বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৯ আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১২ রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি

আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে : নূরুল ইসলাম সাদ্দাম

খুলনা প্রতিনিধি : বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি নূরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেছেন, শুধু এ প্লাস পেলেই হবে না, মেধার সঙ্গে সততা ও দেশপ্রেমে নিজেদের গড়ে তুলতে হবে। আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব তরুণ প্রজন্মের কাঁধে। তিনি বলেন, এ প্লাস জীবনের প্রথম ধাপের সাফল্য, চূড়ান্ত অর্জন নয়। আবার এ প্লাস না পেলেও হতাশ হওয়ার কারণ নেই। সামনে নিজেকে দক্ষ ও যোগ্য হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। বিশ্ব অর্থনীতি ও শিল্পের দ্রুত পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে তরুণদের চাহিদাভিত্তিক দক্ষতা অর্জন করতে হবে।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) সকালে রূপসা ও বটিয়াঘাটা উপজেলা ছাত্রশিবিরের যৌথ উদ্যোগে খুলনা জেলা রূপসা উপজেলা সদরে অবস্থিত কাজদিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে রূপসা ও বটিয়াঘাটা উপজেলার জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এ সব কথা বলেন।
রূপসা পশ্চিম থানা ছাত্রশিবির সভাপতি মুরসালীন আকনের সভাপতিত্বে ও ও বটিয়াঘাটা পূর্ব সভাপতি গালিব হাসানের পরিচালনায় বিশেষ অতিথি ছিলেন খুলনা জেলা জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ মাওলানা কবিরুল ইসলাম, জেলা কর্মপরিষদ সদস্য বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক স ম এনামুল হক, কেন্দ্রীয় কলেজ কার্যক্রম সম্পাদক হাফেজ ইউসুফ ইসলাহী, খুলনা জেলা উত্তর ছাত্রশিবিরের সভাপতি মমিনুর রহমান, সেক্রেটারি আবু জাফর, রূপসা উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা লাবিবুল ইসলাম, বটিয়াঘাটা উপজেলা আমীর মাওলানা শেখ মোহাম্মদ আবু ইউসুফ, তেরখাদা উপজেলা আমীর মাওলানা শেখ হাফিজুর রহমান। অন্যান্যের মধ্যে বক্তৃতা করেন ও উপস্থিত ছিলেন খুলনা জেলা ছাত্রশিবিরের অফিস সেক্রেটারি হোসাইন আহমেদ, রূপসা উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর ডা. রেজাউল কবীর খান, সেক্রেটারি হাবিবুল্লাহ ইমন, সহকারী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের খুলনা জেলা সেক্রেটারি নাজিম উদ্দীন, রূপসা পূর্ব সভাপতি মো. তানিমুল ইসলাম শ্রাবণ, হাফেজ জাহাঙ্গীর হোসেন, ডা. মো. সাইফুল ইসলাম, মাওলানা হেকমত আলী, হাফেজ মাওলানা গোলাম রসুল, আলমগীর ফকির, আব্দুল গফ্ফার, হাফেজ হারুন-অর-রশীদ, ছাত্রশিবির নেতা আল আমিন শেখ, বোরহান কবির, মাসুদুর রহমান, শাহাজালাল ইয়ামিনি, তারেক হাসান, ইমন শেখ, গোলাম মোস্তফা প্রমুখ। ইসমাইল হোসেন, মাওলানা গোলাম রসুল মাওলানা আ. গফ্ফার প্রমুখ।
তরুণদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত সময় না দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে ছাত্রশিবিরের এই সভাপতি বলেন, ‘এখন তোমাদের টিকটক আর ফেসবুক করার সময় নেই। এগুলোর মতো হাজারো প্ল্যাটফর্ম তৈরি করার যোগ্যতা অর্জন করতে হবে।’ তাঁর আহ্বান, মেধা, সততা ও দেশপ্রেমকে কাজে লাগিয়ে তরুণদের নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে।
রজনীগন্ধার ফুলের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ফুল যতক্ষণ তার রূপ, রস ও গন্ধ ধরে রাখে, ততক্ষণ তার মূল্য থাকে। পচে গেলে সেটি ফেলে দেওয়া হয়। একইভাবে মেধার মাধ্যমে পাওয়া সামাজিক মর্যাদা ধরে রাখতে হলে প্রতিনিয়ত নিজেকে যোগ্য করে তুলতে হবে।
তিনি বলেন, শুধু মেধা থাকলেই হবে না, সততা না থাকলে সেই মেধা সমাজের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। সরকারি সেবা খাতে অনিয়ম ও ঘুষের সমালোচনা করে তিনি বলেন, জনগণের সেবা করার জন্য নিয়োজিত কর্মকর্তাদের অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত সেবা পায় না। ঘুষ ও দুর্নীতি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।
দেশপ্রেমের উদাহরণ হিসেবে তুরস্কের এক পিএইচডি গবেষকের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, সিঙ্গাপুরে পড়াশোনা শেষে ওই গবেষক সেখানে বেশি বেতনের চাকরির সুযোগ পেয়েও নিজ দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কারণ, যে দেশ তাকে গড়ে তুলেছে, তার প্রতি দায়বদ্ধতা রয়েছে। বক্তার মতে, অর্থ নয়; চিন্তা, মেধা, মনন ও দেশপ্রেমই মানুষকে বড় করে।
দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে নূরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, শিক্ষার্থীরা জ্ঞান অর্জনের চেয়ে পরীক্ষায় পাস ও ভালো ফলের দিকে বেশি মনোযোগী হয়ে পড়েছে। গাইডনির্ভর পড়াশোনায় শিক্ষার্থীদের মৌলিক জ্ঞান ও সৃজনশীলতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাঁর মতে, শিক্ষা ব্যবস্থাকে কর্মমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক করা জরুরি।
দেশের দারিদ্র্য ও সরকারি বাজেট নিয়েও বক্তব্য দেন তিনি। তাঁর দাবি, বিপুল অর্থ বরাদ্দ থাকলেও সামাজিক নিরাপত্তা ও উন্নয়ন প্রকল্পের সুফল সবসময় প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছায় না। উন্নয়ন বাজেটের অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে, তা জনগণের সামনে প্রকাশ করা হলে জবাবদিহি বাড়বে।
তিনি বলেন, প্রতিটি ইউনিয়ন ও উপজেলায় কোন খাতে কত টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তা সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা উচিত। এতে জনগণ তাদের এলাকার উন্নয়নকাজের হিসাব জানতে এবং বাস্তবায়ন না হলে প্রশ্ন তুলতে পারবে।
দুর্নীতির অভিযোগ গ্রহণে অনলাইন ব্যবস্থা চালুর পক্ষে মত দিয়ে ছাত্রশিবিরের সভাপতি বলেন, সাধারণ মানুষ যদি ঘুষ ও অনিয়মের তথ্য দিতে পারে, রাষ্ট্রও তা কাজে লাগিয়ে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। তাঁর দাবি, দুর্নীতি বন্ধে রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি কার্যকর নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, দেশের ভবিষ্যৎ তরুণদের হাতেই। তাই যৌবনের মূল্যবান সময় নষ্ট না করে জ্ঞান, দক্ষতা ও সৃজনশীলতা অর্জনে তা কাজে লাগাতে হবে। মেধার সঙ্গে সততা ও দেশপ্রেম যুক্ত হলেই সমৃদ্ধ ও ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ গড়া সম্ভব।
বর্তমানে মেয়েদের জন্য সুযোগের ক্ষেত্র আরও প্রশস্ত হচ্ছে উল্লেখ করে নূরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, তাদের জন্য নতুন নতুন সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। মেয়েদের আরও ভালো করতে হবে। ছেলে-মেয়ে সবাইকে নিয়েই বাংলাদেশ। সবাইকে নিয়েই বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। কোনো ধর্মই মানুষকে অন্যায়, হিংসা ও অমানবিকতার শিক্ষা দেয় না। বরং ধর্ম মানুষকে ন্যায়, মানবিকতা, সত্য ও শৃঙ্খলার পথে চলতে শেখায়। ধর্মহীন মানুষ অনেকটা লাগামহীন ঘোড়ার মতো, সঠিক দিকনির্দেশনা ও নৈতিকতার অভাবে সে যে কোনো পথে ছুটে যেতে পারে। তাই প্রত্যেককে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত হতে হবে। ধর্মীয় শিক্ষা মানুষের মধ্যে ন্যায়বোধ, মানবিকতা ও দায়িত্বশীলতা তৈরি করে, যা একটি সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও সাধারণ মানুষের জীবন স্বাভাবিক হতে পারে না বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, আমরা ইতোমধ্যে দেখছি, সরকারের যারা দায়িত্বে আছেন তারা সিন্ডিকেট ব্যবস্থা করে রেখেছে। বাজার সিন্ডিকেট, চাকরি সিন্ডিকেট এ ধরনের বিভিন্ন সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে। এসব কারণে নির্বাচনের সময় তারা হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে। বর্তমানে অনেক নেতাকর্মীর দিকে তাকালে দেখা যায়, তারা আগে কী অবস্থায় ছিল আর এখন কী অবস্থায় আছে। বাজার সিন্ডিকেট, চাকরি সিন্ডিকেট এই সিন্ডিকেটগুলো সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করে। দেশে তেলের দাম বেড়েছে। স্বাধীনতার পর ৫৫ বছর পার হয়ে গেলেও বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে রয়েছে। দেশের সব সেক্টর দুর্নীতিতে ভরা। ৫৫ বছর পরেও যদি একটি দেশ দারিদ্র্যের নিচে থাকে, তাহলে আমাদের উন্নয়নের পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।
তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে যে বাজেট করা হয়েছে, সেখানে বেকার ভাতা দেওয়া হবে, কিন্তু বেকার ভাতা পায় কারা? বিধবা ভাতা পায় কারা? এসব বিষয়ে স্বচ্ছতা থাকতে হবে। দেশের কোন ইউনিয়নে কত বাজেট করা হয়েছে, সেটিও সরকারের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে। জনগণের জানার অধিকার রয়েছে তাদের এলাকার জন্য কত টাকা বরাদ্দ হয়েছে। সরকার ঘুষ ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না। একজন সরকারি কর্মকর্তার কাছে গেলে অনেক সময় সাধারণ মানুষকে মূল্যায়ন করা হয় না। অথচ জনগণের সেবা করার জন্যই তাদের সরকারি চাকরিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তাদের জনগণের প্রতি দায়িত্বশীল হতে হবে।
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির জন্মলগ্ন থেকে ছাত্রসমাজ ও তরুণ সমাজকে এগিয়ে নিতে কাজ করে যাচ্ছে উল্লেখ করে কেন্দ্রীয় সভাপতি বলেন, ছাত্রশিবিরের লোক কম পড়ে নাই, তাদের প্রোগ্রাম করে লোক নিতে হবে। ইসলামী ছাত্রশিবির কখনো প্রলোভন দেখিয়ে কাউকে সংগঠনে আনে না। ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা নিজেদের আয় করা এবং বাবার পকেটের টাকা সংগঠনের জন্য ব্যয় করে। তাদের টিউশনি ছাড়া কোনো ওয়ে নাই। আমরা আমাদের কষ্টার্জিত টাকা সংগঠনের জন্য ব্যয় করি। এই সংগঠনের কেউ কখনো অপকর্মের সঙ্গে লিপ্ত হয়নি। ছাত্রশিবিরের সঙ্গে যারা যুক্ত হয়েছে, তারা যেখানে গিয়েছে সেখানেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ইসলামী ছাত্রশিবিরের কাছেই বাংলাদেশ নিরাপদ। ইসলামী ছাত্রশিবিরের জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে একটি মহল বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচন বন্ধ করে রেখেছে। ছাত্রশিবিরকে থামিয়ে রাখা যাবে না। তরুণদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিতে হবে। মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন করতে হবে। শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও দক্ষতার মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে দেশের নেতৃত্ব দেওয়ার উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। আগামীর বাংলাদেশ হবে যাদের যোগ্যতা আছে, তাদের বাংলাদেশ। ছাত্র শিবিরের মাধ্যমেই ছাত্রসমাজের অধিকার, মেধা ও নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি হবে ইনশাআল্লাহ। তরুণদের মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলি তৈরি করে তাদের দেশ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করার উপযোগী করে গড়ে তুলবে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। আগামীর ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির ছাত্রসমাজকে মেধা, নৈতিকতা, শৃঙ্খলা ও দেশপ্রেমের আলোকে গড়ে তুলতে কাজ করে যাচ্ছে।
পরে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম সাদ্দাম রূপসা উপজেলা নৈহাটি স্কুলে সার্থী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তৃতা করেন। জেলা সভাপতি মমিনুর রহমানের সভাপতিত্বে ও সেক্রেটারি আবু জাফরের পরিচালনায় বিশেষ অতিথি ছিলেন কেন্দ্রীয় কলেজ কার্যক্রম সম্পাদক হাফেজ ইউসুফ ইসলাহী।