ডা. এ কে এম মূসা:
উচ্চ রক্তচাপকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। অনেক সময় কোনো স্পষ্ট উপসর্গ বা লক্ষণ ছাড়াই এটি শরীরে বাসা বাঁধায় এবং অলক্ষ্যে হার্ট অ্যাটাক কিংবা স্ট্রোকের মতো মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। বিশ্বব্যাপী প্রতি তিনজন প্রাপ্তবয়স্কের একজন উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন, অথচ তাদের একটি বড় অংশই এ বিষয়ে পুরোপুরি অসচেতন। সাধারণ অবস্থায় রক্তচাপের আদর্শ মাত্রা ১২০/৮০ মিমি পারদ হলেও কিডনি বা হৃদ্রোগে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে এটি ১২০/৭৫ থাকা শ্রেয়। ধমনির মধ্য দিয়ে রক্ত প্রবাহিত হওয়ার সময় তার দেয়ালে যে চাপ সৃষ্টি হয়, সেটাই মূলত রক্তচাপ। যদি কারও রক্তচাপ ধারাবাহিকভাবে ১৪০/৯০ মিমি পারদ বা তার বেশি থাকে, তবে তাকে উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন বলা হয়। সাধারণত ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ ক্ষেত্রে এই রোগের সুনির্দিষ্ট কারণ জানা যায় না। তবে বাকি ৫ শতাংশ ক্ষেত্রে কিডনির সমস্যা, হরমোনজনিত জটিলতা, অতিরিক্ত ওজন, ডায়াবেটিস এবং দীর্ঘকাল জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি বা স্টেরয়েড সেবনকে দায়ী করা হয়। বয়স ৩৫ থেকে ৪০ বছর পেরোলেই প্রতি ৩ থেকে ৬ মাস পর পর রক্তচাপ পরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।
অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ মানবদেহের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর মারাত্মক ক্ষতি সাধন করে। রক্তচাপ বেশি থাকলে হৃদযন্ত্রকে অতিরিক্ত চাপে কাজ করতে হয়, ফলে হার্টের দেয়াল অস্বাভাবিক পুরু হয়ে নিজস্ব রক্ত সঞ্চালন ব্যাহত হয়। এর ফলে করোনারি ধমনীতে ব্লক সৃষ্টি হয়ে হার্ট অ্যাটাক বা হার্ট ফেইলিয়ুরের ঝুঁকি বাড়ে। একই সঙ্গে এটি কিডনির সূক্ষ্ম রক্তনালিগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে ধীরে ধীরে কিডনি অকার্যকর করে ফেলে, যার শেষ পরিণতি হয় ডায়ালাইসিস বা কিডনি প্রতিস্থাপন। এছাড়া মস্তিষ্কের রক্তনালি সরু হয়ে ব্লক হওয়া কিংবা ফেটে রক্তক্ষরণ হওয়ার প্রধান কারণ উচ্চ রক্তচাপ, যা স্ট্রোক ঘটিয়ে তাৎক্ষণিক মৃত্যু বা স্থায়ী পঙ্গুত্ব ডেকে আনে। একইভাবে চোখের রেটিনার রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে দৃষ্টিশক্তি লোপ পাওয়া (রেটিনোপ্যাথি), প্রান্তীয় রক্তনালি সরু হয়ে পায়ে পচন (গ্যাংগ্রিন) ধরা এবং বুক ও পেটের প্রধান ধমনি অতিরিক্ত ফুলে ফেটে গিয়ে (এনিউরিজম) মুহূর্তের মধ্যে মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়ার মতো ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি হয়।
উচ্চ রক্তচাপ থেকে রক্ষা পেতে হলে প্রাথমিক অবস্থায় রোগ নির্ণয় ও জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা অপরিহার্য। কয়েক দিন রক্তচাপ মেপে তা ১৪০/৯০-এর বেশি পাওয়া গেলে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে এবং প্রস্রাবের রুটিন পরীক্ষা, অ্যালবুমিন, রক্তের ক্রিয়েটিনিন, শর্করা ও চর্বির মাত্রা পরীক্ষা করানো উচিত। সুস্থ থাকতে ধূমপান পুরোপুরি ত্যাগ করা, অতিরিক্ত ওজন কমানো এবং প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটা বা সাঁতার কাটার মতো কায়িক পরিশ্রম করা প্রয়োজন। খাদ্যাভ্যাসে কাঁচা লবণ, লাল মাংস ও অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার বাদ দিতে হবে এবং প্রতিদিন ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা পর্যাপ্ত ঘুমাতে হবে। একই সঙ্গে মানসিক চাপ কমিয়ে সুস্থ জীবনধারা চর্চা করতে হবে এবং সপ্তাহে অন্তত একদিন রক্তচাপ মেপে লিখে রাখা ভালো। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চিকিৎসকের নির্দেশিত ওষুধ নিয়মিত সেবন করতে হবে; রক্তচাপ স্বাভাবিক মাত্রায় নেমে এসেছে বলেই কখনোই নিজে থেকে ওষুধ খাওয়া বন্ধ করা যাবে না।
ডা. এ কে এম মূসা, সাবেক অধ্যাপক, মেডিসিন বিভাগ, বারডেম জেনারেল হাসপাতাল