভাগ মানুষ প্রাণীকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতেন তখনই, যখন সেটি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ত। এখন অনেক মালিক নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান। প্রতিরোধমূলক চিকিৎসার প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। রেবিসের মতো টিকা সম্পর্কে সচেতনতা বেড়েছে, একই সঙ্গে কৃমিনাশক ওষুধ দেওয়া কিংবা সময়মতো স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানোর প্রবণতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে প্রাণীর সুস্থতা যেমন নিশ্চিত হচ্ছে, তেমনি প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে এমন কিছু রোগের ঝুঁকিও কমছে।
চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি বেড়েছে পুষ্টি সম্পর্কে সচেতনতা। আগে অনেকেই ঘরের উচ্ছিষ্ট খাবার প্রাণীকে দিয়ে দিতেন। এখন অনেক মালিক প্রাণীর বয়স, ওজন এবং শারীরিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে খাদ্য নির্বাচন করেন। তবে পশুচিকিৎসকেরা সতর্ক করে বলছেন, বাজারজাত খাবার ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সচেতন থাকা জরুরি। অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার বা কেবল একটি ধরনের খাবারের ওপর নির্ভরশীলতা প্রাণীর জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে। পর্যাপ্ত পানি, সুষম খাদ্য এবং প্রয়োজন অনুযায়ী খাবারের পরিমাণ নির্ধারণ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
শহুরে জীবনের বাস্তবতা পোষা প্রাণী নির্বাচনের ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলছে। ছোট ফ্ল্যাট, সীমিত খোলা জায়গা এবং ব্যস্ত জীবনযাত্রার কারণে অনেকেই এমন প্রাণী বেছে নিচ্ছেন যাদের পরিচর্যা তুলনামূলক সহজ। এ কারণেই বিড়ালের জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ছে। কম জায়গায় মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা, তুলনামূলক কম ব্যয় এবং স্বাধীন স্বভাবের কারণে শহুরে মানুষের কাছে বিড়াল একটি সুবিধাজনক সঙ্গী হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে কুকুর পালনের জন্য সময়, প্রশিক্ষণ, হাঁটানোর ব্যবস্থা এবং বেশি জায়গার প্রয়োজন হয়। ফলে কুকুরের জনপ্রিয়তা বাড়লেও তা এখনো নির্দিষ্ট একটি শ্রেণির মধ্যেই বেশি সীমাবদ্ধ।
পোষা প্রাণী পালনের এই প্রবণতা নতুন একটি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রও তৈরি করেছে। পেট ফুড, অ্যাকসেসরিজ, গ্রুমিং, বোর্ডিং সেবা, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, অনলাইন পণ্য বিক্রি- সব মিলিয়ে ধীরে ধীরে একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্প গড়ে উঠছে। কয়েক বছর আগেও যে ব্যবসা সীমিত পরিসরে ছিল, এখন সেখানে নতুন উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক ছোট ব্যবসা থেকে শুরু করে বিশেষায়িত দোকান- সবখানেই বাড়ছে ক্রেতা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, মানুষের জীবনযাত্রা যখন পরিবর্তিত হয়, তখন তার প্রভাব ভোগব্যবস্থা ও বাজারেও পড়ে। পোষা প্রাণী খাতের দ্রুত বিস্তার সেই পরিবর্তনেরই একটি প্রতিফলন। মানুষের আয় বৃদ্ধি, নগরায়ণ এবং জীবনধারার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই বাজার আরও বড় হতে পারে। স্থানীয়ভাবে মানসম্মত পেট ফুড উৎপাদন, ওষুধ শিল্পের সম্প্রসারণ এবং বিশেষায়িত সেবার বিকাশেরও সুযোগ রয়েছে।
তবে এই প্রসারের সঙ্গে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। অনেক সময় হঠাৎ আবেগের বশে প্রাণী পোষা শুরু করলেও পরে দায়িত্ব পালন করতে না পেরে কেউ কেউ তাদের পরিত্যাগ করেন। এটি প্রাণী কল্যাণের জন্য যেমন ক্ষতিকর, তেমনি সামাজিক সমস্যাও তৈরি করতে পারে। প্রাণীকে পরিবারের সদস্য হিসেবে গ্রহণ করার আগে দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ব সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি।
প্রাণী অধিকারকর্মীরা বলছেন, দায়িত্বশীল মালিকানা নিশ্চিত না হলে জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির ইতিবাচক দিকগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। প্রাণী কেনার আগে তাদের প্রয়োজন, সম্ভাব্য খরচ, চিকিৎসা এবং জীবনকাল সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য জানা দরকার। একই সঙ্গে দত্তক নেওয়ার সংস্কৃতিও আরও বিস্তৃত হওয়া প্রয়োজন, যাতে আশ্রয়হীন প্রাণীগুলো একটি নিরাপদ পরিবেশ পায়।
বাংলাদেশের শহুরে সমাজে পোষা প্রাণী পালন এখন আর কেবল একটি সাময়িক প্রবণতা নয়। এটি ধীরে ধীরে সামাজিক বাস্তবতার অংশ হয়ে উঠছে। মানুষের জীবনযাত্রা, মানসিক স্বাস্থ্য, পারিবারিক সম্পর্ক এবং অর্থনীতির সঙ্গে এই পরিবর্তনের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। আর সেই কারণেই পোষা প্রাণী আজ শুধু ঘরের একটি প্রাণী নয়; অনেকের কাছে তারা পরিবারেরই একজন।
পোষা প্রাণী পালন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নগরজীবনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দৃশ্যমান হচ্ছে- প্রাণীদের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। কয়েক বছর আগেও রাস্তার কোনো আহত কুকুর বা বিড়ালকে দেখে বেশির ভাগ মানুষ পাশ কাটিয়ে চলে যেতেন। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন কোনো ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে অনেকেই এগিয়ে আসেন। কেউ চিকিৎসার জন্য অর্থ সংগ্রহ করেন, কেউ সাময়িক আশ্রয় দেন, আবার কেউ স্থায়ীভাবে দত্তক নেন। প্রাণীকল্যাণ নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও অনলাইন কমিউনিটিগুলোও এই পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তাদের উদ্যোগে উদ্ধার, চিকিৎসা, টিকাদান ও দত্তক কার্যক্রম আগের তুলনায় অনেক বেশি সংগঠিত হয়েছে।
একই সঙ্গে বেড়েছে প্রাণীকল্যাণবিষয়ক সচেতনতামূলক প্রচারণা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং ভেটেরিনারি চিকিৎসকদের উদ্যোগে নিয়মিত প্রচার করা হচ্ছে কীভাবে একটি প্রাণীর যত্ন নিতে হবে, কোন খাবার উপযোগী, কোন বয়সে টিকা দিতে হবে কিংবা কীভাবে জরুরি পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে। আগে এসব তথ্য সহজে পাওয়া যেত না। এখন একজন নতুন পোষ্য মালিক কয়েক মিনিটের মধ্যেই প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করতে পারছেন। ফলে ভুল ধারণা কমছে এবং দায়িত্বশীল প্রাণী পালনের সংস্কৃতি ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।
তবে জনপ্রিয়তার সঙ্গে কিছু অসুস্থ প্রবণতাও দেখা দিচ্ছে। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া কোনো নির্দিষ্ট জাতের বিড়াল বা কুকুর দেখে সেটি সংগ্রহের চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রাণীটির স্বভাব, প্রয়োজন কিংবা পরিচর্যার ধরন সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকায় পরে সমস্যায় পড়েন। কখনো কখনো অতিরিক্ত ব্যয় বা সময়ের অভাবে সেই প্রাণী অবহেলার শিকার হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, পোষা প্রাণী নির্বাচন কখনোই ফ্যাশন বা সাময়িক আগ্রহের বিষয় হওয়া উচিত নয়। একটি প্রাণীকে ঘরে আনার আগে তার পুরো জীবনকাল, চিকিৎসা ব্যয়, খাদ্য এবং পরিচর্যার বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
ভেটেরিনারি চিকিৎসকেরা বলছেন, শহরে এখন নিয়মিত টিকাদান, কৃমিনাশক ওষুধ, স্পে ও নিউটার অপারেশনের বিষয়ে সচেতনতা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। বিশেষ করে স্পে বা নিউটার করার মাধ্যমে অনিয়ন্ত্রিত প্রজনন কমানো, কিছু রোগের ঝুঁকি হ্রাস এবং প্রাণীর আচরণগত কিছু সমস্যাও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়। কয়েক বছর আগেও এই বিষয়টি নিয়ে নানা ভুল ধারণা ছিল। এখন ধীরে ধীরে মানুষ বুঝতে শুরু করেছেন যে এটি প্রাণীর দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশে পোষা প্রাণীর বাজারের সম্প্রসারণ স্থানীয় উদ্যোক্তাদের জন্যও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। দেশীয়ভাবে পেট ফুড উৎপাদন, পোষা প্রাণীর আনুষঙ্গিক পণ্য তৈরি, গ্রুমিং সেবা, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, পেট বোর্ডিং, এমনকি পেট ফটোগ্রাফির মতো নতুন ব্যবসাও গড়ে উঠছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের কারণে ছোট উদ্যোক্তারাও সহজে ক্রেতার কাছে পৌঁছাতে পারছেন। অনলাইনে অর্ডার দিয়ে প্রয়োজনীয় পণ্য বাসায় পৌঁছে নেওয়ার সুবিধা এই বাজারকে আরও গতিশীল করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই শিল্পের টেকসই বিকাশের জন্য মান নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন এবং দক্ষ ভেটেরিনারি জনবল তৈরি জরুরি। একই সঙ্গে দায়িত্বশীল প্রজনন ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে, যাতে বাণিজ্যিক লাভের জন্য প্রাণীদের অমানবিকভাবে ব্যবহার না করা হয়। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সচেতনতা বৃদ্ধিও এখানে সমান গুরুত্বপূর্ণ।
শহরের পরিবর্তিত জীবনযাত্রায় পোষা প্রাণী এখন অনেক পরিবারের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। শিশুদের মধ্যে সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ ও প্রাণীর প্রতি মমত্ববোধ গড়ে তুলতেও এর ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে বলে মনে করেন শিক্ষাবিদরা। পরিবারের ছোট সদস্যরা যখন একটি প্রাণীর যত্ন নেওয়া শেখে, তখন তারা জীবনের প্রতি আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে প্রবীণ মানুষদের একাকিত্ব দূর করতেও পোষা প্রাণী অনেক ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।
তবে এই পরিবর্তনের সঙ্গে নগর পরিকল্পনার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। উন্নত বিশ্বের অনেক শহরে পেট-ফ্রেন্ডলি পার্ক, হাঁটার জন্য নির্দিষ্ট পথ, প্রাণীবান্ধব আবাসন এবং জরুরি চিকিৎসাসেবা রয়েছে। বাংলাদেশেও ধীরে ধীরে এ ধরনের উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। ভবিষ্যতে বড় আবাসিক প্রকল্প, পার্ক কিংবা উন্মুক্ত স্থানে পোষা প্রাণীর জন্য আলাদা সুবিধা তৈরি হলে শহুরে জীবন আরও প্রাণীবান্ধব হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের শহুরে সমাজে পোষা প্রাণী পালন আর নিছক একটি শখ নয়; এটি সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক পরিবর্তনেরও একটি প্রতিচ্ছবি। মানুষের জীবনযাত্রা যত আধুনিক হচ্ছে, ততই বাড়ছে প্রাণীদের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ এবং সহমর্মিতা। তবে এই ইতিবাচক পরিবর্তনকে স্থায়ী করতে হলে প্রয়োজন সচেতন মালিকানা, মানসম্মত চিকিৎসাসেবা, নিরাপদ খাদ্য, কার্যকর নীতিমালা এবং প্রাণীর প্রতি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। কারণ একটি প্রাণী কেবল ঘরের সৌন্দর্য বাড়ানোর উপকরণ নয়; সে একটি জীবন্ত প্রাণ, যারও নিরাপদ, সুস্থ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের অধিকার রয়েছে।