শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৬ শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১৬ সফর, ১৪৪৮ হিজরি

শাহবাগ থানার ভেতরেই ডাকসুর দুই নেতার উপর ছাত্রদলের হামলায় অন্তত ১০ সাংবাদিক আহত

নিজস্ব প্রতিবেদক : সামাজিক মাধ্যমের একটি ভুয়া পোস্টকে কেন্দ্র করে রাজধানীর শাহবাগ থানায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সমাজসেবা সম্পাদক এ বি জুবায়ের ও সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক মোসাদ্দেক আলী ইবনে মোহাম্মদের ওপর হামলা করার অভিযোগ উঠেছে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, থানার ভেতরে আটকে জুবায়ের ও মোসাদ্দেককে বেধড়ক মারধর করা হয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাত ৮টার দিকে শাহবাগ থানায় উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হলে ঘটনাস্থলে আসেন তারা।
এ ছাড়া ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য সাইয়েদুজ্জামান নূর আলভিও মারধরের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মেয়ে জাইমা রহমানের নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপত্তিকর পোস্ট ছড়ানো হয়। সেই পোস্টকে ভুয়া দাবি করে রাত ৮টার দিকে রাজধানীর শাহবাগ থানায় জিডি করতে যান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) শিবির প্যানেলের প্রার্থী আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ ও মাস্টারদা সূর্যসেন হলের কার্যনির্বাহী সদস্য সাইয়েদুজ্জামান আলভি। এ সময় ছাত্রদল নেতাকর্মীরা সেখানে উপস্থিত হন।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা, এ ঘটনার পর রাত ৮টার দিকে শাহবাগ থানায় প্রবেশ করেন এ বি জুবায়ের ও মোসাদ্দেক আলী ইবনে মোহাম্মদ। এ সময় ছাত্রদল নেতাকর্মীরা তাদের ঘিরে ধরেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে পড়ে। পরে ছাত্রদল নেতাকর্মীরা তাদের দুজনকে কিল-ঘুষি মারতে শুরু করেন।
প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, শাহবাগ থানার সামনে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হলে এক পর্যায়ে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে উভয় পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।
এ সময় ঘটনার ভিডিও ধারণ করতে গেলে বেশ কয়েকজন সাংবাদিককেও মারধর করেন ছাত্রদল নেতাকর্মীরা। এ সময় ‘কিসের সাংবাদিক’ বলে তাদের ওপর হামলা করা হয় বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত অন্তত ১০ জন সাংবাদিক আহত হয়েছেন। আহত সাংবাদিকদের মধ্যে রয়েছেন- কালের কণ্ঠের মানজুর হোসেন মাহি, আগামীর সময়ের লিটন ইসলাম, ঢাকা ট্রিবিউনের শামসুদ্দৌজা নবাব, ঢাকা মেইলের মোহাম্মদ ইফতেখার হোসেন সিফাত, নয়া দিগন্তের হারুন ইসলাম, মানবজমিনের আসাদুজ্জামান খান, ডেইলি অবজারভারের নাইমুর রহমান ইমন।
হামলায় ঢাকা মেইলের মোহাম্মদ ইফতেখার হোসেন সিফাত চোখে এবং মুখে গুরুতর আহত হয়। পরে তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মেডিক্যালে চিকিৎসার জন্য নেয়া হয়। প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা সংঘবদ্ধভাবে এই হামলা চালান।
ভুক্তভোগীদের একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সভাপতি ও কালের কণ্ঠ পত্রিকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার মনজুর হোসেন মাহী জানান, ঘটনাস্থলে কয়েকজন সাংবাদিক ভিডিও ধারণ করতে গেলে ছাত্রদলের কিছু নেতাকর্মী তাদের বাধা দেন। পরে তিনি সেখানে গিয়ে নিজের পরিচয় দিলে আইন বিভাগের শিক্ষার্থী ও শেখ মুজিবুর রহমান হলের আবাসিক শিক্ষার্থী সফি ওবায়দুর রহমান সামিথ তাকে অশালীন ভাষায় গালাগাল করেন এবং তেড়ে আসেন।
তিনি বলেন, ‘আমি পরিচয় দেয়ার পরও তারা উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। একপর্যায়ে তারা সংঘবদ্ধভাবে সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালান।’ এ ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির অন্তত ১০ জন সদস্য আহত হয়েছেন বলে জানান তিনি।
হামলায় জড়িতদের মধ্যে হাজী মুহাম্মদ মুহসিন হল ছাত্রদলের আহ্বায়ক আবু জ্বার গিফারী ইফাত, সদস্য সচিব মনসুর রাফি, শহীদুল্লাহ হলের সদস্য সচিব জুনায়েদ আবরার, বিজয় একাত্তর হল ছাত্রদলের নেতা সাকিব বিশ্বাস ও সাজ্জাদ খান, সূর্যসেন হল ছাত্রদলের আহ্বায়ক মনোয়ার হোসেন প্রান্ত, জিয়াউর রহমান হলের কারিব চৌধুরী, কবি জসিমউদদীন হল ছাত্রদলের নেতা মোহতাসিম বিল্লাহ হিমেল, শেখ মুজিবুর রহমান হল ছাত্রদল নেতা হাসানসহ আরো অনেকে ছিলেন বলে জানান ভুক্তভোগী সাংবাদিকরা। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বজলুর রহমান বিজয় ও ইমাম আল নাসের মিশুক এবং অন্যান্য নেতাকর্মীদেরও তেড়ে এসে সাংবাদিকদের ওপর আক্রমণ করতে দেখা যায়।
আরেক ভুক্তভোগী সাংবাদিক রাইজিং বিডি ডটকম’র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার সৌরভ ইসলাম বলেন, ‘শফিকুর রহমান নামের এক কর্মী সাংবাদিকদের সাথে অপমানজনক আচরণ করলে আমরা এর প্রতিবাদ করি। এরপর কিছু জুনিয়র নেতাকর্মী আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তোলে যে আমি নাকি হামলার নির্দেশ দিয়েছি।’
তিনি আরো বলেন, ‘ওরা আমাকে জোর করে টেনে ভিড়ের মধ্যে নিয়ে যায় এবং মারধর করে। পরে অন্য সাংবাদিকরা এগিয়ে এলে তাদের ওপরও হামলা করা হয়। আমাকে লক্ষ্য করে আক্রমণ করা হচ্ছিল বুঝতে পেরে সেখান থেকে সরে যাই।’
ভুক্তভোগীদের দাবি, ঘটনাস্থলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন ইউনিটের প্রায় দেড় শতাধিক ছাত্রদল নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে কেন্দ্রীয় ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের নেতারাও ছিলেন। ভুক্তভোগীদের দাবি, ঘটনাস্থলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন ইউনিটের প্রায় দেড় শতাধিক ছাত্রদল নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে কেন্দ্রীয় ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের নেতারাও ছিলেন।
এদিকে ঐ ঘটনার পর এ বি জুবায়ের ও মুসাদ্দিককে উদ্ধার করে শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) কক্ষে নেওয়া হয়। এসময় থানার সামনে ছাত্রদলের নেতা–কর্মীসহ উগ্র একদল লোক অবস্থান নেন। এক ঘণ্টার বেশি সময় এই অবস্থা চলার পর জুবায়ের ও মুসাদ্দিককে শাহবাগ থানা জামে মসজিদের ফটক দিয়ে বের করে নেওয়া হয়। পরে তাঁদেরকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক এস এম ফরহাদ বলেন, ছাত্রদলের নেতা–কর্মীরা বহিরাগতদের নিয়ে এবি জুবায়ের ও মুসাদ্দিকের ওপর হামলা করেছে।
এস এম ফরহাদের এ অভিযোগের বিষয়ে ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আন্তর্জাতিক সম্পাদক মেহেদী হাসান বলেন, ‘ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে এ বি জুবায়েরসহ ছাত্রশক্তি ও শিবিরের নেতা–কর্মীরা থানায় আসলে সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা ও বিক্ষুব্ধ জনতা তাদের মারধরের চেষ্টা করে। কিন্তু সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপনসহ ছাত্রদলের নেতা–কর্মীরা ঢাল হয়ে দাঁড়ায়।’
কেন এই ঘটনা ঘটল, সে বিষয়ে জানতে চাইলে ইসলামী ছাত্রশিবির নেতা এস এম ফরহাদ বলেছেন, ‘ঈশান চৌধুরী নামে ছাত্রলীগের একটি আইডি থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তাঁর কন্যা জাইমা রহমানকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ একটি পোস্ট দেওয়া হয়। এর পরে অরণ্য আবির নামে একটি আইডি থেকে পোস্টটি ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্যানেল থেকে ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা আবদুল্লাহ আল মাহমুদ দেয় বলে প্রচার করা হয়। বিষয়টি মাহমুদ নিজের আইডি থেকে ক্লিয়ার করে।’
এরপরও ছাত্রদল তাঁকে হুমকি দিয়ে আসছিল অভিযোগ করে এস এম ফরহাদ বলেন, ‘মাহমুদ শাহবাগ থানায় ডিজি করতে গেলে তাকে এক ঘণ্টার বেশি সময় বসিয়ে রেখে জিডি নেওয়া হয়নি। এখানে ছাত্রদলের লোকজন বহিরাগতদের নিয়ে মাহমুদকে থানায় আক্রমণ করতে যায়। তখন বিষয়টি সমাধানের জন্য এ বি জুবায়ের, মুসাদ্দিকসহ কয়েকজন থানায় গেলে ছাত্রদলের নেতা–কর্মীরা বহিরাগতদের নিয়ে তাদের ওপর হামলা করে।’
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ছাত্রদলের একজন নেতা বলেন, ‘আমরা জাইমা রহমানকে নিয়ে ভুয়া ফটোকার্ড ছড়ানোর প্রতিবাদে শাহবাগ থানায় আসি। এসে যে এই ফটোকার্ড ছড়িয়েছে, তাকে থানায় জিডি করতে দেখতে পাই। তখন আমরা পুলিশকে বলি তাকে হেফাজতে নিতে। এর কিছুক্ষণ পর ছাত্রদলের নেতা–কর্মীরা থানা থেকে বের হওয়ার সময় ডাকসুর কয়েকজন নেতা উসকানিমূলক কথা বলতে বলতে থানায় প্রবেশ করার চেষ্টা করে। সে সময় এই মারধরের ঘটনা ঘটে।’
রাত পৌনে ৯টায় ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম শাহবাগ থানায় উপস্থিত হন। এর কিছুক্ষণ পর ছাত্রদলের সভাপতি ও পুলিশের রমনা বিভাগের উপকমিশনার মাসুদ আলম এ বি জুবায়েরসহ বাকিদের শাহবাগ থানা জামে মসজিদের ফটক দিয়ে বের করে নিয়ে যান।
এ ঘটনায় এখনো পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।