মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১ বৈশাখ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
২৫ শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি

পাহাড়ের প্রাণের উৎসব সাংগ্রাই, মিলনমেলায় রূপ নিল বান্দরবান

বান্দরবান প্রতিনিধি : বান্দরবানে মারমা সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব সাংগ্রাই পোয়ের বর্ণাঢ্য শোভাযত্রায় পাহাড়ি-বাঙালি ১২টি জাতিগোষ্ঠীর নারী-পুরুষ ও তরুণ-তরুণীরা নিজ নিজ ঐতিহ্যবাহী পোশাকে অংশ নেন। সোমবার সকালে বান্দরবান শহর ও রাজার মাঠ থেকে তোলা।

রঙিন পোশাক, পাহাড়ি ঢোলের তালে তালে নৃত্য, হাতে বর্ণিল ফেস্টুন—উৎসবের আবহে মুখর হয়ে উঠেছে পার্বত্য জেলা বান্দরবান। বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে মারমা সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব সাংগ্রাই। পাহাড়ি-বাঙালিসহ ১২টি জাতিগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে এই আয়োজন রূপ নিয়েছে সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের এক অনন্য মিলনমেলায়।

সোমবার (১৩ এপ্রিল) সকাল ৮টায় বান্দরবান শহরের ঐতিহ্যবাহী রাজার মাঠ থেকে শোভাযাত্রার উদ্বোধন করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য রাজপুত্র সাচিং প্রু জেরী।
এ সময় চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, চাক, ম্রো, খিয়াং, খুমি, বম, বাঙালি ও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর নারী-পুরুষ ও তরুণ-তরুণীরা নিজ নিজ ঐতিহ্যবাহী পোশাকে শোভাযাত্রায় অংশ নেন।

ঢোল, কাঁসি ও ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে শোভাযাত্রাটি শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে আবার রাজার মাঠে এসে শেষ হয়। পথে পথে উৎসুক দর্শকদের ভিড়, হাসি আর শুভেচ্ছা বিনিময়ে উৎসবের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে পুরো শহরজুড়ে।

এ সময় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. আবু তালেবসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা, জনপ্রতিনিধি, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

প্রধান অতিথি সংসদ সদস্য রাজপুত্র সাচিং প্রু জেরী বলেন, পার্বত্য জেলা বান্দরবানে পাহাড়ি ও বাঙালি মিলিয়ে ১২টি জাতিগোষ্ঠীর সম্প্রীতিপূর্ণ সহাবস্থান দেশের জন্য একটি অনন্য দৃষ্টান্ত। তিনি আরো বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর স্বতন্ত্র পরিচয় ও অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন বলেই আজ পার্বত্য অঞ্চলে বহুজাতিক সহাবস্থানের এই সৌন্দর্য গড়ে উঠেছে। ফলে পার্বত্য বান্দরবান আজ সৌহার্দ্যপূর্ণ সহাবস্থানের এক অনন্য মিলনভূমিতে পরিণত হয়েছে।

সংসদ সদস্য আরো বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সব জাতিগোষ্ঠীর সমঅধিকার, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও ভ্রাতৃত্বের ভিত্তিতে একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।
তিনি সম্প্রীতি বজায় রেখে উন্নয়নের ধারাকে এগিয়ে নিতে সবার সহযোগিতা কামনা করেন।

শোভাযাত্রা শেষে রাজার মাঠে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনাসভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে বিভিন্ন পাহাড়ি সম্প্রদায়ের তরুণ-তরুণীরা ঐতিহ্যবাহী নৃত্য ও গান পরিবেশন করে দর্শকদের মুগ্ধ করেন।

এদিকে সকাল ১০টায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটে বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মানে পূজা অনুষ্ঠিত হয়। নতুন বছরের মঙ্গল কামনায় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ এতে অংশ নেন।

সাংগ্রাই উৎসব উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক উঃ থুইমং প্রু মারমা জানান, ১৩ এপ্রিল শুরু হওয়া এই উৎসব চলবে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত। উৎসবের আয়োজনসমূহের মধ্যে রয়েছে—১৪ এপ্রিল বুদ্ধস্নান, ১৫ ও ১৬ এপ্রিল পিঠা উৎসব, ঐতিহ্যবাহী বলী খেলা, তৈলাক্ত বাঁশে চড়া প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং সাংগ্রাইয়ের প্রধান আকর্ষণ মৈত্রী পানি বর্ষণ বা জলকেলি উৎসব।

সাংগ্রাই উৎসবকে ঘিরে ইতিমধ্যে বান্দরবান শহর ও আশপাশের এলাকায় বইছে উৎসবের আমেজ। পাহাড়ি-বাঙালি সব সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণে এই উৎসব হয়ে উঠছে সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের এক অনন্য প্রতীক।

রঙিন পোশাকে তরুণ-তরুণী, ঢোলের তালে নৃত্য, শুভেচ্ছা বিনিময়—সব মিলিয়ে সাংগ্রাই যেন শুধু একটি উৎসব নয়, বরং পাহাড়ি জীবনের আনন্দ, ঐতিহ্য ও সহাবস্থানের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

চার দিনব্যাপী এই আয়োজন ঘিরে এখন আনন্দে ভাসছে বান্দরবান—আর সাংগ্রাই হয়ে উঠছে পাহাড়ের মানুষের মিলনমেলার সবচেয়ে বড় উৎসব।

মারমা সম্প্রদায়ের বয়োজ্যেষ্ঠদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পুরনো বছরের সব দুঃখ, গ্লানি ও অশুভকে বিদায় জানিয়ে এবং নতুন বছরকে শান্তি, মৈত্রী ও সম্প্রীতির মাধ্যমে স্বাগত জানাতে প্রতিবছর এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে ৩, ৫ বা ৭ দিনব্যাপী এই উৎসব উদযাপন করা হয়।

বান্দরবান ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক মংনুচিং মারমা বলেন, মারমা বর্ষপঞ্জি বা ‘ম্রাইমা সাক্রয়’ একটি ঐতিহ্যবাহী বর্ষপঞ্জি। প্রতি বছর এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি, সাধারণত ১৩ থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মারমা সম্প্রদায় ‘সাংগ্রাই’ উৎসব উদযাপন করে। পুরনো বছরকে বিদায় ও নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে এটি ৩-৫-৭ দিনের মূল অনুষ্ঠান এবং মাসব্যাপী নানা সাংস্কৃতিক ও জলকেলি কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় পাহাড়জুড়ে সৃষ্টি হয় আনন্দ-উচ্ছ্বাসের এক অনন্য পরিবেশ। গ্রাম-শহরজুড়ে তরুণ-তরুণী, শিশু ও প্রবীণদের অংশগ্রহণে উৎসব রূপ নেয় মিলনমেলায়।