মো. হাফিজ উদ্দিন :
মহান আল্লাহ তা‘আলা তাঁর অসংখ্য সৃষ্টির মধ্যে মানুষকে এক অসাধারণ মর্যাদা ও সম্মান দান করেছেন। এই মর্যাদা কোনো বিশেষ জাতি, বংশ বা গোষ্ঠীর জন্য সীমাবদ্ধ নয়; বরং সমগ্র মানবজাতির জন্য এটি একটি সার্বজনীন সম্পদ। পবিত্র কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তা‘আলা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন, “নিশ্চয়ই আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা দিয়েছি এবং তাদেরকে স্থলে ও জলে চলাচলের বাহন দিয়েছি, তাদেরকে পবিত্র রিজিক দান করেছি এবং আমার অনেক সৃষ্টির ওপর তাদেরকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি।” (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ৭০)। এই আয়াত থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, মানুষকে আল্লাহ শুধু শারীরিকভাবে সৃষ্টি করেননি, বরং তাকে পৃথিবী ও সমুদ্রের উপর কর্তৃত্ব দিয়েছেন, তাকে জীবিকার উপায় সরবরাহ করেছেন এবং অন্যান্য সৃষ্টির উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। এই শ্রেষ্ঠত্বের মূলে রয়েছে মানুষের খিলাফতের দায়িত্ব—পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে সুবিচার, সাম্য ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠা করা।
আরেকটি আয়াতে আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি সর্বোত্তম অবয়বে।” (সুরা তিন, আয়াত: ৪)। এখানে ‘সর্বোত্তম অবয়ব’ বলতে শুধু শারীরিক গঠন নয়, বরং মানুষের আত্মিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক উৎকর্ষকেও বোঝানো হয়েছে। মানুষকে আল্লাহ এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন যে, সে চিন্তা করতে পারে, সিদ্ধান্ত নিতে পারে, সৃজনশীলতা প্রকাশ করতে পারে এবং নৈতিকতার উচ্চ মান অনুসরণ করতে পারে। এই সৃষ্টির মাধ্যমে আল্লাহ মানুষকে অন্যান্য জীবজন্তু থেকে পৃথক করে দিয়েছেন। জীবজন্তুরা প্রবৃত্তির অনুসরণ করে চলে, কিন্তু মানুষের রয়েছে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি ও দায়িত্ববোধ। এই দায়িত্ববোধই মানুষকে মানবিক মর্যাদার উচ্চতায় উন্নীত করে।
আল্লাহ তা‘আলা মানুষের কল্যাণার্থে পুরো বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে তার অনুগত করে দিয়েছেন। পবিত্র কুরআনে এর বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে: “আল্লাহ তিনিই, যিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন এবং আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করে তোমাদের জীবিকার জন্য ফলমূল উৎপন্ন করেছেন। তিনি নৌকা ও জাহাজকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন যাতে তাঁর আদেশে তা সমুদ্রে চলাচল করে এবং নদীসমূহকে তোমাদের অনুগত করেছেন। তিনি তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন সূর্য ও চন্দ্রকে, যা সর্বদা আবর্তিত হচ্ছে এবং তোমাদের কাজে লাগিয়ে দিয়েছেন রাত ও দিনকে। তোমরা তাঁর কাছে যা চেয়েছ, তার সবকিছুই তিনি তোমাদের দিয়েছেন। যদি তোমরা আল্লাহর নেয়ামত গণনা করতে চাও, তবে তা গুনে শেষ করতে পারবে না।” (সুরা ইব্রাহিম, আয়াত: ৩২-৩৪)। এই আয়াতগুলো আমাদেরকে চিন্তা করতে উদ্বুদ্ধ করে যে, পৃথিবীর সবকিছু—পানি, বাতাস, সূর্যের আলো, ফলমূল, সমুদ্রপথ—সবই মানুষের সেবায় নিয়োজিত। এই নেয়ামতগুলো কোনো একক জাতি বা ব্যক্তির জন্য নয়; বরং সমগ্র মানবজাতির জন্য। এতে স্পষ্ট হয় যে, আল্লাহর সৃষ্টিতে সকল মানুষের অধিকার সমান। কেউ এই নেয়ামতগুলোকে একচেটিয়াভাবে দখল করে অন্যদের বঞ্চিত করার অধিকার রাখে না।
জমিনের সবকিছু মানুষের প্রয়োজন ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে বলে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন: “তিনিই সেই সত্তা, যিনি জমিনের সবকিছু তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তিনি আসমানের দিকে মনোনিবেশ করলেন এবং সেগুলোকে সুবিন্যস্ত সাত আসমানে পরিণত করলেন। আর তিনি সর্ববিষয়ে সম্যক জ্ঞাত।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৯)। এই সৃষ্টির উদ্দেশ্য হলো মানুষ যেন আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করে, তাঁর আদেশ পালন করে এবং পৃথিবীতে শান্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করে। মানুষের এই খিলাফতের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সে যদি অন্য মানুষের অধিকার হরণ করে, তবে সে আসলে আল্লাহর প্রতিনিধিত্বের খেলাপ করে।
বাহ্যিক নেয়ামতের পাশাপাশি আল্লাহ মানুষকে অভ্যন্তরীণ নেয়ামতও দান করেছেন। “আমি কি তার জন্য দুটি চোখ বানাইনি? এবং একটি জিহ্বা ও দুটি ঠোঁট? আর আমি তাকে (ভালো-মন্দের) দুটি পথ দেখিয়েছি।” (সুরা বালাদ, আয়াত: ৮-১০)। চোখ দিয়ে সে দেখতে পায়, জিহ্বা দিয়ে সে কথা বলতে পারে, ঠোঁট দিয়ে সে খাদ্য গ্রহণ করে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, তাকে ভালো ও মন্দের পথ দেখানো হয়েছে। এই বিবেক ও বুদ্ধির নেয়ামত প্রত্যেক মানুষকে দেওয়া হয়েছে, যাতে সে সঠিক পথ বেছে নিতে পারে। আল্লাহ মানুষকে বুদ্ধি, বিবেক, প্রজ্ঞা ও চিন্তাশক্তি দিয়েছেন। এছাড়া তাকে ভালোবাসা, মায়া-মমতা, সহানুভূতি ও ভ্রাতৃত্ববোধের মতো উন্নত অনুভূতি দান করেছেন। এই অনুভূতিগুলোই মানুষকে অন্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে শেখায়।
আল্লাহ মানুষকে বিভিন্ন শ্রেণি, জাতি, ভাষা ও অঞ্চলে বিভক্ত করেছেন। এই বিভক্তি কোনো শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য নয়, বরং পারস্পরিক পরিচিতি ও সহযোগিতার জন্য। কুরআনে বলা হয়েছে, “তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে আসমান ও জমিনের সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। নিশ্চয়ই জ্ঞানীদের জন্য এতে বহু নিদর্শন রয়েছে।” (সুরা আর-রুম, আয়াত: ২২)। এই বৈচিত্র্য পৃথিবীকে সুন্দর ও সমৃদ্ধ করেছে। বিভিন্ন জাতি ও গোত্রের মধ্যে যোগাযোগ, বাণিজ্য, জ্ঞান বিনিময় ও সংস্কৃতির আদান-প্রদান হয়। কিন্তু এই বিভক্তির সীমা অতিক্রম করে কেউ যদি অন্যকে নিজের উপরে স্থান দেয়, তবে তা আল্লাহর ইচ্ছার বিরুদ্ধে যায়।
সুরা হুজুরাতের ১৩ নম্বর আয়াতে এই বিষয়টি সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে: “হে মানুষ! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে এবং তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে যাতে তোমরা একে অপরকে চিনতে পারো। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে মর্যাদাবান সেই ব্যক্তি, যে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও সম্যক অবহিত।” এই আয়াতটি ইসলামের সাম্যের মূল স্তম্ভ। এখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, সকল মানুষের উৎপত্তি একই—হযরত আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.) থেকে। জাতি, বর্ণ, ভাষা বা অঞ্চলের পার্থক্য শুধু পরিচয়ের জন্য। শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মাপকাঠি হলো তাকওয়া—আল্লাহভীতি, নৈতিকতা ও সৎকর্ম। ধনী-গরিব, শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গ, আরব-অনারব—সবার সামনে এই সুযোগ সমান।
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর সমগ্র জীবন এই শিক্ষা প্রচার ও প্রতিষ্ঠায় ব্যয় করেছেন। তিনি ইসলামের দাওয়াতকে কোনো নির্দিষ্ট জাতির জন্য সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং এটি ছিল সমগ্র মানবজাতির জন্য। তাঁর বিদায় হজের ভাষণ ইতিহাসের এক অনন্য দলিল। সেখানে তিনি ঘোষণা করেন যে, কোনো আরবের উপর অনারবের বা অনারবের উপর আরবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। সাদার উপর কালোর বা কালোর উপর সাদার কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। তাকওয়া ছাড়া কোনো মানুষ অন্যের উপর শ্রেষ্ঠ নয়।
আইয়ামে তাশরিকের খুতবায় নবীজি (সা.) বলেছিলেন, “হে লোক সকল, তোমাদের প্রতিপালক একজন এবং তোমাদের পিতাও একজন। মনে রেখো, তাকওয়া ছাড়া কোনো আরবের উপর অনারবের, অনারবের উপর আরবের, সাদার উপর কালোর এবং কালোর উপর সাদার কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই।” তিনি আরও বলেন, আল্লাহ তোমাদের রক্ত, সম্পদ ও সম্মানকে একে অপরের জন্য হারাম করে দিয়েছেন। এই বার্তা উপস্থিত সাহাবীদের মাধ্যমে অনুপস্থিতদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশ দেন। এই ভাষণ আজও প্রাসঙ্গিক, কারণ আধুনিক বিশ্বে জাতিগত বিদ্বেষ, বর্ণবাদ ও আঞ্চলিকতাবাদ এখনও সমাজকে বিভক্ত করে রেখেছে। ইসলাম এই বিভেদের মূলে কুঠারাঘাত করেছে।
দুনিয়ার মানুষ প্রায়শই বাহ্যিক চেহারা, বংশ পরিচয়, ধন-সম্পদ বা পদমর্যাদার ভিত্তিতে অন্যকে সম্মান করে। কিন্তু আল্লাহর দরবারে মানদণ্ড সম্পূর্ণ ভিন্ন। রাসুল (সা.) বলেছেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের চেহারা এবং তোমাদের সম্পদের দিকে তাকান না, বরং তিনি তোমাদের অন্তর এবং তোমাদের আমলের দিকে তাকান।” (সহিহ মুসলিম)। অন্তরের বিশুদ্ধতা ও আমলের সৎকর্মই আসল মর্যাদা নির্ধারণ করে। এজন্য ধনী-গরিব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত সবার জন্য পুণ্য অর্জনের পথ উন্মুক্ত। কোনো ব্যক্তি বংশ বা সম্পদের অহংকারে অন্যকে তুচ্ছজ্ঞান করতে পারে না।
নবীজি (সা.) আরও বলেছেন, “তোমরা একে অপরের প্রতি হিংসা করো না, প্রতারণার উদ্দেশ্যে দাম বাড়িয়ে দিও না, পরস্পর ঘৃণা পোষণ করো না, একে অন্যের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিও না। আল্লাহর বান্দা হিসেবে ভাই ভাই হয়ে থাকো। একজন মুসলমান অন্য মুসলমানের ভাই; সে তার ওপর জুলুম করে না, তাকে অসহায় অবস্থায় ছেড়ে দেয় না এবং তাকে হেয় প্রতিপন্ন করে না। তাকওয়া এখানে (বুকের দিকে ইঙ্গিত করে)।” তিনি তিনবার বুকের দিকে ইশারা করে বলেন, “কোনো মানুষের মন্দ হওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট যে সে তার মুসলমান ভাইকে তুচ্ছজ্ঞান করে। প্রত্যেক মুসলমানের রক্ত, সম্পদ ও সম্মান অন্য মুসলমানের জন্য হারাম।” (সহিহ মুসলিম)। এই হাদিসগুলো থেকে বোঝা যায় যে, ইসলাম শুধু বাহ্যিক সাম্য নয়, বরং অন্তরের সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে।
ইসলামী সমাজব্যবস্থায় এই শিক্ষার বাস্তব প্রয়োগ দেখা যায়। মসজিদে সকলে একসাথে নামাজ পড়ে—ধনী-গরিব, শাসক-শাসিত পাশাপাশি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। হজের সময় সকলে সাদা ইহরাম পরে একই মাঠে সমবেত হয়, যেখানে বাহ্যিক পার্থক্য মুছে যায়। এই ব্যবস্থা মানুষকে শেখায় যে, সকলেই আল্লাহর সামনে সমান। আধুনিক যুগে এই শিক্ষা আরও বেশি প্রয়োজনীয়। জাতিগত সংঘাত, বর্ণবাদী আন্দোলন, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং সামাজিক অস্থিরতার মাঝে ইসলামের এই বাণী শান্তির পথ দেখাতে পারে।
মানবিক মর্যাদা রক্ষা করা প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব। নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী—সকলের অধিকার সমানভাবে সুরক্ষিত করতে হবে। ইসলাম দাসত্বের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে এবং দাসদের মুক্তির উপায়কে উৎসাহিত করেছে। এমনকি যুদ্ধবন্দিদের সাথেও মানবিক আচরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এসব শিক্ষা প্রমাণ করে যে, ইসলাম মানবতাবাদের সর্বোচ্চ রূপ।
উপসংহারে বলা যায়, ইসলাম সাম্য ও মানবিক মর্যাদার যে দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেছে, তা কোনো কাল্পনিক আদর্শ নয়; বরং বাস্তবায়নযোগ্য জীবনব্যবস্থা। এই শিক্ষা অনুসরণ করলে সমাজে ভ্রাতৃত্ব, সহনশীলতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সকলকে এই শিক্ষা অনুধাবন করার এবং তা অনুসরণ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।