কামাল পারভেজ :
ভূমিকা:
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত পার্বত্য চট্টগ্রাম — রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান — একসময় ছিল ঘন অরণ্য, জীববৈচিত্র্য এবং প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ এক অনন্য ভূখণ্ড। কিন্তু গত কয়েক দশকে এই অঞ্চলের পরিবেশ ভয়াবহভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে। বন উজাড়, মাটি ক্ষয়, পাহাড় ধস, নদী দূষণ এবং জীববৈচিত্র্য হ্রাস — এই সংকটগুলো এখন অস্তিত্বের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সংকটের পেছনে একটি নয়, বরং একাধিক কারণ এবং একাধিক পক্ষের ভূমিকা রয়েছে।
পরিবেশ বিপর্যয়ের চিত্র:
বাংলাদেশ বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, পার্বত্য চট্টগ্রামে ১৯৭০-এর দশকে বনভূমির পরিমাণ ছিল মোট আয়তনের প্রায় ৭০ শতাংশ। বর্তমানে তা নেমে এসেছে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশে। প্রতি বছর গড়ে হাজার হাজার একর বন ধ্বংস হচ্ছে। এর ফলে পাহাড় ধস বৃদ্ধি পেয়েছে, খরার প্রকোপ বেড়েছে, এবং কর্ণফুলী, সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর নাব্যতা কমে গেছে।

সংকটের কারণসমূহ-
১. জুম চাষ এবং এর পরিবেশগত প্রভাব:
জুম চাষ পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর শতাব্দী প্রাচীন কৃষি পদ্ধতি। পাহাড়ের ঢালে গাছপালা কেটে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে জমি তৈরি করা হয় এবং এক বা দুই মৌসুম চাষের পর জমি পরিত্যক্ত রাখা হয়।
ঐতিহ্যগতভাবে এই পদ্ধতিতে জমি দীর্ঘ বিশ্রামকাল পেত — ১০ থেকে ১৫ বছর — যার ফলে বন পুনরায় জন্মাতে পারত। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে এখন বিশ্রামকাল মাত্র ২ থেকে ৩ বছরে নেমে এসেছে। ফলে বন পুনরুদ্ধারের সুযোগ পাচ্ছে না। এ ছাড়া প্রতি বছর আগুনে পাহাড়ের উপরিভাগের মাটি দুর্বল হয়ে যায়, যা মাটি ক্ষয় ও ভূমি ধসকে ত্বরান্বিত করে।
তবে এটি বলা অনুচিত হবে যে জুম চাষই একমাত্র সমস্যা। এটি মূলত দারিদ্র্য ও বিকল্প জীবিকার অভাবের ফল।
২. অবৈধ কাঠ পাচার ও বাণিজ্যিক বন নিধন:
পার্বত্য চট্টগ্রামের বন উজাড়ের সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হলো সংঘবদ্ধ কাঠ পাচার চক্র। স্থানীয় ও বাইরের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা বন বিভাগের কর্মকর্তাদের সাথে যোগসাজশে মূল্যবান গাছ পাচার করে থাকে। সেগুন, গর্জন, চাপালিশসহ দুর্লভ বৃক্ষ নির্বিচারে কাটা হচ্ছে। এই পাচার চক্রে বিভিন্ন জাতিসত্তার মানুষ জড়িত এবং এর সুবিধাভোগীরা প্রায়ই পাহাড়ের বাইরে থাকেন।
৩. অপরিকল্পিত বসতি ও অবকাঠামো উন্নয়ন:
১৯৭০ এবং ১৯৮০-এর দশকে সরকারি উদ্যোগে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালি পুনর্বাসন কর্মসূচি পরিচালিত হয়। ব্যাপক জনসংখ্যা আগমনের ফলে কৃষিজমির চাহিদা বেড়েছে এবং বনের উপর চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া সড়ক নির্মাণ, পর্যটন অবকাঠামো এবং সামরিক স্থাপনার জন্যও বনভূমি নষ্ট হয়েছে।
৪. কাপ্তাই বাঁধের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব:
১৯৬০ সালে নির্মিত কাপ্তাই বাঁধ পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিবেশে দীর্ঘমেয়াদী বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। এটি প্রায় ৫৪,০০০ একর উর্বর কৃষিজমি ডুবিয়ে দিয়েছে, প্রায় এক লাখ মানুষকে বাস্তুচ্যুত করেছে এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত করেছে। বাস্তুচ্যুত মানুষেরা পাহাড়ের গভীরে গিয়ে বন কেটে বসবাস শুরু করতে বাধ্য হয়েছেন।
৫. পর্যটন ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের অনিয়ন্ত্রিত প্রসার:
সাজেক, নীলগিরি, নীলাচলসহ পার্বত্য পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে অনিয়ন্ত্রিত পর্যটনের কারণে পরিবেশ দূষণ, বনভূমি দখল এবং পাহাড়ি পথ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
দায়বদ্ধতার প্রশ্ন:
পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিবেশ সংকট কোনো একটি জনগোষ্ঠীর একার সৃষ্টি নয়। এখানে দায়িত্ব বহুমাত্রিক।
আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে জুম চাষের ক্রমবর্ধমান চাপ এবং কিছু ক্ষেত্রে কাঠ পাচারে সম্পৃক্ততা পরিবেশের ক্ষতি করছে। তবে তাদের এই কার্যক্রমের পেছনে রয়েছে দারিদ্র্য, ভূমি অধিকার হারানো এবং বিকল্পহীনতা।
উপজাতি ও বাঙালি ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে কৃষি সম্প্রসারণ এবং কাঠ ব্যবসায় জড়িত একটি অংশ বন ধ্বংসে ভূমিকা রাখছে।
রাষ্ট্র ও প্রশাসনের ক্ষেত্রে বন বিভাগের দুর্বল তদারকি, দুর্নীতি, এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন নীতির অভাব সংকটকে গভীর করেছে।
উত্তরণের পথ:
জুম চাষের বিকল্প ও আধুনিকায়ন: উপজাতি কৃষকদের জন্য টেকসই কৃষি প্রযুক্তি, অ্যাগ্রোফরেস্ট্রি এবং বাগান চাষে প্রশিক্ষণ ও ঋণ সহায়তা প্রদান জরুরি।
কঠোর বন সংরক্ষণ আইন প্রয়োগ: অবৈধ কাঠ পাচার ও বন নিধনে জড়িত সকলের বিরুদ্ধে — জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে — আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
ভূমি অধিকার নিশ্চিত করা: ভূমি নিয়ে দ্বন্দ্ব কমলে মানুষ জমির দীর্ঘমেয়াদী পরিচর্যায় আগ্রহী হবে। ১৯৯৭ সালের শান্তি চুক্তির ভূমি সংক্রান্ত ধারাগুলো সংশোধন ও বাস্তবায়ন এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
সম্প্রদায়ভিত্তিক বন ব্যবস্থাপনা: স্থানীয় উপজাতি ও বাঙালি উভয় সম্প্রদায়কে বন সংরক্ষণে অংশীদার করে তোলা। তাদের ঐতিহ্যগত বন জ্ঞান ও আধুনিক বিজ্ঞানের সমন্বয় ঘটাতে হবে।
নিয়ন্ত্রিত পর্যটন নীতি: পর্যটন এলাকায় পরিবেশ সহনশীল ধারণক্ষমতা নির্ধারণ এবং ইকো-ট্যুরিজম মডেল অনুসরণ করতে হবে।
উপসংহার:
পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিবেশ সংকট একটি জটিল ও বহুস্তরীয় সমস্যা। এটিকে শুধুমাত্র কোনো একটি জাতিগোষ্ঠীর দোষ হিসেবে চিহ্নিত করা যেমন অন্যায্য, তেমনি সমস্যাটিকে এড়িয়ে যাওয়াও বিপজ্জনক। প্রকৃত সমাধান আসবে তখনই, যখন সব পক্ষ — উপজাতি, বাঙালি, সরকার ও নাগরিক সমাজ — একযোগে দায়িত্ব স্বীকার করে টেকসই ভবিষ্যতের জন্য কাজ করবে। পাহাড়ের সবুজ রক্ষা করা শুধু পরিবেশের প্রশ্ন নয়, এটি এই অঞ্চলের লক্ষ লক্ষ মানুষের অস্তিত্বেরও প্রশ্ন।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।