শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৬ শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১৬ সফর, ১৪৪৮ হিজরি

নবজাগরণের প্রতিশ্রুতি- চৈত্র সংক্রান্তি আজ

বিশেষ প্রতিবেদক : ঋতুচক্রের অবিরাম আবর্তনে আরেকটি বাংলা বছর আজ বিদায় নিচ্ছে। চৈত্রের প্রখর রোদে শুকনো পাতার মৃদু শব্দ যেন বিদায়ের বিষণ্ন সুর বাজিয়ে তোলে, আর সেই সুরে মিশে থাকে নতুনের আহ্বান ও নবজাগরণের প্রতিশ্রুতি। বিদায় ও আগমনের এই সন্ধিক্ষণেই উপস্থিত হয়েছে চৈত্র সংক্রান্তি—বাংলার মানুষের আবেগ, ঐতিহ্য ও অস্তিত্বের এক গভীর প্রতীক।

আজ ৩০ চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ—বাংলা সনের অন্তিম দিন। এটি কেবল একটি পঞ্জিকার সমাপ্তি নয়; বরং এক বছরের ক্লান্তি, জীর্ণতা ও গ্লানিকে বিদায় জানানোর প্রতীকী মুহূর্ত। নতুন উদ্যমে জীবনকে পুনরারম্ভ করার অন্তর্লীন প্রেরণা জাগায় এই দিন। তাই চৈত্র সংক্রান্তি বিদায়ের পাশাপাশি নবসূত্রে গাঁথারও অঙ্গীকার বহন করে।

চৈত্রসংক্রান্তি পালনের আচার-অনুষ্ঠান অঞ্চলভেদে ভিন্ন হলেও এর মূল সুর এক—ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা। একসময় পাহাড়ি জনগোষ্ঠী ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও আজ তা সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের অংশগ্রহণে এটি পেয়েছে সর্বজনীন স্বীকৃতি। পাহাড়ি জনগোষ্ঠী তিনদিনব্যাপী উৎসবের মধ্য দিয়ে নববর্ষকে বরণ করে নেয়, যা তাদের নিজস্ব ঐতিহ্যের বর্ণাঢ্য প্রকাশ।

গ্রামবাংলার নিসর্গে চৈত্র সংক্রান্তির আবহ আরও প্রাণবন্ত। পুরনো বছরের দুঃখ ও ব্যর্থতাকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতিতে মুখর হয়ে ওঠে জনপদ। ব্যবসায়িক জীবনে পুরনো হিসাব চুকিয়ে নতুন করে ‘হালখাতা’ খোলার প্রথা নতুন সূচনার প্রতীক হয়ে ওঠে।

খাদ্য সংস্কৃতিতেও এই দিনের রয়েছে বিশেষত্ব। আমিষ বর্জন করে নিরামিষ আহারের রীতি আজও বহমান। কোথাও ১৪ প্রকার শাক দিয়ে ‘শাকান্ন’ রান্নার প্রথা প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতার প্রকাশ, আবার কোথাও ছাতু খাওয়ার প্রচলনও ঐতিহ্যের অংশ। চৈত্র মাসে রোগবালাই বৃদ্ধির আশঙ্কা থেকে তেতো ও শাকসবজি খাওয়ার রীতি প্রাচীন জীবনবোধের প্রতিফলন, যেখানে স্বাস্থ্য ও সংস্কৃতি একসূত্রে গাঁথা।

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে চৈত্র সংক্রান্তি ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ দিন। ব্রতপালন, শিবপূজা ও নানা বিধান পালনের মধ্য দিয়ে তারা দিনটিকে ধারণ করে। সন্ধ্যার অন্ধকারে জ্বলে ওঠা প্রদীপ ভবিষ্যতের আলোকবর্তিকা হয়ে শান্তি ও সমৃদ্ধির প্রার্থনা জাগায়।

শহুরে জীবনে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চৈত্র সংক্রান্তির রূপ বদলালেও গ্রামীণ ঐতিহ্যের অনুষঙ্গ আজও অটুট। মেলা, পুতুলনাচ, বায়োস্কোপ, পটচিত্র, যাত্রাপালা, লোকসংগীত ও নৃত্যের আয়োজন দিনটিকে জীবন্ত করে তোলে। সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো নতুন প্রজন্মের কাছে এই ঐতিহ্যকে তুলে ধরছে, বাঙালির শেকড়ের গল্প পৌঁছে দিচ্ছে তাদের কাছে।

এ বছরও চৈত্র সংক্রান্তিকে ঘিরে দেশব্যাপী নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আয়োজনে দিনটি উদযাপিত হবে নানান আয়োজনের মধ্য দিয়ে। বিকেল ৩টায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত হবে লোকশিল্প প্রদর্শনী। প্রায় ৫০ জন যন্ত্রশিল্পীর সম্মিলিত অংশগ্রহণে পরিবেশিত হবে অর্কেস্ট্রা ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর’, যা উৎসবের সম্মিলিত স্পন্দন বয়ে আনবে। উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে ৩০ জন নৃত্যশিল্পীর পরিবেশনায় ধামাইল নৃত্য দর্শকদের আবিষ্ট করবে ঐতিহ্যের ছন্দে।

অনুষ্ঠানের ধারাবাহিকতায় পরিবেশিত হবে লোকসংগীত জারিগান, পটগান ও পুঁথিপাঠ, যা বাংলার লোকজ সাহিত্য ও সুরের ঐশ্বর্যকে নতুনভাবে উন্মোচন করবে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংগীত ও নৃত্য পরিবেশনা এই আয়োজনকে বহুসাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ করবে। লোকসাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে মঞ্চস্থ হবে যাত্রাপালা ‘রহিম বাদশা রূপবান কন্যা’, যা দর্শকদের মনে জাগাবে গ্রামীণ জীবনের চিরন্তন রূপকথার আবেশ।