রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৯ ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
৪ রমজান, ১৪৪৭ হিজরি

ট্রাম্পের শুল্ক অবৈধ রায়ে বিশ্ববাণিজ্যে অস্থিরতা

বিশেষ প্রতিবেদক : যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টে বড় ধরনের আইনি ধাক্কা খাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মাথায় বিশ্ববাণিজ্যে নতুন অস্থিরতা তৈরি করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) এক বিশেষ ঘোষণায় তিনি বিশ্বের সব দেশ থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর নতুন করে ১০ শতাংশ ‘বৈশ্বিক শুল্ক’ আরোপের নির্দেশ দেন। বিশ্লেষকেরা এটিকে তাঁর ‘সুরক্ষাবাদী’ নীতির আগ্রাসী প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখছেন।

গতকাল শুক্রবার মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ৬-৩ ভোটে প্রেসিডেন্টের আগের বিতর্কিত ‘পাল্টাপাল্টি শুল্ক’ নীতিকে অবৈধ ঘোষণা করে। আদালত জানায়, প্রেসিডেন্ট জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইনের দোহাই দিয়ে ঢালাও শুল্ক বসাতে পারেন না। কর আরোপের ক্ষমতা একমাত্র মার্কিন কংগ্রেসের। এর ফলে গত বছর বাংলাদেশের ওপর আরোপিত ১৯-২০ শতাংশ এবং অন্যান্য দেশের ওপর বাড়তি শুল্কের আইনি ভিত্তি রাতারাতি ধসে পড়ে।

কিন্তু রায়ের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ট্রাম্প ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ‘ধারা ১২২’ ব্যবহার করে নতুন প্রোক্লেমেশনে স্বাক্ষর করেন। এই ধারাটি প্রেসিডেন্টকে ‘বিরাট ও গুরুতর’ ব্যালেন্স অব পেমেন্ট সংকট মোকাবিলায় সর্বোচ্চ ১৫০ দিনের জন্য ১৫ শতাংশ পর্যন্ত সাময়িক শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেয়। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, নতুন এই ১০ শতাংশ ‘অ্যাড ভ্যালোরম’ শুল্ক ২৪ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা ১ মিনিট (ইএসটি) থেকে কার্যকর হবে। এটি প্রাথমিকভাবে ১৫০ দিন স্থায়ী হবে। মেয়াদ বাড়াতে হলে কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন হবে।

তবে জ্বালানি তেল, জরুরি ওষুধ, কৃষিপণ্য, টেলিযোগাযোগ ও মহাকাশ সরঞ্জাম, বই এবং অনুদান হিসেবে প্রাপ্ত সামগ্রীকে শুল্কমুক্ত রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য প্রভাব

বাংলাদেশের ওপর প্রথমে পাল্টা শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল ৩৫ শতাংশ। পরে আলোচনার মাধ্যমে তা কমিয়ে ২০ শতাংশে আনা হয়। শেষ পর্যন্ত ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ নামে চুক্তি স্বাক্ষরের পর বাংলাদেশের ওপর শুল্ক এখন ১৯ শতাংশ।

চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কিনবে, ১৫ বছরে ১৫০০ কোটি ডলারের জ্বালানি আমদানি করবে এবং বছরে ৩৫০ কোটি ডলারের কৃষিপণ্য আমদানি করবে।

সুপ্রিম কোর্টের রায়ের ফলে বাংলাদেশের জন্য একই সঙ্গে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।

  • শুল্ক হ্রাস ও প্রতিযোগিতা: তৈরি পোশাকের ওপর শুল্ক ২০ থেকে ১৯ শতাংশে নামানো হয়েছে। তবে নতুন বৈশ্বিক শুল্ক কার্যকর হলে খরচ প্রায় অর্ধেক কমে আসবে। কিন্তু ভারত ও ভিয়েতনামের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা বাড়বে।
  • আগের শুল্ক ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা: আইনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত এক বছরে অবৈধভাবে সংগৃহীত শুল্ক ফেরত দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের রপ্তানিকারকেরা কয়েক শ কোটি ডলার ফেরত পাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন।
  • পোশাক খাতের ঝুঁকি: অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক মার্কিন বাজারে খুচরা মূল্য বাড়িয়ে দিতে পারে। এতে ক্রেতাদের চাহিদা কমে গেলে বাংলাদেশের পোশাক খাতের ৪৬ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়বে।

ভারতের জন্য স্বস্তি

ভারত রাশিয়া থেকে তেল আমদানির ওপর আরোপিত ৫০ শতাংশ শুল্ক থেকে ছাড় পেয়েছে। নতুন বৈশ্বিক শুল্ক কার্যকর হলে ভারতের প্রকৃত হার দাঁড়াবে প্রায় ১৩.৫ শতাংশ। এতে ভারতীয় রপ্তানিকারকেরা বড় সুবিধা পাবেন। বিশেষ করে টেক্সটাইল, ইঞ্জিনিয়ারিং, রত্ন ও ক্ষুদ্র শিল্প খাত স্বস্তি পাবে। তবে প্রতিশ্রুত তেল আমদানি না করলে পুনরায় উচ্চ শুল্কের ঝুঁকি রয়েছে।

বৈশ্বিক প্রভাব

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন শুল্কের ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর বার্ষিক রপ্তানি আয় প্রায় ৮৯ বিলিয়ন ডলার কমতে পারে। এতে শ্রম-নিবিড় খাতে কর্মরত নারীরা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও ব্রাজিলের মতো দেশগুলোর জিডিপি ০.৬ থেকে ১ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। বিশ্বব্যাপী মন্দার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশের করণীয়

বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা রিসিপ্রোকাল শুল্ক চুক্তির চূড়ান্ত অনুমোদন আপাতত স্থগিত রাখা উচিত। যেহেতু নতুন শুল্কের মেয়াদ মাত্র ১৫০ দিন, তাই এই সময়ের মধ্যে ওয়াশিংটনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় বিশেষ ছাড় আদায়ের চেষ্টা করতে হবে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আসিয়ান দেশগুলোতে রপ্তানি বাড়িয়ে বাজারে বৈচিত্র্য আনতে হবে।

সব মিলিয়ে ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে বিশ্ববাণিজ্যে এক নতুন অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে, যার গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করবে আগামী জুনে মার্কিন কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত।