শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২৮ ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২৯ রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি

পুলিশের ভেতরেও মাদকচক্র

মুক্তবাণী রিপোর্ট : ইয়াবাসহ সব ধরনের মাদকের বিরুদ্ধে সক্রিয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। মাদককারবারিদের গ্রেপ্তার, চালান জব্দ ও তাদের বিরুদ্ধে মাদকের মামলা করতে প্রতিনিয়ত পুলিশের অভিযান চলছে। অথচ সেই বাহিনীরই কিছু সদস্য এখন ইয়াবা ও অন্য মাদকসহ গ্রেপ্তার হচ্ছেন। ফলে প্রশ্ন উঠেছে- মাদককারবারিদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনাকারী বাহিনীর ভেতরেই কি কোনো কোনো সদস্য মাদকচক্রে জড়িয়ে পড়ছেন? সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক পুলিশ সদস্য ইয়াবা ও অন্য মাদকসহ গ্রেপ্তার হওয়ার ঘটনায় সেই প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।

সর্বশেষ কক্সবাজারে ৫৪ হাজার ইয়াবা ট্যাবলেটসহ গ্রেপ্তার হয়েছেন আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) এক সদস্য। এর আগে রাজধানীর উত্তরা থেকে ৫ হাজারের বেশি ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হন পুলিশের এক এএসআই। সাতক্ষীরায় মাদকসহ গ্রেপ্তার হয়েছেন আরও দুই পুলিশ সদস্য। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিচ্ছিন্নভাবে ঘটে যাওয়া এসব ঘটনা শুধু কয়েকজন সদস্যের অপরাধের প্রশ্ন নয়; এর মধ্য দিয়ে মাদক পাচারচক্রের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো কোনো সদস্যের সম্ভাব্য যোগসাজশের বিষয়টিও সামনে আসছে।

প্রশ্ন হচ্ছে- যাদের দায়িত্ব মাদক কারবারিদের ধরার, তাদের কেউ কেউ নিজেরাই কীভাবে এত বড় চালানের বাহক হয়ে উঠছেন? এ নিয়ে পুলিশ বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তাও মনে করেন তদন্তের গভীরে গিয়ে বিষয়টি খতিয়ে দেখা দরকার।

পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম ও অপস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স নীতি’ অনুসরণ করে সারাদেশে পুলিশ কাজ করছে। মাদকের সঙ্গে পুলিশের কোনো সদস্যের যোগসূত্র পেলে তাকে কোনো ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হচ্ছে, চাকরি হারাচ্ছেন। এ ছাড়া নিয়মিত মামলা হচ্ছে। কারাগারেও যাচ্ছেন। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ইয়াবাসহ কয়েকজন সদস্য গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা হয়েছে। মাদকের সঙ্গে পুলিশ সদস্যদের জড়িয়ে পড়ার প্রবণতার বিষয়টি তারাও গভীরভাবে খতিয়ে দেখছেন। তার ভাষ্য, ব্যক্তির দায় বাহিনী নেবে না।

কক্সবাজারের রামুতে ৬ সেপ্টেম্বর বিজিবির হাতে ধরা পড়েন ১৬ এপিবিএনের সদস্য মোহাম্মদ আলী মুন্না শিকদার। তার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ৫৪ হাজার ইয়াবা। ইয়াবার পাশাপাশি তার ব্যবহৃত মোটরসাইকেল, দুটি আইফোন ও নগদ টাকা জব্দ করা হয়। বিজিবি সদস্যরা রামুর মরিচ্যা যৌথ চেকপোস্ট এলাকায় সন্দেহজনক মোটরসাইকেলটি থামিয়ে তল্লাশি চালান। পরে মোটরসাইকেলের গোপন স্থানে বিশেষভাবে তৈরি অংশ থেকে ইয়াবাগুলো উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় রামু থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা হয়েছে। গ্রেপ্তার হওয়া ওই সদস্য ২১ দিনের ছুটিতে ছিলেন। তাকে ঢাকায় বদলি করা হলেও নতুন কর্মস্থলে যোগ দেননি।

রামু থানার ওসি একে ফজলুল হক বলেন, এত বড় চালান কোথা থেকে এলো, কোথায় যাওয়ার কথা ছিল এবং এর পেছনে কারা রয়েছে, পুলিশ সদস্য কি শুধুই বাহক হিসেবে কাজ করছিলেন, নাকি তার আরও কোনো ভূমিকা ছিল- তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

কক্সবাজারের ঘটনার আগে গত ২৩ আগস্ট রাজধানীর উত্তরা এলাকায় ৫ হাজার ৩১০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হন পুলিশের এএসআই মো. শফিকুল ইসলাম। তিনি পল্লবী থানায় কর্মরত ছিলেন। তার সঙ্গে গ্রেপ্তার হন ওয়াসিম নামে আরেক ব্যক্তি। পুলিশের এক সদস্যের কাছ থেকে কয়েক হাজার ইয়াবা উদ্ধারের এই ঘটনা তখনও প্রশ্ন তুলেছিল- তিনি কি নিজে মাদক কারবারে জড়িত ছিলেন, নাকি কোনো চক্রের হয়ে কাজ করছিলেন?

তদন্তে বেরিয়ে আসে এএসআই শফিকুল ইসলাম নিজেই ইয়াবা চক্রের সঙ্গে জড়িত। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি পরোক্ষভাবে ইয়াবা ব্যবসা করে আসছিলেন। গোপনে নিজে ইয়াবাবিরোধী অভিযানও চালাতেন। আর উদ্ধার হওয়া ইয়াবা আবার মাদক ব্যবসায়ীদের কাছেই বিক্রি করে দিতেন।

গত সোমবার বিকালে সাতক্ষীরায় মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়ে ৫৬ বোতল ‘কোরেক্স’ সিরাপসহ দুই পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ-ডিবি। পরে তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা করা হয়।

গ্রেপ্তার দুই পুলিশ সদস্য হলেন মোস্তাইন বিল্লাহ (৩০) এবং নাজমুল ইসলাম (২৮)। মোস্তাইন সাতক্ষীরা পুলিশের এসএফ শাখায় কর্মরত। এর আগে তিনি জেলা গোয়েন্দা পুলিশে কর্মরত ছিলেন। আর নাজমুল ইনসার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারে কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে কর্মরত।

তারা দীর্ঘদিন ধরে মাদক সেবন ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত। সম্প্রতি পুলিশের গোয়েন্দা প্রতিবেদনে মোস্তাইনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে মাদক সংগ্রহ করে তা বিক্রির অভিযোগ পাওয়া যায়। এ কাজে মোস্তাইনকে এক দোকানি সহযোগিতা করতেন বলে পুলিশের তদন্তে উঠে আসে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘটনাগুলো ভিন্ন ভিন্ন জেলার, ভিন্ন ভিন্ন সদস্যের। তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা আদালতের বিচারেই নির্ধারিত হবে। কিন্তু একই ধরনের অভিযোগ বারবার সামনে আসায় একটি বিষয় স্পষ্ট- পুলিশের ভেতরে মাদকসংক্রান্ত অপরাধ শনাক্ত ও প্রতিরোধে অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাকে আরও কঠোর করার প্রয়োজন রয়েছে। এ কারণেই গ্রেপ্তার হওয়া পুলিশ সদস্যদের শুধু ‘মাদকবাহক’ হিসেবে দেখলে চলবে না। তাদের মোবাইল ফোনের যোগাযোগ, ব্যাংক ও আর্থিক লেনদেন, সম্পদের হিসাব, ঘনিষ্ঠ সহযোগী, ছুটির সময়ের গতিবিধি এবং পূর্বের পোস্টিং- সবকিছু বিশ্লেষণ করা দরকার।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ড তৌহিদুল হক বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশ নিয়মিত অভিযান করে থাকে। কিন্তু সেই অভিযানের আড়ালেই যদি বাহিনীর কিছু সদস্য মাদককারবারিদের সহযোগী হয়ে ওঠেন, তাহলে পুরো ব্যবস্থাটিই প্রশ্নের মুখে পড়ে। তিনি বলেন, পুলিশের সদস্যদের বিরুদ্ধে মাদকসংক্রান্ত অভিযোগ এলে দ্রুত বিভাগীয় তদন্তের পাশাপাশি স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে ফৌজদারি তদন্ত নিশ্চিত করা দরকার। একই সঙ্গে মাদকবিরোধী অভিযানে যুক্ত সদস্যদের সম্পদের পরিবর্তন, সন্দেহজনক যোগাযোগ ও জীবনযাত্রার ওপর নিয়মিত নজরদারি বাড়ানো যেতে পারে। কারণ মাদকচক্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যই যদি চক্রটির ভেতরে ঢুকে পড়েন, তাহলে সাধারণ অভিযান দিয়ে সেই নেটওয়ার্ক ভাঙা কঠিন। সাম্প্রতিক গ্রেপ্তারগুলো তাই শুধু মাদক উদ্ধারের ঘটনা নয়; এগুলো পুলিশের অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি ও নজরদারি ব্যবস্থার জন্যও সতর্কবার্তা।

তদন্তসংশ্লিষ্টদের মতে, মাদক পাচারকারীদের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগ থাকা বড় ধরনের সুবিধা তৈরি করতে পারে। কারণ একজন পুলিশ সদস্য জানেন কোথায় তল্লাশি হচ্ছে, কোন সড়কে নজরদারি বেশি, কখন অভিযান হতে পারে কিংবা কোন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা কেমন। এ ছাড়া বাহিনীর পরিচয় ব্যবহার করে সন্দেহ এড়ানোর সুযোগও তৈরি হতে পারে। সাধারণ পরিবহনকারীর তুলনায় একজন পুলিশ সদস্যের চলাচল অনেক ক্ষেত্রে কম সন্দেহের উদ্রেক করতে পারে।

মাদক মামলার তদন্তে প্রায়ই দেখা যায়, চালানসহ বাহক ধরা পড়ে; কিন্তু মূল হোতা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। পুলিশ সদস্যের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি। কারণ তার সঙ্গে যদি কোনো সংঘবদ্ধ চক্রের যোগাযোগ থাকে, তাহলে তার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুরো নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা সম্ভব।

পুলিশের সাবেক একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, পুলিশের কোনো সদস্য হঠাৎ অস্বাভাবিক জীবনযাপন শুরু করলে, আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ তৈরি করলে বা নিয়মিত কর্মস্থলের বাইরে সন্দেহজনক ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখলে সেটি নজরদারিতে আসা উচিত। বিশেষ করে মাদক, চোরাচালান ও অবৈধ অর্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠলে তার আর্থিক লেনদেন তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।