রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২৫ মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
১৯ শাবান, ১৪৪৭ হিজরি

নির্বাচনী ইশতেহার : স্বর্গবাসের প্রতীক্ষা ও গণমাধ্যম বিষয়ে অজ্ঞতা

এম আবদুল্লাহ :

জল্পনা-কল্পনা সংশয়-সন্দেহ পাশে ঠেলে শেষ পর্যন্ত ভোট হচ্ছে। মানুষ মুখিয়ে আছে ব্যালটে সিল দিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে নিজের পছন্দের প্রতিনিধি পাঠাতে। তুমুল প্রচারযুদ্ধের পর চূড়ান্ত ভোটযুদ্ধের সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশ। দু’দিন পরই থেমে যাবে জমজমাট প্রচার-প্রচারণা। ক্ষমতার কেদারায় বসতে ভোট টানার মরিয়া লড়াইয়ের শেষ পর্যায়ে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেবেন প্রতিদ্বন্দ্বী দলের নেতারা। ২০ দিনের প্রচারাভিযানে গোটা বাংলাদেশ চষে বেড়িয়েছেন আগামীর বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রীত্বের দাবিদার দুই শীর্ষ নেতা তারেক রহমান ও ডা. শফিকুর রহমান। প্রচারাভিযানে আবারও প্রমানিত হয়েছে এককেন্দ্রিক নেতৃত্বের রাজনীতিই এখনও বহাল। বিএনপি ও জামায়াতের প্রধান নেতা ছাড়া অন্যরা নিজ আসনের বাইরে প্রচারাভিযানে উল্লেখ করার মতো কোন ভূমিকা রাখেননি বললেই চলে।
দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত ক্লান্তিহীন প্রচারাভিযানে অংশ নিয়েছেন দুই রহমান। রাত-দিন একাকার করে প্রতিটি জনপদকে আলোড়িত কর্রে রাষ্ট্র পরিচালনায় নিজেদের স্বপ্ন ও পরিকল্পনার কথা যেমন তুলে ধরেছেন, তেমনি পরষ্পরের বিরুদ্ধে আক্রমণ, পাল্টা আক্রমণ, সমালোচনা এমনকি বিষোদগারও করেছেন। কখনও তেজি কন্ঠে, কখনওবা নাটকীয় ভঙ্গিতে প্রতিপক্ষকে ঘায়েলের চেষ্টা করেছেন। ক্ষণে ক্ষণে উত্তাপ ছড়িয়েছে ভক্ত অনুরাগীদের মধ্যে। ভার্চুয়াল যুদ্ধ হয়েছে সত্য-মিথ্যার মিশেলে। দুই নেতার সমাবেশগুলো পাখির চোখে দেখে অন্ততঃ লোক সমাগমের বিচারে মনে হয়েছে ‘কেউ কারে নাহি ছাড়ে সমানে সমান’। অনেকগুলো সহিংসতা ও মারামারির ঘটনাও ঘটেছে। প্রাণহানিও হয়েছে।
এরই মধ্যে ক্ষমতাপ্রত্যাশী দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দল-জোট নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে। প্রচারাভিযানে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে ইশতিহারের মাধ্যমে। ক্ষমতায় গেলে কোন কোন নীতি-আদর্শ অনুসরণ করে দেশ পরিচালনা করবেন তা তুলে ধরেছেন। ভোটারের মন ভুলানো ও গলানোর প্রতিশ্রুতি শুনে মনে হতে পারে বাংলাদেশের দুর্ভাগা নাগরিকেরা স্বর্গবাসের খুব কাছাকাছি আছে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যে দলই ক্ষমতায় যাক প্রদত্ত অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়িত হলে দেশ দরদী ও কল্যাণ রাষ্ট্রে পরিণত হবে এবং নাগরিকেরা সুখ-সাগরে ভাসবে বলে আশা করা যায়! নাগরিকদের কোন অপ্রাপ্তি থাকবে না! অসুখ হলে বিনামূল্যে চিকিৎসা মিলবে, খিদে লাগলে কার্ডের মাধ্যমে খাবার মিলবে, মাসোহারা মিলবে, সন্তানের শিক্ষার মাসে পকেটকাটা যাবে না, মায়েদের স্কুলপড়ুয়া বাচ্চাদের জন্যে টিফিনের ব্যবস্থার ঝক্কির পরিবর্তে ‘মিড-ডে মিল’ মিলবে, চাকরি মিলবে কোন পেরেশানি, ঘুষ ও জুতোক্ষয় ছাড়া, আরও কত কি! এমন স্বর্গবাসী হতে কে না চায়? কেবল কয়েকটা দিনের প্রতীক্ষা!
এবারের নির্বাচনে ইশতেহার ঘোষণার বিশেষত্ব হলো- দেড় যুগেরও অধিক সময় ধরে উপেক্ষিত ভোটারদের মন জয় করার প্রানান্তকর চেষ্টা করতে হয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোকে। বিশেষতঃ জুলাই অভ্যুত্থান-উত্তর দেশে রাষ্ট্র সংস্কারকে প্রাধান্য দিতে হচ্ছে সব পক্ষকে, যেটি অতীতের ইশতিহারে ততটা গুরুত্ব দিতে হয়নি। জনআকাঙ্খার নতুন বাংলাদেশের উপযোগী কর্মপরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে আগ্রহ থাকায় এবারের ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠানে বিদেশী কূটনীতিকদের বিপুল উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মত। বিশিষ্ট নাগরিক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও এতটা আগ্রহভরে রাজনৈতিক দলের ইশতিহার ঘোষণার অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে দেখা যায়নি অতীতে। ইশতিহার প্রণয়নের ক্ষেতেও বিশেষতঃ বিএনপি ও জামায়াতকে বেশ শ্রম-ঘাম ঝরাতে হয়েছে, দক্ষতার পরিচয় দিতে হয়েছে। দলের শুভার্থী, শুভাকাঙ্খি দেশি-বিদেশী বিশেষজ্ঞদেরও সহায়তা নিয়েছে দু’দলই।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি শুক্রবার ঘোষিত ইশতেহারে দুর্নীতি দমন এবং আইনের শাসন ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের অঙ্গীকার করেছে। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট করে বলেছেন, “আমরা যদি এই তিনটির ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ না করি, তাহলে আমরা আমাদের কোনো পরিকল্পনাকেই সফল করতে পারব না।’ বিএনপি’র ইশতেহারে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, প্রতিশোধের রাজনীতিতে নয়, ন্যায় ও মানবিকতার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে বিএনপি। ক্ষমতা নয়, জনগণের অধিকারই হবে তাদের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। লুটপাট নয়, উৎপাদন, বৈষম্যহীন, ন্যায্যতার নীতিতে রাষ্ট্র পরিচালনা করা হবে। ইশতেহার অনুযায়ী বিএনপি জনগণের রায়ে দায়িত্ব পেলে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলবে, যেখানে ভোটের মর্যাদা থাকবে, সন্ত্রাস ও দুর্নীতি দমন হবে, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ থাকবে না এবং প্রত্যেক নাগরিক গর্ব করে বলতে পারবে- ‘সবার আগে বাংলাদেশ‘।
বিএনপি তাদের ইশতেহারে দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা, সাবেক চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ভিশন-২০৩০ এবং তারেক রহমানের উপস্থাপন করা রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফা ও জুলাই জাতীয় সনদের বিষয়গুলোকে সমন্বয় করার প্রয়াস দেখা গেছে। ইশতেহারে নয়টি বিষয়কে ‘প্রধান প্রতিশ্রুতি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করে প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা অথবা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা; ‘কৃষক কার্ড’ দেওয়া, দেশব্যাপী এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি সহায়তা ও ‘মিড-ডে মিল’ চালু; কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ নিশ্চিত করা, ক্রীড়াকে পেশা হিসেবে গণ্য করা; ২০ হাজার কিলোমিটার নদী-খাল খনন ও পুনঃখনন, পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ ও আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু; ধর্মীয় নেতাদের জন্য সম্মানী চালু এবং ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যের রপ্তানি সম্প্রসারণ।
অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ২৬ বিষয়ে অগ্রাধিকার দিয়ে ৪১ দফার নির্বাচনী ইশতেহার জাতির সামনে তুলে ধরেছে বুধবার। দলটি তাদের ইশতেহারের নাম দিয়েছে ‘জনতার ইশতেহার‘। ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক সুশাসন, রাষ্ট্র সংস্কার এবং আত্মনির্ভর বাংলাদেশের রূপরেখার অঙ্গীকার করেছে দলটি। ‘চলো একসাথে গড়ি বাংলাদেশ’ স্লোগান উল্লেখ করে বুধবার ইশতেহার ঘোষণা করেন দলের আমীর ডা. শফিকুর রহমান। জামায়াত দাবি করেছে, ‘জনতার ইশতেহারে‘ অ্যাপভিত্তিক প্রচারণার মাধ্যমে সংগৃহীত ৩৭ লাখের বেশি মানুষের মতামত প্রতিফলিত হয়েছে। নির্বাচনী ইশতেহারে যে ২৬ বিষয়ে অগ্রাধিকারের কথা বলা হয়, সেগুলো হলো স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থে আপসহীন রাষ্ট্র; বৈষম্যহীন, ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক একটি মানবিক বাংলাদেশ; যুবকদের ক্ষমতায়ন এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁদের প্রাধান্য দেওয়া; নারীদের জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্র, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সার্বিক উন্নয়নের মাধ্যমে মাদক, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসমুক্ত একটি নিরাপদ রাষ্ট্র বিনির্মাণ।
জামায়াত সরকারি চাকরিতে বিনা মূল্যে আবেদন, মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ ও সব ধরনের বৈষম্য দূরীকরণ; ব‍্যাংকসহ সার্বিক আর্থিক খাত সংস্কারের মাধ্যমে আস্থা ফিরিয়ে এনে বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব টেকসই স্বচ্ছ অর্থনীতি বিনির্মাণ; সমানুপাতিক (পিআর) পদ্ধতির নির্বাচন পদ্ধতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী করে সুসংহত ও কার্যকর গণতন্ত্র নিশ্চিত করা; সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু (মেজরিটি-মাইনরিটি) নয়, বরং সবার নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা; আধুনিক ও সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা প্রদান এবং গরিব ও অসহায় জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যায়ক্রমে বিনা মূল্যে উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা; বিশ্বের চাহিদা সামনে রেখে শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার এবং পর্যায়ক্রমে বিনা মূল্যে শিক্ষা নিশ্চিত করা; দ্রব্যমূল্য ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা এবং অন্যান্য মৌলিক চাহিদার পূর্ণ সংস্থানের নিশ্চয়তা; যাতায়াতব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো এবং রাজধানীর সঙ্গে বিভাগীয় শহরগুলোর সড়ক বা রেলপথের দূরত্ব দু-তিন ঘণ্টায় নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ভোটারদের।
বিএনপি জুলাই জাতীয় সনদে যেসকল সংস্কারের বিষয়ে একমত হয়েছে সেগুলোই কেবল বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে নির্বাচনী ইশতেহারে। যে সব বিষয়ে তাদের দ্বিমত ছিল সেগুলো বাস্তবায়নের অঙ্গীকার থেকে বিরত থেকেছে। উচ্চকক্ষ গঠনের প্রতিশ্রুতি দিলেও তারা আগের অবস্থানই ব্যক্ত করেছে ইশতেহারে। অর্থাৎ ভোটের ভিত্তিতে নয়, আসনের ভিত্তিতে উচ্চকক্ষ গঠন করবে। এতে করে ইসলামী আন্দোলনসহ যেসব দল পৃথক মার্কায় নির্বাচন করে প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যানুপাতে উচ্চকক্ষে আসন পাওয়ার প্রত্যাশা করছিল তা পূরণ হবে না।
এবার দু’টি দল গণমাধ্যম, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকতার স্বাধীনতা প্রশ্নে ইশতেহারে কী বলেছে সে দিকে নজর দেওয়া যাক। বিএনপি গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে চায় উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ২০০১-০৬ সময়ে স্বাধীনভাবে গণমাধ্যমে তৎকালীন সরকারকে বিভিন্ন সমালোচনা করা হয়েছে। কিন্তু এর জন্য কোনো সংস্থা থেকে পত্রিকায় ফোন করা হয়নি, যা গত ১৬-১৭ বছর দেখা গেছে। ইশতিহারে বলা হয়েছে- সাংবাদিকদের কাজের সুরক্ষা প্রদান এবং দায়িত্বশীল গণমাধ্যমের ওপর সব ধরনের আগ্রাসন প্রতিরোধ করবে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পুনঃনিরীক্ষণ এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা প্রত্যাহার করবে। সাংবাদিক হত্যা ও নির্যাতনের বিচার নিশ্চিত ও সুরক্ষায় বিশেষ সেল গঠন করবে। গণমাধ্যমের জন্যে স্বাধীন রেগুলেটরি বডি গঠন এবং ৩০ দিনের মধ্যে অনলাইনে অভিযোগ নিষ্পত্তি করবে। জাতীয় সাংবাদিক অবসর কল্যাণ বোর্ড গঠন এবং সরকারি বিজ্ঞাপনের রাজনৈতিক পক্ষপাত দূর করবে।
মুক্ত সংবাদমাধ্যম ও স্বাধীন সাংবাদিকতা ইস্যুতে বিএনপি যে অঙ্গীকার করেছে তা বেশ দুর্বল ও সংক্ষিপ্ত। সাংবাদিক হত্যা নির্যাতনের বিচার ও সুরক্ষা সেলের প্রতিশ্রুতি সাংবাদিকদের আশাবাদের জায়গা তৈরি করতে পারে। তবে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পুনঃনিরীক্ষার প্রতিশ্রুতি কেন তা বোধগম্য নয়। এ কালো আইনটি সাংবাদিক সমাজের আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকার বাতিল করতে বাধ্য হয়েছিল। এখন কী পুননিরীক্ষা করবে বোঝা গেল না। এটা কি অজ্ঞতাবতঃ অঙ্গীকার? ওই আইনে করা হয়রানিমূলক মামলাগুলোও ইতোমধ্যে বাতিল করা হয়েছে। অথচ মামলা বাতিলের অঙ্গীকার করা হয়েছে ইশতেহারে। জাতীয় সাংবাদিক অবসর কল্যাণ বোর্ড গঠনের প্রতিশ্রুতিতেও বিভ্রাট রয়েছে। কারণ সাংবাদিকদের কল্যাণে একটি ট্রাস্ট কাজ করছে ২০১৪ সাল থেকেই। ওই ট্রাস্টের উদ্যোগে ইতোমধ্যে প্রবীণ সাংবাদিকদের অবসরকালীণ সম্মানি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ সংক্রান্ত নীতিমালা অনুমোদনে গত সপ্তাহে তথ্য মন্ত্রণালয়ে অংশীজনদের নিয়ে সভাও হয়েছে। এ নীতিমালা অনুমোদন করলেই সাংবাদিকদের অবসর সুবিধা দেওয়া সম্ভব হবে। একটু খোঁজখবর করে গণমাধ্যম সংক্রান্ত ইশতেহার প্রণয়ন কলে এমন ভুল ও বিভ্রান্তিমূলক বিষয় স্থান পেত না।
জামায়াতের গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতা সংক্রান্ত অঙ্গীকারেও ভুল ও ভ্রান্তি দেখা যাচ্ছে। জামায়াতে ইসলামী তাদের নির্বাচনী ইশতেহারের প্রথম ভাগে ১০ নম্বরে তথ্য ও গণমাধ্যম শিরোনামে অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। ভিশন হিসেবে উল্লেখ করেছে- ‘অবাধ তথ্যপ্রবাহ, স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যমের নিশ্চয়তা’। তাদের এ সংক্রান্ত ৯ দফা অঙ্গীকারের মধ্যে রয়েছে- গণমাধ্যমে সুস্থ ও সৃজনশীল চিন্তার প্রসারের লক্ষ্যে জাতীয় গণমাধ্যম নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে; সংবিধান ও মানবাধিকারের আলোকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে; ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য সরকারের আমলে গণমাধ্যমে যেসব ফ্যাসিবাদী দমননীতি প্রয়োগ করা হয়েছে, সেগুলোর পূর্ণ পর্যালোচনা করা হবে; অতীতে বন্ধ পত্রিকা, টিভি, নিউজ পোর্টাল পুনরায় চালুর সুযোগ দেওয়া হবে এবং অবৈধভাবে ডিক্লারেশন বাতিলের ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে; রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার ও বাসসকে রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্ব বজায় রেখে স্বায়ত্ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা হবে বেসরকারি টেলিভিশনে রাষ্ট্রীয় সংবাদ প্রচারে বাধ্য করার সংস্কৃতি বন্ধ করা হবে।
জামায়াতের অঙ্গীকারে আরও বলা হয়, সাংবাদিকদের জন্যে ওয়েজবোর্ড নিয়মিত হালনাগাদ করা হবে। সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারিদের বেতন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সাংবাদিকদের ওয়েজবোর্ডও হালনাগাদ ও বাস্তবায়ন করা হবে; ডিএফপি’র বিজ্ঞাপন বিতরণে স্বচ্ছতা ও বৈষম্যহীনতা নিশ্চিত করা হবে: গণমাধ্যমে পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে সাংবাদিক সংগঠন ও প্রেস কাউন্সিলকে কার্যকর, স্বচ্ছ ও স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হবে। বিশেষ করে প্রেস কাউন্সিলের বিচারিক ক্ষমতা বাড়ানো হবে এবং গুজব, অপপ্রচার ও অপসাংবাদিকতা রোধে সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতাকে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে উৎসাহিত করা হবে।
জামায়াত ফ্যাসিবাদী শাসনে বন্ধ গণমাধ্যম খুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করার যে কথা উল্লেখ করেছে তা বিভ্রান্তকর। কারণ বন্ধ করা সকল গণমাধ্যমই চালুর ব্যবস্থা ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পরই হয়েছে। অধিকাংশ চালুও হয়েছে। দলটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দিগন্ত টেলিভিশন চালুর অনুমতি চব্বিশের আগস্ট মাসের মধ্যে দেওয়া হলেও এখনও পর্যন্ত চালু করতে পারেনি। ফলে নতুন করে চালুর সুযোগ দেওয়ার অঙ্গীকার অপ্রাসঙ্গিক। তবে বন্ধ করে দেওয়া গণমাধ্যমের বিষয়ে পর্যালোচনা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার অঙ্গীকার করলে প্রশংসিত হতো। বেসরকারি টেলিভিশনে রাষ্ট্রীয় সংবাদ প্রচারে বাধ্য করার সংস্কৃতি বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। অথচ অভ্যুত্থানের পর নাহিদ ইসলাম তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টার দায়িত্ব্ পালনকালে এটা বন্ধ করা হয়েছে। জামায়াতের অঙ্গীকারে ডিএফপি’র বিজ্ঞাপন বিতরণে স্বচ্ছতা ও বৈষম্যহীনতা নিশ্চিত করার কথা বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে ডিএফপি এখন কোন বিজ্ঞাপন বিতরণ করে না। ডিএফপি’র কাছ থেকে অনেক আগেই এটা সংশ্লিষ্ট দপ্তর-সংস্থায় চলে গেছে। আবার ‘ডিএফপি’ লেখে ব্রাকেটে লেখা হয়েছে ‘তথ্য অধিদপ্তর’। ডিএফপি’র পূর্ণ নাম হচ্ছে ‘চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর’।
পেশাদার সাংবাদিক ও সাংবাদিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ইশতেহার প্রণয়ন করলে এমন সব হাস্যকর ভুল-ভ্রান্তি হওয়ার কথা নয়। দু’টি দলই এ ক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। তবে বিএনপি’র তুলনায় জামায়াতের অঙ্গীকারের পরিধি ব্যপৃত ও সুনির্দিষ্ট। ওয়েজবোর্ড, পে স্কেলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বেতন, সুরক্ষার বিষয়ে জামায়াতের প্রতিশ্রুতি প্রশংসিত হতে পারে। দু’দলই দায়িত্বশীলতার শর্ত জুড়ে দেওয়ায় কখনও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে নিপীড়নমূলক পদক্ষেপ নিলে তাকে ‘দায়িত্বহীন সাংবাদিকতা’র বিরুদ্ধে বলে যৌক্তিকতা দেওয়ার চেষ্টা করতে পারবে।
গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতা সংক্রান্ত ইশতেহারের ভুল-ভাল দেখে পুরো ইশতেহারের নির্ভুলতা নিয়েও সন্দেহ করার অবকাশ থাকে। তার পর নতুন বাংলাদেশের উপযোগী অঙ্গীকারনামা যাতে নির্বাচনপূর্ব ভোটারের মন ভোলানোর কৌশলে পর্যবসিত না হয়, সেই প্রত্যাশা রইলো।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনীতি বিশ্লেষক