সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী :
বিরাজমান ধরনের রাজনীতি দিয়ে দেশের কি কোনো উপকার হবে? এর জবাব ওই প্রশ্নটির ভিতরেই রয়ে গেছে। এই রাজনীতির দ্বারা দেশের কোনো উপকার হয়নি, হবেও না। বরঞ্চ দুর্দশা বাড়বে, যেমনটা বাড়ছে। এই রাজনীতি পুরনো ও অতীতের নির্ভেজাল ধারাবাহিক।
বহুবার ক্ষমতা বদলেছে, রাজনীতি বদলায়নি। যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় যাতায়াত করে, তারা নিজেদের স্বার্থ দেখে, দেশের স্বার্থ দেখে না। দেশের সম্পদ যেটুকু আছে সেটা তারা অতিদ্রুত নিজেদের করতলগত করে নিতে চায়। এমনকি বিদেশিদের হাতে তুলে দিতেও বিলম্ব করে না।
জনগণের মুক্তির কথা যখন আমরা বলি তখন ওই সম্পদের ওপর জনগণের মালিকানার প্রশ্নটাই প্রথমে আসে, আসতে বাধ্য। আমাদের দেশ যে দরিদ্র, তার কারণ সম্পদের অভাব নয়। কারণ হচ্ছে সম্পদের ওপর জনগণের মালিকানা না থাকা এবং সম্পদ বিদেশে পাচার হয়ে যাওয়া। দেশের খরচে আমরা মানুষকে শিক্ষিত করি।
সেই শিক্ষিত মানুষের স্বপ্ন থাকে বিদেশে যাওয়ার। নয়তো দেশে থেকেই বিদেশি কম্পানিতে চাকরি করার। এ ক্ষেত্রে যেটা ঘটে তা হলো দেশের খরচে যে দক্ষতা তৈরি হয়, তা দেশের কাজে লাগে না, ব্যয় হয় বিদেশিদের সম্পদ উৎপাদনে। তার চেয়েও যেটা নিষ্ঠুর, তা হলো দেশের বন্দর, ভূমি, খনিজ সম্পদ বিদেশে চলে যাওয়া।
যাকে আমরা পরাধীনতা বলে জানি, তার ভিতরকার মূল ব্যাপারটাই ছিল আমাদের সম্পদের ওপর বিদেশিদের কর্তৃত্ব।
সাম্রাজ্যবাদীরা এ দেশে কর্মচারী, চাকরবাকর, দালাল ইত্যাদি তৈরি করেছে। উদ্দেশ্য এদের সাহায্যে এখানে যে সম্পদ রয়েছে তা দখল করা। কাজটা পাঠান ও মোগলরা করেছে, পরে ইংরেজরা করেছে আরো জোরেশোরে। পাঠান ও মোগলদের পাচার করা সম্পদ তবু উপমহাদেশের ভিতরেই রয়ে গেছে। ইংরেজরা তা নিয়ে গেছে নিজেদের দেশে। খনিজ সম্পদ উত্তোলন, কলকারখানা স্থাপন, যান্ত্রিক যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা, এমনকি একসময়ে নীল, পরে পাট ও চা-এর উৎপাদন, সবকিছুর মালিকানা ইংরেজ শাসকদের হাতেই ছিল। এবং জাহাজ ভর্তি করে তারা সোনাদানা থেকে শুরু করে কত যে অর্থ ও বিত্ত পাচার করেছে তার হিসাব বের করা কঠিন। ফলে তারা যে পরিমাণে ধনী হয়েছে আমরা ঠিক সেই পরিমাণেই নিঃস্ব হয়েছি। তাদের দেশে শিল্পবিপ্লব ঘটেছে এবং আমরা পরিণত হয়েছি তাদের আটকে পড়া ক্রেতায়।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মূল কারণ ছিল সম্পদের ওই মালিকানাই। ইংরেজের ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রে যা ঘটেছে, তথাকথিত স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্রেও তাই ঘটেছিল। পূর্ববঙ্গের সম্পদের ওপর কর্তৃত্ব পূর্ববঙ্গবাসীর ছিল না, কর্তৃত্ব ছিল পশ্চিম পাকিস্তানিদের। আমরা বলেছিলাম, এ দেশে যা কিছু আছে তা আমাদেরই থাকবে। ওই দাবির ব্যাপারে বাঙালিদের দৃঢ়তা দেখেই পাঞ্জাবি সেনাবাহিনী ক্ষেপে গিয়েছিল এবং গণহত্যা শুরু করেছিল। নইলে বাঙালিদের সঙ্গে ওই রকমের বিপজ্জনক খেলায় তারা মত্ত হতে যাবে কেন?
যুদ্ধ শেষে আমরা জয়ী হয়েছি সত্যি, কিন্তু দেশের সম্পদের ওপর দেশবাসীর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি? না, হয়নি। আর সেজন্যই তো বলতে হয় যে আমরা এখনো মুক্তি পাইনি। সামাজিক সম্পত্তি ক্রমাগত ব্যক্তিমালিকানায় চলে যাচ্ছে। কলকারখানা ব্যক্তিগত হয়ে গেছে এবং যাচ্ছে। সবচেয়ে মারাত্মক যে বিপদ, তা হলো দেশের সম্পদ বিদেশিদের হাতে চলে যাওয়াটা। এ ব্যাপারে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন শাসক শ্রেণি রুখে দাঁড়াবে কি, উপরন্তু বিদেশিদের সাহায্য করছে। এটাই হচ্ছে আমাদের ক্ষমতাসীন সরকারের সাধারণ বৈশিষ্ট্য। আর এটা তারা করছে নিজেদের স্বার্থে। বিদেশিদের কাছ থেকে যেটুকু পাওয়া যায়, তাতেই তাদের লাভ। এবং সেই লাভটাকে বিদেশে গচ্ছিত রাখাটাই নিরাপদ-এই হচ্ছে তাদের নীতি। তাদের এই নীতিকে নীতিবিগর্হিত বলার আবশ্যকতা দেখি না। একে দেশদ্রোহ বলাই যথেষ্ট। স্পষ্টতই এরা মনে করে যে বাংলাদেশের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। তাই অতিদ্রুততায় যতটুকু হস্তগত করা যায়, সেটুকুই লাভ। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো যত না তৎপর এদের তৎপরতা তার চেয়ে বেশি। আগামী নির্বাচনের পর কী হবে, সেটা অনিশ্চিত। তাই হস্তগত করার কাজটা এখনই করতে হবে। মনোভাবটা এই রকমের।
রাষ্ট্র যখন আছে, তখন রাজনীতি থাকবেই এবং আছেও। অতীতে দেখা গেছে-অবৈধ পথে যারা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে ফেলেন, তারা প্রথমেই যা বলেন তা হলো-তাদের কোনো রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ নেই, এবং তারা অতিদ্রুত নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়ে অব্যাহতি নেবেন। কিন্তু অবৈধ পন্থায় রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করার কাজটা তো নির্জলাভাবেই রাজনৈতিক এবং একেবারে প্রথম দিন থেকেই তারা নতুন রাজনীতি শুরু করেন। দল গড়েন, তাদের পক্ষে কাজ করতে প্রস্তুত এমন লোক খোঁজেন। তাদের উপদেষ্টা বানান, লোকদেখানো সংস্কারের নামে সাধারণ মানুষের কষ্ট বৃদ্ধি করেন এবং সাজানো নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নিজেদের নির্বাচিত বলে ঘোষণা করে দেন। সাধারণ মানুষও বিলক্ষণ রাজনীতি বোঝে, রাজনীতিকে তারা বলে পলিটিকস। ওই পলিটিকস কথাটা সবকিছু পরিষ্কার করে দেয়। বোঝা যায় যে পলিটিকস সবখানেই আছে। রয়েছে এমনকি পরিবারের ভিতরেও, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের ক্ষেত্রেও। এসব ছোট ছোট পলিটিকস রাষ্ট্রে যে পলিটিকস চলছে তার মূল্যবোধ দ্বারাই পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়। কিন্তু ইতিহাস তো এসব কাজ আগেও ক্ষমা করেনি, ভবিষ্যতেও করবে না। তবে সেই ভবিষ্যৎ আমরা পাব কি যদি এখনই প্রতিরোধ গড়ে না তুলি? প্রতিরোধ না গড়লে একাত্তরেই আমরা শেষ হয়ে যেতাম। একাত্তর কিন্তু মিথ্যা নয়, সে বলছে মুক্তির সংগ্রাম চলবেই। এবং নিরাপত্তা অর্থে বিশেষ বিশেষ ব্যক্তির বংশানুক্রমিক নিরাপত্তা নয়, চাই সমগ্র দেশবাসীর জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা।
এই নিরাপত্তার লক্ষ্যে সংগ্রাম করার জন্য নীতি-আদর্শ, স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষায় সত্যিকার বড় রাজনৈতিক দলকে মাঠে দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু মানুষকে তো বাঁচতে হবে। তাই জনগণের জীবনমান উন্নয়ন এবং মানবিক মর্যাদা ও রাষ্ট্রের সম্পদ রক্ষা করবে-এমন রাজনৈতিক শক্তিকে বিকশিত করতে সচেষ্ট হওয়া, দেশপ্রেমিক মানুষমাত্রেরই অবশ্যপালনীয় কর্তব্য ও দায়িত্ব। এটা ভুললে যে ক্ষতিটা হবে তা হবে অপূরণীয়।
লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।