কামাল পারভেজ, চট্টগ্রাম : চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যবস্থাপনা ‘স্থবির পর্যায়ে’ ছিল—নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের এমন বক্তব্যকে বাস্তবতাবিবর্জিত ও বিভ্রান্তিকর বলে মন্তব্য করেছে বন্দর রক্ষা কমিটি চট্টগ্রাম। কমিটির দাবি, দীর্ঘদিন ধরে বন্দর শ্রমিক-কর্মচারী, কর্মকর্তা, প্রকৌশলী ও দেশীয় দক্ষ জনশক্তির শ্রম, অভিজ্ঞতা ও আন্তরিক প্রচেষ্টায় চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম সচল রয়েছে। কনটেইনার ও কার্গো হ্যান্ডলিংয়েও বন্দরের সক্ষমতা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
শুক্রবার এক বিবৃতিতে বন্দর রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার ও সদস্য সচিব ফজলুল কবির মিন্টু এসব কথা বলেন।
বিবৃতিতে তারা বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম ‘স্থবির’ ছিল—এমন দাবি কোনোভাবেই বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বৈরী আবহাওয়া, সমুদ্রের সতর্ক সংকেতসহ নানা প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও বন্দর শ্রমিক-কর্মচারীরা ঝুঁকি নিয়ে কার্যক্রম সচল রেখেছেন। বন্দরের আয় ও হ্যান্ডলিং কার্যক্রমে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি থাকলে সেটিকে ‘স্থবিরতা’ হিসেবে চিহ্নিত করা বাস্তবতার সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ।
কমিটির নেতারা বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বন্দরের কার্যক্রমের সঙ্গে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য, শিল্প উৎপাদন, রাজস্ব আদায় এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সরাসরি যুক্ত। ফলে বন্দরের সক্ষমতা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বাস্তব পরিস্থিতি, বিদ্যমান সক্ষমতা এবং দেশীয় জনশক্তির অবদান বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
তারা বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়ন, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সক্ষমতা সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তবে আধুনিকায়নের প্রয়োজনকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক কনটেইনার টার্মিনাল দীর্ঘমেয়াদি ইজারার মাধ্যমে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে দেওয়ার যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠিত হয় না।
বন্দর রক্ষা কমিটি স্পষ্ট করে জানায়, বিদেশি প্রযুক্তি, কারিগরি জ্ঞান কিংবা ব্যবস্থাপনা সহযোগিতা গ্রহণের বিরোধিতা তাদের নয়। প্রয়োজন অনুযায়ী উন্নত প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা গ্রহণ করা যেতে পারে। কিন্তু দেশের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর অবকাঠামোর কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ দীর্ঘমেয়াদে বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ও চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনালের (সিসিটি) মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে দীর্ঘমেয়াদি ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়ে ইতোমধ্যে বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অতীত সরকারের সময়ে নেওয়া সিদ্ধান্ত কিংবা পরবর্তী সময়ে এ বিষয়ে নেওয়া উদ্যোগ—কোনোটিই জনস্বার্থ ও জাতীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে হতে পারে না।
কমিটির নেতারা বলেন, এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে জাতীয় অর্থনীতি, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, শ্রমিকস্বার্থ, রাজস্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় স্বার্থের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব প্রকাশ্যে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বন্দরের প্রকৃত সক্ষমতা, আয়, কনটেইনার ও কার্গো হ্যান্ডলিং এবং দেশীয় ব্যবস্থাপনার দক্ষতা নিয়ে একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন প্রকাশের দাবি জানান তারা।
বন্দর রক্ষা কমিটি বর্তমান সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছে, চট্টগ্রাম বন্দরের কোনো গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে দীর্ঘমেয়াদি ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থাকতে হবে। বন্দরের উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের ক্ষেত্রে দেশীয় শ্রমিক-কর্মচারী, কর্মকর্তা, প্রকৌশলী ও দক্ষ জনশক্তিকে সম্পৃক্ত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তারা।
বিবৃতিতে কমিটির নেতারা বলেন, “আমরা বন্দরের আধুনিকায়ন চাই, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন চাই, সক্ষমতা বৃদ্ধি চাই; কিন্তু জাতীয় স্বার্থ ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বিসর্জন দিয়ে নয়। চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নয়ন দেশের শ্রমিক-কর্মচারী, কর্মকর্তা, প্রকৌশলী ও দেশীয় দক্ষ জনশক্তিকে সঙ্গে নিয়েই করতে হবে।
এদিকে বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক স্থাপনা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে দীর্ঘমেয়াদি ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ বাতিল এবং জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণের দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে বন্দর রক্ষা কমিটি। সংগঠনটি জানিয়েছে, আগামী ৫ অক্টোবর চট্টগ্রাম বন্দর ভবনের সামনে দিনব্যাপী অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হবে। পাশাপাশি ধারাবাহিক কর্মসূচি আরও জোরদার করা হবে বলে বিবৃতিতে জানানো হয়।