দীর্ঘ ১১ বছর পর মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হলো সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বহুল প্রতীক্ষিত ‘নবম জাতীয় বেতন কাঠামো’। সর্বনিম্নের ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির এই সিদ্ধান্ত প্রায় ২৪ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ পেনশনভোগীর জীবনে স্বস্তি নিয়ে আসবে— এতে কোনো সন্দেহ নেই। বিগত এক দশকে বাজারদরের ঊর্ধ্বগতি ও ক্রমাগত মূল্যস্ফীতির কারণে সীমিত আয়ের সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান যেভাবে সংকুচিত হয়েছিল, তা বিবেচনায় নিলে এই বেতন বৃদ্ধি একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ। তবে মুদ্রার অপর পিঠে এটি প্রায় ১৮ কোটি সাধারণ মানুষের জীবনে নতুন করে অর্থনৈতিক দুর্ভোগ ও মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে তোলার বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে।
প্রথমত, এই নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নে আগামী তিন বছরে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হবে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। ইতোমধ্যে বাজেট ঘাটতি ও রাজস্ব আদায়ের নানা সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে যাওয়া রাষ্ট্রীয় কোষাগারের জন্য এটি এক বিশাল আর্থিক চাপ। সরকারকে যদি এই বিপুল পরিমাণ অর্থ সংস্থান করতে অতিরিক্ত ব্যাংকঋণ বা পরোক্ষ করের ওপর নির্ভর করতে হয়, তবে শেষ পর্যন্ত সেই বোঝার মাশুল গুনতে হবে দেশের আমজনতাকেই।
দ্বিতীয়ত, সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার জায়গা হলো বাজারে কৃত্রিম ও প্রকৃত চাহিদা বৃদ্ধিজনিত মূল্যস্ফীতির ভয়াবহতা। সরকারের যুক্তি মতে, বাজারে টাকা পাম্প করলে কেনাকাটা বাড়বে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি গতি পাবে। কিন্তু বাংলাদেশের বাজারের বাস্তব চিত্রটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। যেকোনো পে-স্কেলের খবর চাউর হলেই অসাধু সিন্ডিকেট ও ব্যবসায়ীরা হুট করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেন। মাত্র ৩৩ লাখ সরকারি কর্মচারী ও পেনশনারদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়লেও দেশের সিংহভাগ মানুষ, যারা বেসরকারি খাত, দিনমজুরি বা ক্ষুদ্র ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল, তাদের আয় কিন্তু বাড়ছে না। এর ফলে সাধারণ ভোক্তা মারাত্মক অর্থনৈতিক বৈষম্য ও তীব্র মূল্যস্ফীতির মুখে পড়বে। সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের অভিমত অনুযায়ী, বেসরকারি খাতের ওপর যে চাপ তৈরি হবে, তা লাঘবে সংবাদমাধ্যমসহ সব বেসরকারি খাতেও বেতন সমন্বয় প্রয়োজন; যা আদতে তাৎক্ষণিকভাবে অসম্ভব। তৃতীয়ত, সরকারের পক্ষ থেকে তিন ধাপে বেতন বাড়ানো এবং ভাতাগুলো ২০২৮ সাল পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তটি কিছুটা হলেও এককালীন অর্থপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করবে। কিন্তু কেবল ধাপভিত্তিক বাস্তবায়নই বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য যথেষ্ট নয়। সরকারের উচিত হবে অসাধু ব্যবসায়ীরা যেন নতুন পে-স্কেলের অজুহাতে দ্রব্যমূল্য বাড়াতে না পারেন, সে জন্য বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা কঠোর করা।
একই সঙ্গে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ালেই যে প্রশাসনিক গতিশীলতা নিশ্চিত হবে বা দুর্নীতি কমবে— এমন ধারণার ভিত্তি দুর্বল। সাবেক উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার ও দুদকের সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম রহমানের বক্তব্যেও উঠে এসেছে যে, নৈতিকতার চর্চা ও জবাবদিহি ছাড়া কেবল বেতন বাড়িয়ে ঘুষ-দুর্নীতি রোধ করা সম্ভব নয়। তাই কেবল অর্থ ছড়ানো নয়, দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়, প্রায় এক দশক ধরে চাপে থাকা সরকারি চাকরিজীবীদের ন্যায্য স্বস্তি দেওয়া যেমন সরকারের দায়িত্ব, তেমনি সাধারণ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের বেঁচে থাকার সুযোগ সমুন্নত রাখাও সরকারের সমান দায়িত্ব। আগামী বাজেটে রাজস্ব আদায়ের আওতা বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত পরোক্ষ কর না চাপানো এবং বাজারব্যবস্থায় কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করাই হবে এই পে-স্কেলের নেতিবাচক প্রভাব ঠেকানোর একমাত্র পথ। উন্নয়ন যেন কেবল নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠীর না হয়, সামগ্রিক অর্থনীতির ভারসাম্য রক্ষা করাই যেন হয় সরকারের প্রধান লক্ষ্য।