মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২৭ শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২৭ সফর, ১৪৪৮ হিজরি

দারিদ্র্য হার মানল পারজানার মেধার কাছে

সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি : ঘরে অভাব, বাবা কৃষক। সংসারের নিত্যদিনের খরচ মেটাতেই যেখানে হিমশিম খেতে হয়, সেখানে সন্তানের পড়াশোনার খরচ জোগানো ছিল পরিবারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। নামিদামি কোচিং দূরের কথা, নিয়মিত প্রাইভেট পড়ার সামর্থ্যও ছিল না। কিন্তু অভাবের কাছে হার মানেনি সীতাকুণ্ডের মেধাবী শিক্ষার্থী পারজানা আক্তার।

নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তি, কঠোর অধ্যবসায় ও শিক্ষকদের সহযোগিতায় এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে অর্জন করেছে গোল্ডেন জিপিএ-৫। কৃষক বাবার ঘর থেকে উঠে আসা পারজানার চোখে এখন আরো বড় স্বপ্ন—ভবিষ্যতে এমবিবিএস ডাক্তার হয়ে অসহায় ও অবহেলিত মানুষের সেবা করা।

সীতাকুণ্ড বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী পারজানার ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি ছিল গভীর মনোযোগ। অষ্টম শ্রেণির জেএসসি পরীক্ষায়ও জিপিএ-৫ অর্জন করে নিজের মেধার পরিচয় দেয় সে। পড়াশোনার পাশাপাশি বিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও ছিল সক্রিয়। তবে তার পথটা ছিল অন্য অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীর চেয়ে কঠিন। দরিদ্র কৃষক বাবা নুরুল ইসলামের সীমিত আয়ে সংসার চালানোই ছিল কষ্টকর। তার ওপর মেয়ের পড়াশোনার খরচ।

বই-খাতা, স্কুলের বেতনসহ প্রয়োজনীয় ব্যয় জোগাতে অনেক সময়ই হিমশিম খেতে হয়েছে পরিবারকে। নবম শ্রেণিতে উঠে বিজ্ঞান বিভাগে পড়ার সিদ্ধান্তও ছিল পরিবারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বিজ্ঞান বিভাগের কঠিন বিষয়গুলো নিয়ে শুরুতে কিছুটা ভীতি থাকলেও বড় ভাইয়ের উৎসাহে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে পারজানা। একটি গণমাধ্যমে স্বল্প বেতনে চাকরি করা বড় ভাই নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী তাকে সাহস জুগিয়েছেন। অর্থের অভাবে কোচিং বা প্রাইভেট শিক্ষকের সুবিধা না থাকলেও পারজানা থেমে থাকেনি। বাড়িতে নিয়মিত পড়াশোনা করেছে। কোনো বিষয় বুঝতে সমস্যা হলে বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাছে গিয়ে জেনে নিয়েছে। নিজের চেষ্টা ও শিক্ষকদের সহযোগিতাকেই সে বেছে নিয়েছিল সাফল্যের পথ হিসেবে।

বিদ্যালয়ের শিক্ষক গোলাম রাব্বানি বলেন, পারজানা অত্যন্ত দায়িত্বশীল ও নিয়মিত শিক্ষার্থী ছিল। পড়াশোনার প্রতি তার আন্তরিকতা, শৃঙ্খলা ও ভালো আচরণের কারণে শিক্ষক-সহপাঠীদের কাছেও সে ছিল প্রিয়। তার ফলাফলে শিক্ষকেরা আনন্দিত ও গর্বিত।

সীতাকুণ্ড বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দিদারুল আলম বলেন, ক্লাসে মনোযোগী হয়ে শিক্ষকদের পরামর্শ মেনে চললে ভালো ফলাফল করা সম্ভব—পারজানা তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করেন তিনি। ফল প্রকাশের দিনও কাঙ্ক্ষিত ফল নিয়ে কিছুটা শঙ্কায় ছিল পারজানা। ফলাফল হাতে পাওয়ার পর গোল্ডেন জিপিএ-৫ দেখে মুহূর্তের জন্য নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না সে। আনন্দে চোখ ছলছল করে ওঠে তার। মেয়ের এই সাফল্যে আনন্দে আত্মহারা বাবা-মাও। তাদের কাছে মেয়ের ফলাফল শুধু একটি ভালো ফল নয়, দীর্ঘদিনের অভাব-অনটন ও সংগ্রামের মধ্যে পাওয়া এক বিরাট অর্জন।

পারজানার বাবা নুরুল ইসলাম ও মা খতিজা বেগম জানান, মেয়ের স্বপ্ন ভবিষ্যতে এমবিবিএস ডাক্তার হওয়া। চিকিৎসাসেবার বাইরে থাকা অসহায় ও দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়াতে চায় সে। বাবা-মায়ের ত্যাগকে সার্থক করাও তার বড় প্রত্যাশা। পারজানার এই সাফল্যে পরিবার ও বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যেমন আনন্দিত, তেমনি গর্বিত এলাকাবাসীও।