স্পোর্টস ডেস্ক : গলফ কোর্সে জোরালো শট খেললে বল কয়েক শ ফুট দূরে চলে যায়। অনেক সময় খালি চোখে বলটি দেখাও কঠিন হয়ে পড়ে।
সাধারণত গলফবয়দের সহায়তায় বল খুঁজে আনতে হয়, আবার কখনো বল হারিয়েও যায়। তবে বসুন্ধরা সুপার গলফে সেই ঝামেলা থাকছে না।
শট খেলা শেষ হওয়ার পর মাঠের নিচে থাকা স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির মাধ্যমে বল সরাসরি চলে যাবে মেশিনের সংগ্রহস্থলে। সেখানে স্বয়ংক্রিয় মেশিন বল ধুয়ে পরিষ্কার করবে।
এরপর নির্দিষ্ট পাইপের মাধ্যমে বলটি আবার সংশ্লিষ্ট বে’র নির্দিষ্ট স্থানে ফিরে আসবে। শেষ পর্যন্ত বল পৌঁছে যাবে টি পয়েন্টে।
ফলে খেলোয়াড় পরের শটের জন্য প্রস্তুত হতে পারবেন কোনো ধরনের বল খোঁজার ঝামেলা ছাড়াই।
গলফকে কেন্দ্র করে এমন আয়োজন বাংলাদেশ তো বটেই, উপমহাদেশের জন্যও নতুন অভিজ্ঞতা। ২৪ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করছে বসুন্ধরা সুপার গলফ। বিস্তৃত পরিসরে গড়ে ওঠা এই স্থাপনার মূল ভাবনা ‘মোর দ্যান গলফ’। অর্থাৎ এখানে শুধু গলফ খেলা নয়, পরিবার, বন্ধু, ব্যবসায়িক সভা কিংবা অবসর বিনোদনের জন্যও রয়েছে আলাদা আয়োজন।
সুবিশাল এই স্থাপনায় রয়েছে ৬৮টি ডিলাক্স বে। প্রতিটি বে’তে একসঙ্গে সর্বোচ্চ ছয়জন খেলতে পারবেন। নির্দিষ্ট ঘণ্টাভিত্তিক খরচে গলফ খেলার পাশাপাশি পাশের রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার অর্ডার করার সুবিধাও রয়েছে। ফলে খেলার ফাঁকে খাবার ও আড্ডার ব্যবস্থাও থাকছে হাতের নাগালে।
এ ছাড়া রয়েছে ১৭টি ভিআইপি সুইট। প্রতিটি সুইটে সর্বোচ্চ ১৬ জন একসঙ্গে সময় কাটাতে পারবেন। প্রতিটি সুইটে রয়েছে আলাদা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ, ব্যক্তিগত বৈঠকের সুযোগ এবং ব্যবসায়িক উপস্থাপনার ব্যবস্থা। প্রয়োজন হলে রেস্টুরেন্ট থেকে খাবারও অর্ডার করা যাবে। ফলে বিনোদনের পাশাপাশি ব্যবসায়িক আয়োজনেও ব্যবহার করা যাবে এসব সুইট।
ডিলাক্স বে ও ভিআইপি সুইট, দুই জায়গাতেই গলফ খেলার ব্যবস্থা রয়েছে। নির্দিষ্ট অ্যাপে নিজস্ব অ্যাকাউন্ট খুলে অথবা অতিথি হিসেবেও খেলা যাবে। অ্যাকাউন্ট খুললে পাওয়া যাবে বাড়তি সুবিধা। নিজের সেরা শট চাইলে সমাজমাধ্যমেও প্রকাশ করা যাবে।
ড্রাইভিং রেঞ্জে বাস্তব শট খেলে ভার্চুয়াল ব্যবস্থায় বিশ্বের বিখ্যাত বিভিন্ন গলফ কোর্সে খেলার সুযোগ রয়েছে। তালিকায় রয়েছে ঐতিহাসিক সেন্ট অ্যান্ড্রুসও। দুই ধরনের ব্যবস্থাতেই শাওয়ারের সুবিধা রয়েছে।
শুধু গলফারদের জন্য নয়, শিক্ষার্থীদের জন্যও রয়েছে আলাদা আয়োজন। গলফ খেলার পাশাপাশি তারা ওপেন ডিসকাশনে অংশ নিতে পারবেন। খেলার ফাঁকে কঠিন বিষয় নিয়ে চিন্তা ও আলোচনা করার সুযোগও থাকছে।
ব্যক্তিগতভাবে গলফ খেলতে গেলে ক্লাবসহ নানা ধরনের প্রস্তুতি ও খরচ রয়েছে। বসুন্ধরা সুপার গলফে একসঙ্গেই পাওয়া যাবে এসব সুবিধা। ক্লাবের পাশাপাশি রয়েছে আনলিমিটেড বল। ফলে তুলনামূলক সহজ ব্যবস্থায় গলফ খেলার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সকাল ৬টা থেকে রাত ২টা পর্যন্ত খেলা যাবে। ডিলাক্স বে’তে সময়ভেদে রয়েছে অফ-পিক লো, অফ-পিক মিড ও পিক আওয়ার।
অফ-পিক লো চলবে সকাল ৬টা থেকে ১০টা পর্যন্ত। রবি থেকে বুধবার রাত ১০টা থেকে ২টা পর্যন্তও থাকবে এই সময়সূচি। এ সময়ে ঘণ্টাপ্রতি ২ হাজার ৫০০ টাকায় সর্বোচ্চ ছয়জন খেলতে পারবেন।
অফ-পিক মিড চলবে সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত। বৃহস্পতি, শুক্র ও শনিবার রাত ১০টা থেকে ২টা পর্যন্তও থাকবে এই সময়। এ সময়ে ঘণ্টাপ্রতি ৫ হাজার টাকায় সর্বোচ্চ ছয়জন খেলতে পারবেন।
সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ডিলাক্স বে’তে থাকবে পিক আওয়ার। এ সময়ে ঘণ্টাপ্রতি ৬ হাজার ৫০০ টাকায় সর্বোচ্চ ছয়জন খেলতে পারবেন।
ভিআইপি সুইট কেবল পিক আওয়ারে, অর্থাৎ সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত পাওয়া যাবে। ঘণ্টাপ্রতি ৩০ হাজার টাকায় সর্বোচ্চ ১৬ জন খেলতে পারবেন।
মেম্বারশিপেও নানা সুবিধা:
বসুন্ধরা সুপার গলফে রয়েছে প্লাটিনাম মেম্বারশিপ। বছরে ২ লাখ টাকায় এই মেম্বারশিপ নেওয়া যাবে। রবি থেকে বৃহস্পতি বিকেল ৫টা থেকে এবং শুক্র ও শনিবার বিকেল ৩টা থেকে খেলা যাবে। পাশাপাশি রেস্টুরেন্টে ১০ শতাংশ এবং মিটিং ও ইভেন্টে ১৫ শতাংশ ছাড় পাওয়া যাবে।
অল অ্যাকসেস প্লাটিনাম প্লাস মেম্বারশিপের বার্ষিক মূল্য ৫ লাখ টাকা। এতে যেকোনো দিন যেকোনো সময়ে আনলিমিটেড খেলার সুবিধা থাকবে। মিটিং ও ইভেন্টে ২০ শতাংশ, রেস্টুরেন্টে ১৫ শতাংশ এবং ভেন্যুতে ১০ শতাংশ ছাড় পাওয়া যাবে। এ মেম্বারশিপে প্রতি মাসে একবার বিকেল ৫টার আগে ভিআইপি সুইট ব্যবহার করা যাবে।
এ ছাড়া রয়েছে করপোরেট প্লাটিনাম, করপোরেট প্লাটিনাম প্লাস, ফ্যামিলি প্যাকেজ, সাবস্ক্রিপশন ও বাইআউটস।
গলফের বাইরেও খাবারের আয়োজন রয়েছে। বিভিন্ন স্বাদের খাবারের জন্য রয়েছে ক্যাফে অ্যামাজন, টেরা চায়না ও আরবান ক্রেভ। টেরা চায়নায় চীন ও জাপানের ঐতিহ্যকে নকশা ও পরিবেশে তুলে ধরা হয়েছে।
আছে ব্যানকুইট হল। সেখানে সামাজিক অনুষ্ঠান, মেহেদিসন্ধ্যা কিংবা অন্যান্য আয়োজন করা যাবে। করপোরেট অনুষ্ঠান আয়োজনেরও সুযোগ রয়েছে। পরিবার নিয়ে আসা অতিথিদের শিশুদের জন্য রয়েছে কিডস ক্লাব, যেখানে নানা ধরনের আয়োজন রাখা হয়েছে। জন্মদিনের অনুষ্ঠানও করা যাবে এখানে।
গলফ শেষে আড্ডার ‘নাইনটিনথ হোল’:
বসুন্ধরা সুপার গলফের আরেকটি আকর্ষণ ‘নাইনটিনথ হোল’ রেস্টুরেন্ট। ইউরোপের গলফ সংস্কৃতিতে ১৮ হোলে খেলা শেষ করার পর খেলোয়াড়রা একসঙ্গে বসে আড্ডা, আনন্দ ও উদ্যাপন করতেন। সেই আড্ডার জায়গাই একসময় ‘নাইনটিনথ হোল’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।
সেই ঐতিহ্যের ভাবনা থেকেই বসুন্ধরা সুপার গলফে তৈরি হয়েছে নাইনটিনথ হোল রেস্টুরেন্ট। এখানে গলফ শেষে খাবার খাওয়ার পাশাপাশি নিজেদের অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনা, দিনের খেলা নিয়ে গল্প কিংবা বন্ধু ও সহকর্মীদের সঙ্গে সময় কাটানো যাবে।
অর্থাৎ ১৮ হোলে খেলা শেষ হলেও আনন্দ থেমে থাকবে না। গলফের আগে, খেলার সময় এবং খেলার পরও বিভিন্ন আয়োজন থাকবে।
একসঙ্গে ২০৭ গলফ কোর্সের অভিজ্ঞতা:
গলফ অনুশীলনের জন্য রয়েছে চারটি ইনডোর সিমুলেটর। এর তিনটিতে অতিথিরা খেলতে পারবেন। আরেকটিতে গলফ কোচের অধীনে প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
এই সিমুলেটরগুলোতে ২০৭টি বিশ্বখ্যাত গলফ কোর্সে খেলার অভিজ্ঞতা নেওয়া যাবে। বাস্তব কোর্সের অনুভূতি দিতে বিভিন্ন ধরনের ভূপ্রকৃতি ও উঁচু-নিচু পরিস্থিতিও তৈরি করা যায়।
পাটিং অনুশীলনের জন্য রয়েছে তিনটি হোল। একটি সেশনে সর্বোচ্চ আটজন লগইন করে খেলতে পারবেন। কিডস, লেডিস ও মেনস, তিন ধরনের অপশন রয়েছে। চাইলে টুর্নামেন্টও আয়োজন করা যাবে।
আবহাওয়া যেমনই থাকুক, ইনডোর সিমুলেটরের মাধ্যমে ঘরের ভেতরেই গলফ খেলা ও অনুশীলনের সুযোগ থাকছে। ফলে এটি শুধু বিনোদনের জায়গা নয়, প্রশিক্ষণ ও প্রতিযোগিতারও একটি প্ল্যাটফর্ম।
গলফের সঙ্গে বিলিয়ার্ড:
গলফের পাশাপাশি আড্ডা ও বিনোদনের জন্য রয়েছে বিলিয়ার্ড রুম। এখানে রয়েছে তিনটি বিলিয়ার্ড বোর্ড। বন্ধু, সহকর্মী কিংবা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানোর পাশাপাশি বিলিয়ার্ড খেলা যাবে।
গলফের বিরতিতে কিংবা খেলা শেষে চাইলে বিলিয়ার্ডে সময় কাটানো যাবে। পরিচিতদের নিয়ে ব্যবসায়িক আলাপের সুযোগও থাকছে।
বিলিয়ার্ড খেলতে খরচও তুলনামূলক কম। মাত্র ৫০০ টাকায় একটি গেম খেলা যাবে। দুজন মিলে খেলার পাশাপাশি ঘণ্টাপ্রতি চারজনের খেলার সুযোগও রয়েছে।
ব্যবসায়িক বৈঠকের জন্য ভিআইপি সুইট:
বসুন্ধরা সুপার গলফের ১৭টি ভিআইপি সুইট তৃতীয় তলায় অবস্থিত। প্রতিটি সুইটে সর্বোচ্চ ১৬ জন অংশ নিতে পারবেন। সেখান থেকে গলফের ড্রাইভিং রেঞ্জের দৃশ্যও উপভোগ করা যাবে।
প্রতিটি সুইটে রয়েছে আলাদা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ, ব্যক্তিগত মিটিংয়ের সুযোগ এবং ব্যবসায়িক উপস্থাপনার ব্যবস্থা। ফলে গলফের পাশাপাশি করপোরেট মিটিং কিংবা ছোট পরিসরের আয়োজনও করা যাবে।
সুইট থেকেই রেস্টুরেন্টে খাবারের অর্ডার করা যাবে। পাশাপাশি রয়েছে প্রযুক্তিনির্ভর গলফ খেলার সুবিধা, শাওয়ার এবং ড্রাইভিং রেঞ্জে বাস্তব শট নিয়ে ভার্চুয়াল গলফ কোর্সে খেলার সুযোগ।
ডিলাক্স বে’র মতো ভিআইপি সুইটেও থাকবেন বে হোস্ট ও বে রানার। বে হোস্ট গলফ খেলায় সহযোগিতা করবেন, আর বে রানার দেখবেন খাবারসহ অন্যান্য ব্যবস্থাপনা। মেম্বারশিপ নিলে বছরজুড়েও গলফ খেলার বিভিন্ন সুবিধা পাওয়া যাবে।
শিশুদের জন্য কিডস ক্লাব:
বসুন্ধরা সুপার গলফে বড়দের পাশাপাশি শিশুদের জন্যও রয়েছে আলাদা আয়োজন। তৈরি করা হয়েছে কিডস ক্লাব। সেখানে শিশুদের সময় কাটানোর পাশাপাশি বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশ নেওয়া ও নতুন কিছু শেখার সুযোগ রয়েছে।
জন্মদিনের অনুষ্ঠানও আয়োজন করা যাবে কিডস ক্লাবে। ফলে পরিবার নিয়ে আসা অতিথিদের জন্য বড়রা গলফ খেলতে পারবেন, আর শিশুরা নিজেদের পছন্দের কার্যক্রমে সময় কাটাতে পারবে।
কিডস ক্লাবকে শুধু খেলাধুলার জায়গা হিসেবে নয়, বিনোদন, শিক্ষা ও সামাজিকতার একটি মিলনস্থল হিসেবেও গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। মোবাইল ফোন ও ভিডিও গেমের বাইরে শিশুদের সামাজিক পরিবেশে সময় কাটানোর সুযোগ তৈরির বিষয়টিও এখানে গুরুত্ব পেয়েছে।
সব মিলিয়ে বসুন্ধরা সুপার গলফ শুধু গলফ খেলার জায়গা নয়। একটি শট থেকে শুরু করে খাবার, আড্ডা, ব্যবসায়িক বৈঠক, শিশুদের বিনোদন এবং পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, সবকিছুর জন্যই এখানে আলাদা আয়োজন রয়েছে।
বসুন্ধরা সুপার গলফের হেড অব অপারেশনস হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন রেজাউর রহমান খান। বে অপারেশনস ম্যানেজার অ্যান্ড হেড অব পিআর হিসেবে আছেন অরূপ ফেভিয়ান গমেজ। তাদের মতে, বসুন্ধরা সুপার গলফকে কেন্দ্র করে খুব শিগগির একটি কমিউনিটি গড়ে উঠবে, যেখানে গলফের পাশাপাশি ব্যবসায়িক সম্পর্ক ও বিনোদন একসঙ্গে যুক্ত হবে।