☰

শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১০ আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১৩ রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি

গৃহকর্মীদের অধিকার বাস্তবায়নে সামাজিক পরিবর্তনের আহ্বান

নিজস্ব প্রতিবেদক : গৃহকর্মীদের অধিকার রক্ষায় আইন ও নীতিগত অগ্রগতি হলেও তাদের প্রতি সমাজের প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি এখনো বড় বাধা।

ন্যায্য মজুরি ও কর্মঘণ্টা, কর্মক্ষেত্রে নির্যাতন ও হয়রানি, সীমিত সামাজিক সুরক্ষা এবং শ্রমিক হিসেবে মর্যাদার ঘাটতি এখনো বহু গৃহকর্মীর জীবনের বাস্তবতা।

বক্তারা বলেন, আইন পরিবর্তনের পাশাপাশি পরিবার, নিয়োগকরী ও সমাজের মানসিকতায় পরিবর্তন না এলে গৃহকর্মীদের অধিকার বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত হবে না।

বুধবার ঢাকার আলোকিতে বাংলাদেশে অক্সফ্যামের আয়োজনে “হ্যান্ডস দ্যট হোল্ড হোমস: রাইটস, রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড দ্য ফিউচার অব ডমেস্টিক ওয়ার্কারস” শীর্ষক দিনব্যাপী জাতীয় অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন।
কানাডা সরকারের সহায়তায় ২০১৯ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাস্তবায়িত সুনীতি-নারী গৃহকর্মীদের অধিকার সুরক্ষা প্রকল্পের সাত বছরের অর্জন, শিখন, নীতিগত অগ্রগতি এবং ভবিষ্যৎ করণীয় তুলে ধরতেই এ আয়োজন করা হয়।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. হুমায়ুন কবির বলেন, কম মজুরি, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, সামাজিক সুরক্ষার অভাব, কর্মক্ষেত্রে হয়রানি এবং অধিকার সম্পর্কে সীমিত সচেতনতা এখনো গৃহকর্মীদের বড় চ্যালেঞ্জ।

তিনি জানান, শ্রম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে সরকার স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা নিয়েছে। সংশোধিত শ্রম আইনের আলোকে শ্রম বিধিমালা হালনাগাদের কাজও অনেক দূর এগিয়েছে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, সবকিছু পরিবর্তন করলাম, কিন্তু মানসিকতা পরিবর্তন না করলে হবে না। আমার গৃহকর্মীকে আমি কেন আমার সহকর্মী হিসেবে স্বীকৃতি দিতে পারি না?

তিনি কর্মজীবী মায়েদের জন্য কর্মস্থল ও আবাসিক ভবনে দিবাযত্ন কেন্দ্র নিশ্চিত করা এবং গৃহকর্মীদের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার আওতায় আনার আহ্বান জানান।

শ্রম সংস্কার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মদ বলেন, ২০২৬ সালের সংশোধিত শ্রম আইনে গৃহকর্মীদের স্বীকৃতি একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলেও তা এখনো আংশিক।

তার মতে, সুনীতি প্রকল্পের বড় অর্জন হলো গৃহকর্মীদের সংগঠিত করা এবং তাদের নিজস্ব নেতৃত্বকে শক্তিশালী করা।

কানাডা সরকারের অ্যাক্টিং হেড অব করোপরেশন জেন পালমার বলেন, সুনীতি প্রকল্প গৃহকর্মীদের দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস এবং সমষ্টিগতভাবে সংগঠিত হওয়ার সক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আশা করি, ভবিষ্যতে এ প্রকল্পের কাজ বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ করবে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার বাংলাদেশ কার্যালয়ের কর্মসূচি ব্যবস্থাপক নিরান রামজুথান বলেন, গৃহকর্মীদের অদৃশ্য ও অনানুষ্ঠানিক অবস্থান থেকে আইনি সুরক্ষার কাঠামোয় নিয়ে আসার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে।

অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের দেশীয় পরিচালক ফারাহ্ কবির বলেন, গৃহকর্মীদের নিয়ে সমাজের প্রচলিত মানসিকতায় এখনো কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি এবং শিশুরা যেন ভবিষ্যতে গৃহকর্মে না আসে, সে বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।

বাংলাদেশে অক্সফ্যামের অন্তর্বর্তী দেশীয় পরিচালক অনিল পান্ত বলেন, আইন বাস্তবায়নের পাশাপাশি গৃহকর্মীদের অধিকার ও মর্যাদার প্রতি সামাজিক সম্মান নিশ্চিত করা জরুরি।

অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী অধিবেশনে গৃহকর্মীদের জাতীয় ফোরামের সভাপতি জাকিয়া সুলতানা বক্তব্য দেন। প্রকল্পের যাত্রা, অর্জন, শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ তুলে ধরেন বাংলাদেশে অক্সফ্যামের কর্মসূচি পরিচালক মাহমুদা সুলতানা।

অনুষ্ঠানে সুনীতি প্রকল্পের সাত বছরের অভিজ্ঞতা, তথ্য-প্রমাণ, নীতিগত বিশ্লেষণ এবং গৃহকর্মীদের জীবনের ১০টি গল্প নিয়ে প্রস্তুত প্রধান প্রকাশনার আনুষ্ঠানিক মোড়ক উন্মোচন করা হয়।

পরবর্তী অধিবেশনে প্রকল্পের চূড়ান্ত মূল্যায়নের ফলাফল ও শিক্ষা উপস্থাপন করেণ অক্সফ্যাম কানাডার পুষ্পিতা সাহা।

সঞ্চালনা করেন অক্সফ্যাম ইন বাংলাদেশের তারেক আজিজ।

এতে জানানো হয়, গৃহকর্মীদের অধিকার বিষয়ে সচেতনতা ১২ শতাংশ থেকে ৭৪ শতাংশে, মজুরি নিয়ে দর-কষাকষির সক্ষমতা ২৩ শতাংশ থেকে ৬১ শতাংশে এবং লিখিত চুক্তির হার ৮ শতাংশ থেকে ২৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৪১ শতাংশ গৃহকর্মী বেশি মজুরি পাওয়ার কথা জানিয়েছেন; তাদের মাসিক আয় গড়ে ৮৫০ টাকা বেড়েছে।

দুপুরের পর “স্বীকৃতি থেকে নিরাপদ ভবিষ্যৎ: অধিকার, শ্রমিক নেতৃত্ব, মর্যাদাপূর্ণ কাজ ও অংশীদারিত্ব” শীর্ষক আলোচনায় সংশোধিত শ্রম আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন, সামাজিক সুরক্ষা, অভিযোগ ও প্রতিকার ব্যবস্থা, দক্ষতার স্বীকৃতি, নিয়োগকর্তার জবাবদিহি এবং গৃহকর্মীদের নিজস্ব নেতৃত্ব শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

দিনের শেষ অধিবেশন “সহনশীলতার কণ্ঠ”-এ গৃহকর্মীদের গল্প, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও ভবিষ্যতের অঙ্গীকার তুলে ধরা হয়।

বক্তারা বলেন, প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও গৃহকর্মীদের অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার কাজ শেষ হয়নি। আইন, প্রতিষ্ঠান, নিয়োগকর্তা ও সমাজ-সব জায়গায় সম্মিলিত পরিবর্তনই এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।

অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন অক্সফ্যাম ইন বাংলাদেশের যোগাযোগ ও অ্যাডভোকেসি বিভাগের প্রধান মো. শরিফুল ইসলাম।