মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৩ চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
২৭ রমজান, ১৪৪৭ হিজরি

প্রশ্নফাঁসের আবেদ আলীর পর পিএসসির কোটিপতি চালক

বিশেষ প্রতিনিধি : বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) আরও এক দুর্নীতিগ্রস্ত গাড়িচালকের সন্ধান পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মো. আতাউর রহমান নামের ওই চালকের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সাড়ে তিন কোটি টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা করেছে সংস্থাটি।

আজ রোববার দুদকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, কমিশনের সমন্বিত কার্যালয় ঢাকা-১-এ সহকারী পরিচালক আসিফ আল মাহমুদ বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেছেন।

উল্লেখ্য, প্রশ্নফাঁস চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে পিএসসি চেয়ারম্যানের সাবেক গাড়িচালক সৈয়দ আবেদ আলী বর্তমানে একাধিক মামলার মুখোমুখি। তাঁর বিরুদ্ধেও অঢেল সম্পত্তির মালিক হওয়ার প্রমাণ পেয়েছে দুদক। সিআইডির তদন্তে তাঁর প্রায় ৫০ কোটি টাকার বেশি সম্পদ—মির্জাপুরে ছয়তলা ভবন, ফ্ল্যাট ও দামি গাড়ি—পাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। কুলি থেকে গাড়িচালক হয়ে ওঠা আবেদ আলী বর্তমানে প্রশ্নফাঁস কেলেঙ্কারিতে কারাগারে আছেন।

দুদক সূত্র জানায়, প্রশ্নফাঁস, নিয়োগ-বাণিজ্য এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ায় নানা অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগে আতাউর রহমানের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শেষ করেছে সংস্থাটি। অনুসন্ধানে তাঁর ব্যাংক হিসাবে অস্বাভাবিক আর্থিক লেনদেন এবং বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ গ্রহণের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

২০১৪ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সময়ে তাঁর নামে থাকা কয়েকটি ব্যাংক হিসাবে ১৮৯টি সুনির্দিষ্ট লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিটি লেনদেনে তিনি সর্বনিম্ন ৫০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত গ্রহণ করেছেন। তবে এসব লেনদেনের বৈধ উৎস দেখাতে পারেননি আতাউর। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এভাবে তিনি ৩ কোটি ২২ লাখ ২৮ হাজার ৫৪৪ টাকা আত্মসাৎ করেছেন।

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, আতাউর বিভিন্ন সময়ে নিজের ব্যাংক হিসাবে কোটি কোটি টাকা গ্রহণ করেছেন। শুধু ব্যাংকিং চ্যানেল নয়, মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমেও কোটি কোটি টাকা লেনদেনের প্রমাণ পেয়েছে দুদক। নিজের নামে ছাড়াও পরিবারের সদস্য ও নিকটাত্মীয়দের হিসাব ব্যবহার করে ঘুষের অর্থ লেনদেন করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

অবৈধ আয়ের অর্থে রাজধানীতে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে একাধিক ফ্ল্যাট, প্লট এবং গাড়ি কেনার তথ্যও পাওয়া গেছে।

পিএসসির একটি সূত্র জানিয়েছে, অভ্যন্তরীণ তদন্তে আতাউরের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। এসব কারণে তাঁকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। এ বিষয়ে পিএসসির জনসংযোগ কর্মকর্তা এস এম মতিউর রহমান বলেন, বিষয়টি তাঁর জানা নেই; খোঁজ নিয়ে পরে জানাবেন।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, আতাউর রহমান সাবেক পিএসসি সদস্য শেখ আলতাফ আলীসহ একাধিক সদস্য ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার অফিসিয়াল চালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। দায়িত্ব পালনের সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

দুদকের মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন বলেন, “অনুসন্ধান শেষে মামলার জন্য সুপারিশ করা হলে, অনুসন্ধান কর্মকর্তার সুপারিশ আমলে নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”

এ বিষয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, “পিএসসির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের একজন গাড়িচালকের বিরুদ্ধে এ ধরনের ভয়াবহ দুর্নীতির অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এটি আমাদের দুর্নীতির ব্যাপকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার বড় উদাহরণ।”

তিনি আরও বলেন, “রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি, প্রশাসনের উদাসীনতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধপ্রবণতা বাড়াচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি যেকোনো ক্ষেত্রে দুর্নীতিবাজদের আইনের আওতায় না আনলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে। দুর্নীতির বিস্তার রোধে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ প্রয়োজন।”