খুলনা প্রতিনিধি : উজান থেকে মিষ্টি পানির স্বাভাবিক প্রবাহ না থাকায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী-খালগুলোতে পলি জমে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে লবণাক্ততা, হুমকিতে পড়ছে সুন্দরবনের প্রাণ-প্রকৃতি। ফারাক্কার প্রভাবে কয়েকশ খাল-বিল ও প্রায় ৫৪টি নদী ভরাট হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম। সুন্দরবন ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পরিবেশ রক্ষায় ভারত থেকে বাংলাদেশের প্রাপ্য মিষ্টি পানির হিস্যা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
শনিবার বেলা ১১টায় খুলনার সোনাডাঙ্গা আবাসিক এলাকার সোলার পার্কে খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) ও বিকাশ লিমিটেডের যৌথ বনায়ন কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, ফারাক্কার কারণে ওপর থেকে পানির প্রবাহ না থাকায় নিচ থেকে আসা পলি জমে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী-খাল ভরাট হয়ে যাচ্ছে। কয়েকশ খাল-বিল ও প্রায় ৫৪টি নদী ইতোমধ্যে ভরাট হয়ে গেছে। একই সঙ্গে বাড়ছে লবণাক্ততা। সুন্দরবন ও এ অঞ্চলের প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষায় ভারতকে বাংলাদেশের প্রাপ্য মিষ্টি পানির হিস্যা দিতে হবে।
তিনি বলেন, শুধু আলোচনা কিংবা কূটনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যমে মিষ্টি পানির সংকটের সমাধান হবে না। এ বিষয়ে ভারতের সঙ্গে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। সম্প্রতি ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গে বৈঠকেও বিষয়টি তিনি স্পষ্ট করেছেন। ওপর থেকে মিষ্টি পানি না এলে সাগরের লবণাক্ত পানি ও মিষ্টি পানির সংযোগস্থলে সুন্দরীসহ সুন্দরবনের উদ্ভিদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, মানুষের বা কোনো দেশের হস্তক্ষেপে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হলে সুন্দরবন রক্ষা কঠিন হয়ে পড়বে। সুন্দরবনের পাশে থাকা লাল শ্রেণির শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর দূষণ নিয়ন্ত্রণেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
শেখ ফরিদুল ইসলাম জানান, সরকার সারা দেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। এরই মধ্যে প্রায় সাড়ে ৩ কোটি গাছ লাগানো হয়েছে। আরও ২ কোটি কেওড়ার চারা ও বীজ প্রস্তুত রয়েছে। আগামী ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে উপকূলীয় এলাকায় এসব চারা ও বীজ রোপণ করা হবে। ফেব্রুয়ারি থেকে পরবর্তী ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৫ কোটি গাছ লাগানোর লক্ষ্য রয়েছে।
তিনি বলেন, নির্বিচারে বৃক্ষরোপণ নয়, কোন এলাকায় কোন ধরনের গাছ লাগানো হবে তা নির্ধারণ করেই সুষম বৃক্ষায়ন করা হবে। পাহাড়, সমতল, উপকূল, কৃষিজমি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ কাজে এনজিওসহ বিভিন্ন সংগঠনকে যুক্ত করা হচ্ছে।
বজ্রপাত মোকাবিলায় এ বছর যশোর, মাগুরা, নড়াইল, খুলনা ও সাতক্ষীরায় প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার তালগাছ লাগানো হয়েছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী। তাল, নারকেলসহ উঁচু গাছের সংখ্যা বাড়ানো গেলে বজ্রপাতের ঝুঁকি কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, খাল খনন, বৃক্ষরোপণ, সৌরবিদ্যুৎ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও বৈদ্যুতিক বাস চালুর মতো প্রকৃতিনির্ভর কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে সরকার। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য শুধু পরিবেশ রক্ষা নয়; নদী-খাল পুনরুদ্ধার, মৎস্যসম্পদ বৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি কমানোও।
প্লাস্টিক ও পলিথিন দূষণ বন্ধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্পৃক্ত করার কথা জানিয়ে শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ও পলিথিনমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।
খুলনা সিটি করপোরেশনের বৃক্ষরোপণ ও সৌন্দর্যবর্ধন উদ্যোগের প্রশংসা করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, খুলনা তাঁর নিজের শহরের মতো। শহরকে সবুজ, পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য করা সবার দায়িত্ব। বিকাশের সহযোগিতায় খুলনা শহরে বৃক্ষরোপণ ও গাছের রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিন বছর গাছগুলোর পরিচর্যার ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কেসিসির প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু। স্বাগত বক্তব্য দেন কেসিসির প্রধান নির্বাহী রাজিব আহমেদ। বক্তব্য দেন খুলনা ওয়াসার চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান মনি, খুলনা বিভাগীয় বন সংরক্ষক মো. ইমরান আহমেদ, কেএমপির উপপুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) মো. রেজাউর রহমান, খুলনা রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ের পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মো. সাজ্জাদুর রহমান রাসেল, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের সহযোগী অধ্যাপক এস এম রুবায়েত আবদুল্লাহ এবং বিকাশের এভিপি হুমায়ুন কবির। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বিকাশের মারিয়া হাসান ঐশী।