আন্তর্জাতিক ডেস্ক : গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের আগ্রাসন বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় প্রণীত পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ শুরু হয়েছে বলে ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ।
বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি জানান, ট্রাম্পের ২০ দফার গাজা পরিকল্পনা এখন যুদ্ধবিরতি থেকে অগ্রসর হয়ে নিরস্ত্রীকরণ, টেকনোক্র্যাট শাসনব্যবস্থা এবং পুনর্গঠনের পর্যায়ে প্রবেশ করছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল–জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, দ্বিতীয় ধাপে গাজা শাসনের জন্য একটি অস্থায়ী প্রশাসন গঠন করা হবে। পাশাপাশি গাজাকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ করা হবে এবং শুরু হবে পুনর্গঠন কার্যক্রম। উইটকফ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আশা করছে হামাস তাদের সব দায়বদ্ধতা পূর্ণাঙ্গভাবে পালন করবে। এর মধ্যে রয়েছে শেষ মৃত জিম্মির মরদেহ দ্রুত ফেরত দেওয়া। ব্যর্থ হলে গুরুতর পরিণতি ভোগ করতে হবে।
গাজা সরকারের জনসংযোগ কার্যালয় জানিয়েছে, গত বছরের ১০ অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত যুদ্ধবিরতি ইসরায়েল ১ হাজার ১৯০ বারের বেশি লঙ্ঘন করেছে। এসব হামলায় ৪ শতাধিক ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং জরুরি মানবিক সহায়তা প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়েছে। হামাস যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের নিন্দা জানালেও উইটকফের ঘোষণার বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।
মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহ থেকে আল–জাজিরার সাংবাদিক তারেক আবু আজ্জুম জানান, হামাস এর আগে বলেছিল তারা ট্রাম্পের পরিকল্পনার আওতায় গাজার দৈনন্দিন প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে প্রস্তুত। তবে অস্থায়ী সংস্থার গঠন ও ক্ষমতা এখনো স্পষ্ট নয়। তিনি আরও বলেন, ইসরায়েলের টানা বোমাবর্ষণে গাজার ৮০ শতাংশের বেশি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে গেছে। যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্বই সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা। পরিস্থিতি অবনতি হলে পরিকল্পনা বিলম্বিত বা পুরোপুরি ভেস্তে যেতে পারে।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় এক বিবৃতিতে জানায়, তিনি রন গিভিলির বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলেছেন। গিভিলি ছিলেন সাবেক ইসরায়েলি পুলিশ কর্মকর্তা, যার মরদেহ এখনো গাজায় রয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, মরদেহ ফেরত আনা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। একই সঙ্গে জানানো হয়, গাজা পরিচালনায় টেকনোক্র্যাট কমিটি গঠনের পরিকল্পনা মরদেহ উদ্ধারের প্রচেষ্টায় কোনো প্রভাব ফেলবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের ২০ দফার পরিকল্পনা প্রথম উত্থাপন করা হয় গত সেপ্টেম্বরে। এতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নেতৃত্বে একটি ‘বোর্ড অব পিস’ গঠন এবং গাজার নিরাপত্তা তদারকিতে আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েনের কথা রয়েছে। গত সপ্তাহে নেতানিয়াহু জানান, জাতিসংঘের সাবেক মধ্যপ্রাচ্য দূত নিকোলাই ম্লাদেনভ এই বোর্ডের নেতৃত্ব দেবেন। বোর্ডটি গাজায় গঠিত ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট সরকারের তত্ত্বাবধান করবে।
মধ্যস্থতাকারী দেশ কাতার, তুরস্ক ও মিসর গাজায় টেকনোক্র্যাট সংস্থা গঠনের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। তারা জানিয়েছে, সংস্থার প্রধান হবেন আলি আবদেল হামিদ শাথ। তিন দেশ এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছে, এই কমিটি গঠনের মাধ্যমে যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়নের পথ সুগম হবে। তারা আরও জোর দিয়ে বলেছে, স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা ও পুনর্গঠনের পরিবেশ তৈরির জন্য সব পক্ষকে চুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ থাকতে হবে।
তবে আল–জাজিরার জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক বিশ্লেষক মারওয়ান বিশারা প্রশ্ন তুলেছেন পরিকল্পনার কার্যকারিতা নিয়ে। তাঁর মতে, পুরো প্রক্রিয়াটি ইসরায়েলের সাজানো। তিনি বলেন, যখন একটি পক্ষকে সব সময় সুবিধা দেওয়া হয়, তখন ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া এগোতে পারে না। এই পরিকল্পনায় ফিলিস্তিনিদের অধিকার ও স্বাধীনতা কার্যত উপেক্ষিত। গাজার মানুষ এখনো ভোগান্তিতে রয়েছে, অথচ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তাঁর সহযোগীরা নিজেদের শান্তির দূত হিসেবে তুলে ধরছেন। বিশারার মতে, ইসরায়েল গাজা ছাড়তে চায় না এবং যুক্তরাষ্ট্রও চাপ দিতে আগ্রহী নয়। ফলে দ্বিতীয় ধাপেও দীর্ঘ সময় আটকে থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
জাতিসংঘ ও গাজায় কর্মরত মানবিক সংস্থাগুলো আবারও ইসরায়েলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, যেন খাদ্য, আশ্রয় সামগ্রী ও ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কারের যন্ত্রপাতিসহ সব ধরনের সহায়তা নির্বিঘ্নে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দখলদার শক্তি হিসেবে ইসরায়েলের এই বাধা আন্তর্জাতিক আইনে দায়িত্ব লঙ্ঘন। এটি একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তিরও লঙ্ঘন, যেখানে প্রতিদিন ৬০০টি ত্রাণবাহী ট্রাক গাজায় প্রবেশের নির্দেশ ছিল।
বর্তমান পরিস্থিতিতে লাখ লাখ ফিলিস্তিনি পরিবার অস্থায়ী আশ্রয়ে শীতের কঠোর আবহাওয়ার মুখে পড়ছে। এদিকে বুধবার দক্ষিণ গাজার খান ইউনিস শহরের পূর্বে বানি সুহেইলা মোড়ে ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে নাসের হাসপাতালের এক চিকিৎসাকর্মী নিহত হয়েছেন। স্থানীয় সূত্র জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালগুলোতে কমপক্ষে ১৫টি মরদেহ আনা হয়েছে, যার মধ্যে ১৩টি ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলের গাজা যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৭১ হাজার ৪০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১ লাখ ৭১ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।