মুক্তবাণী ডেস্ক : ইস্তাম্বুলের ব্যস্ত রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎই নাকে ভেসে আসে কাঠকয়লার আগুনে সেঁকা মাংসের তীব্র সুবাস। রাস্তার দুই পাশে সারি সারি রেস্তোরাঁ।
কোথাও ধীরে ধীরে ঘুরছে বিশাল ডোনার, কোথাও আগুনের আঁচে সেঁকা হচ্ছে ভেড়া, খাসি কিংবা গরুর মাংস। কোথাও শিকে গাঁথা কাবাব, কোথাও তামার থালায় ধোঁয়া ওঠা ইস্কান্দার কাবাব।
চারদিকে ছড়িয়ে থাকা সেই সুবাস আর ব্যস্ত রান্নার দৃশ্য মুহূর্তেই পথচারীদের টেনে নেয়। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, পুরো শহরটাই যেন এক বিশাল খোলা রান্নাঘর।
তুরস্কের সবচেয়ে বড় শহর ইস্তাম্বুলে কয়েক দিন ঘুরে দেখা যায়, এখানকার খাদ্যসংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মাংস। এখানে কাবাব শুধু একটি খাবার নয়; এটি শহরের পরিচয়, ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং আতিথেয়তার অন্যতম প্রতীক।
কাবাবখাদ্য ইতিহাসবিদদের মতে, আজকের তুর্কি কাবাবের শিকড় মধ্য এশিয়ার যাযাবর তুর্কি জনগোষ্ঠীর জীবনধারায়। ঘোড়ায় চড়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া এসব যোদ্ধা খোলা আগুনে মাংস ঝলসে খাওয়ার যে পদ্ধতি চালু করেছিলেন, অটোমান সাম্রাজ্যের সময় সেটিই পরিণত হয় এক সমৃদ্ধ রন্ধনশৈলীতে। পরে ইস্তাম্বুল সাম্রাজ্যের রাজধানী হওয়ার পর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা রান্নার ধারা এখানে মিলিত হয়ে তৈরি করে অনন্য খাদ্যঐতিহ্য। আজকের ডোনার, শিশ কাবাব, আদানা, উরফা কিংবা ইস্কান্দার কাবাব সেই ইতিহাসেরই উত্তরাধিকার।
শহরের প্রায় প্রতিটি এলাকায় কাবাবের দোকান চোখে পড়ে। স্থানীয়দের পাশাপাশি বিদেশি পর্যটকদের দীর্ঘ লাইন দেখা যায় ঐতিহ্যবাহী রেস্তোরাঁগুলোতে। অনেক দোকানে কয়েক প্রজন্ম ধরে একই পরিবারের সদস্যরা রান্না করে আসছেন। তাদের দাবি, স্বাদের মূল রহস্য তাজা মাংস, কাঠকয়লার আগুন এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা বিশেষ মসলায়।
বাংলাদেশে কাবাব মানেই অনেক সময় গরুর মাংসের শিক কাবাব। কিন্তু ইস্তাম্বুলে কাবাবের জগৎ অনেক বিস্তৃত। ভেড়া, খাসি, গরু ও মুরগির মাংস দিয়ে তৈরি হয় ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের অসংখ্য পদ। এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ডোনার কাবাব, আদানা কাবাব, উরফা কাবাব, শিশ কাবাব, বেইতি কাবাব ও ইস্কান্দার কাবাব। বিশেষ করে ইস্কান্দার কাবাবে পাতলা রুটির ওপর কাটা ডোনার মাংস, টমেটো সস, গলানো মাখন ও দইয়ের সংমিশ্রণ তৈরি করে অনন্য এক স্বাদ।
কেবল কাবাবেই সীমাবদ্ধ নয় তুরস্কের মাংসের বৈচিত্র্য। ধীরে ধীরে আগুনে রান্না করা মেষশাবকের মাংস, বিভিন্ন ধরনের কোফতে, টেস্টি কাবাব, কোকোরেচ (ভেড়ার অন্ত্র দিয়ে তৈরি ঐতিহ্যবাহী খাবার) এবং কাভুরমাও স্থানীয়দের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। অনেক রেস্তোরাঁয় খাবার শুরু হয় জলপাই তেল, দই, বেগুন, মরিচ ও ছোলা দিয়ে তৈরি নানা ধরনের ‘মেজে’ দিয়ে, যা মূল খাবারের স্বাদ আরও বাড়িয়ে দেয়।
কাবাররাত নামার সঙ্গে সঙ্গে ইস্তাম্বুলের কাবাবপল্লিগুলো যেন আরও প্রাণ ফিরে পায়। রেস্তোরাঁগুলোর সামনে জ্বলতে থাকে কাঠকয়লার আগুন, আর গ্রিলের ওপর ধীরে ধীরে সেঁকা মাংসের সোঁদা গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। পরিবেশনকারীরা মুহূর্তের মধ্যেই গরম রুটি, ধোঁয়া ওঠা কাবাব, তাজা সালাদ ও আয়রান নিয়ে হাজির হন অতিথিদের টেবিলে। স্থানীয়দের বিশ্বাস, কাবাবের আসল স্বাদ শুধু মাংস বা মসলায় নয়; বরং ধীরে ধীরে আগুনে সেঁকা, পরিবারের সঙ্গে বসে খাওয়া আর অতিথিকে আন্তরিকভাবে আপ্যায়ন করার মধ্যেই লুকিয়ে আছে তুর্কি রন্ধনসংস্কৃতির প্রকৃত সৌন্দর্য।
খাবারের পর্ব শেষ হয় সাধারণত বাকলাভা, কুনেফে কিংবা এক কাপ ঘন তুর্কি কফি দিয়ে। পেস্তাবাদাম, মধু ও পাতলা পেস্ট্রি দিয়ে তৈরি বাকলাভা এখন বিশ্বের বহু দেশে জনপ্রিয় হলেও এর অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্বাদ পাওয়া যায় ইস্তাম্বুলেই।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এখানে একসঙ্গে বসে খাওয়া সামাজিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পরিবার কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে গল্প করতে করতে খাবার উপভোগ করা তুর্কি সংস্কৃতির একটি প্রাচীন রীতি। তাই ইস্তাম্বুলে খাবার কেবল পেট ভরানোর বিষয় নয়; এটি ঐতিহ্য, আতিথেয়তা এবং সামাজিক বন্ধনের প্রতীক।
হাজার বছরের সভ্যতার সাক্ষী ইস্তাম্বুল আজও তার ইতিহাস ধরে রেখেছে মসজিদ, প্রাসাদ ও জাদুঘরে। একইভাবে শহরের প্রতিটি কাবাবের ধোঁয়া আর মাংসের প্রতিটি পদেও বেঁচে আছে অটোমান সাম্রাজ্যের দীর্ঘ রন্ধনঐতিহ্য। তাই ইস্তাম্বুল ভ্রমণে এসে কাবাবের স্বাদ না নিলে এই শহরকে পুরোপুরি চেনা হয় না।