শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২৮ ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২৯ রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি

পুতিনের নিরাপত্তায় আকাশে ‘ফ্লাইং ক্রেমলিন’, সড়কে আউরাস

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে ভারতের নয়াদিল্লিতে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের আগমন ঘিরে আলোচনায় শুধু তার কূটনৈতিক কর্মসূচি নয়, নজর কেড়েছে তাঁর কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থাও। সঙ্গে এসেছে বিশেষভাবে সাজানো প্রেসিডেন্টের বিমান এবং সাঁজোয়া বিলাসবহুল গাড়ি— আউরাস সেনাত।

বিশ্বের অন্যতম কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে পরিচিত পুতিন বিদেশ সফরেও নিজের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে কোনো ঝুঁকি নিতে চান না। তাই অন্য দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের মতো স্থানীয় গাড়ি ব্যবহারের বদলে তাঁর বহরে থাকে রাশিয়ায় তৈরি বিশেষ সুরক্ষিত গাড়ি।

চাকার ওপর যেন দুর্গ :
পুতিনের বহরে সাধারণত প্রায় দুই ডজন গাড়ি থাকে। বিদেশ সফরের সময় এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ আউরাস সেনাত। গাড়িটিকে অনেক সময় ‘চাকার ওপর দুর্গ’ বলা হয়।

রুশ প্রতিষ্ঠান আউরাস মোটরসের তৈরি এই গাড়িটি একটি পূর্ণ আকারের বিলাসবহুল সাঁজোয়া লিমুজিন। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান ন্যামি, সোলার্স জেএসসি এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের তাওয়াজুন হোল্ডিংয়ের যৌথ উদ্যোগে আউরাস ব্র্যান্ডের যাত্রা শুরু হয়।

২০১৮ সালে আউরাস সেনাত বাজারে আসে। এটি রাশিয়ার ‘কর্তেজ’ প্রকল্পের অংশ, যার লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের ব্যবহারের জন্য দেশীয় প্রযুক্তিতে বিলাসবহুল ও সাঁজোয়া গাড়ি তৈরি করা। গাড়িটির নকশায় সাবেক সোভিয়েত আমলের জিআইএস-১১০ লিমুজিনের প্রভাব রয়েছে।

সেনাতের বেসামরিক সংস্করণও তৈরি করে রাশিয়া। বছরে সীমিতসংখ্যক গাড়ি উৎপাদন করা হয়। এর দাম প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ রুবল, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ টাকার সমান।

কী আছে পুতিনের গাড়িতে?
আউরাস সেনাতে রয়েছে ৪ দশমিক ৪ লিটারের টুইন-টার্বো ভি৮ ইঞ্জিন ও হাইব্রিড ব্যবস্থা। গাড়িটি প্রায় ৫৯৮ অশ্বশক্তি উৎপাদন করতে পারে। সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় প্রায় ১৬০ কিলোমিটার এবং ঘণ্টায় শূন্য থেকে ১০০ কিলোমিটারে পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় ৯ সেকেন্ড।

গাড়িটির দৈর্ঘ্য ৫ দশমিক ৬৩ মিটার, প্রস্থ ২ মিটার এবং উচ্চতা ১ দশমিক ৭ মিটার। এর হুইলবেস ৩ দশমিক ৩ মিটার।

তবে পুতিনের ব্যবহৃত সংস্করণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য এর বিলাসিতা নয়, নিরাপত্তা। এটি গুলি ও বিস্ফোরণ প্রতিরোধে সক্ষম করে তৈরি করা হয়েছে। নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে উন্নত ব্রেকিং ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক ট্র্যাকশন নিয়ন্ত্রণ, লেন পরিবর্তনের সতর্কতা এবং স্বয়ংক্রিয় গতি নিয়ন্ত্রণের মতো প্রযুক্তি।

ভেতরেও রয়েছে উন্নতমানের চামড়া, কাঠের কাজ ও আধুনিক বিনোদনব্যবস্থা। চরম আবহাওয়ার মধ্যেও গাড়িটি চলতে পারে এমনভাবে এটি তৈরি করা হয়েছে।

এই গাড়িই গত বছর চীনে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার সম্মেলনের সময় পুতিনের সঙ্গে চড়েছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সেই ঘটনার পরও আউরাস সেনাত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনায় আসে।

আকাশেও একই রকম নিরাপত্তা:
পুতিনের নিরাপত্তা শুধু সড়কপথে সীমাবদ্ধ নয়। বিদেশ সফরে তিনি ব্যবহার করেন বিশেষভাবে পরিবর্তিত ইলিউশিন আইএল-৯৬-৩০০পিইউ বিমান। বিমানটি ‘ফ্লাইং ক্রেমলিন’ বা ‘ডুমসডে প্লেন’ নামেও পরিচিত।

পুতিনের বহরে একই ধরনের দুটি বিমান থাকে। সফরের সময় দুটি বিমান একসঙ্গে উড়তে পারে, যাতে কোনটিতে প্রেসিডেন্ট রয়েছেন তা শনাক্ত করা কঠিন হয়। রাশিয়া এর আগে বিভিন্ন বিদেশ সফরেও একই কৌশল ব্যবহার করেছে।

আইএল-৯৬-৩০০পিইউ মূলত একটি দীর্ঘপাল্লার চার ইঞ্জিনের বিমান। এটি এমনভাবে পরিবর্তন করা হয়েছে, যাতে জরুরি পরিস্থিতিতে আকাশ থেকেই রুশ প্রেসিডেন্টের জন্য একটি চলমান কমান্ড সেন্টার হিসেবে কাজ করতে পারে।

বিমানটির পাল্লা প্রায় ১১ হাজার কিলোমিটার। এতে রয়েছে নিরাপদ ও এনক্রিপ্টেড যোগাযোগব্যবস্থা, যার মাধ্যমে সামরিক, গোয়েন্দা ও সরকারি নেটওয়ার্কের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়।

এ ছাড়া এতে রয়েছে রাডার বিভ্রান্ত করার প্রযুক্তি, উন্নত প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, উপগ্রহ যোগাযোগ এবং সুরক্ষিত রেডিও ও তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থা। ফলে সংকটকালেও প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর যোগাযোগ সচল রাখা সম্ভব।

নিরাপত্তার পাশাপাশি বিলাসিতারও কমতি নেই এই বিমানে। রয়েছে ব্যক্তিগত শয়নকক্ষ, বিলাসবহুল বাথরুম, রান্নাঘর, খাবারের জায়গা এবং বৈঠকের জন্য বড় কনফারেন্স কক্ষ। অভ্যন্তরে কাঠের কাজ, চামড়া ও সোনালি অলংকরণের ব্যবহারও রয়েছে।

দিল্লির রাস্তায় আরও এক ‘দুর্গ’:
এবার ব্রিকস সম্মেলনে পুতিনের আউরাস সেনাতের পাশাপাশি আরেক রাষ্ট্রপ্রধানের সাঁজোয়া গাড়িও দিল্লির রাস্তায় নজর কাড়তে পারে। চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের ব্যবহৃত হংছি এন৭০১ও অত্যন্ত সুরক্ষিত একটি বিশেষায়িত গাড়ি।

ফলে ব্রিকসের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি দিল্লিতে বিশ্বনেতাদের নিরাপত্তাব্যবস্থাও আলাদা কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে পুতিনের আউরাস সেনাত ও তাঁর ‘ফ্লাইং ক্রেমলিন’ দেখিয়ে দিচ্ছে—একজন রাষ্ট্রপ্রধানের বিদেশ সফরে নিরাপত্তা কতটা বিস্তৃত ও বহুস্তরীয় হতে পারে।