সোমবার, ১ জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৮ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১৪ জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

একীভূত হচ্ছে মার্কিন ও ইসরাইলি সামরিক বাহিনী

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক বাহিনীকে আরো কাছাকাছি নিয়ে আসতে মার্কিন কংগ্রেসে একটি বিলের বিধান উত্থাপন করা হয়েছে। এর ফলে অস্ত্র গবেষণা, উৎপাদন ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা আরো গভীর হবে।

২০২৭ অর্থবছরের জাতীয় প্রতিরক্ষা অনুমোদন আইনের (এনডিএএ) হাউস আর্মড সার্ভিসেস কমিটির সংস্করণে ‘সেকশন ২২৪’-এ এই প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রস্তাবটির শিরোনাম দেওয়া হয়েছে ‘ইউনাইটেড স্টেটস-ইসরাইল ডিফেন্স টেকনোলজি কো-অপারেশন ইনিশিয়েটিভ’।

এই পদক্ষেপ এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। প্রতি বছর মার্কিন সামরিক নীতিনির্ধারণ এবং প্রতিরক্ষা কর্মসূচি ও ব্যয়ের মাত্রা অনুমোদনের জন্য কংগ্রেসে এনডিএএ পাস হয়। এটি আইন হিসেবে পাস হলে বিশ্বের অন্যতম ঘনিষ্ঠ এই সামরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বড় পরিবর্তন আসবে। তখন দুই দেশের অংশীদারিত্ব কেবল মার্কিন সামরিক সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রতিরক্ষাশিল্পের গভীর মেলবন্ধনে রূপ নেবে।

এই সেকশন ২২৪-এর আওতায় মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে একজন ‘এক্সিকিউটিভ এজেন্ট’ বা একক কর্মকর্তা নিয়োগ করতে হবে, যিনি দুই দেশের সামরিক সহযোগিতার বিষয়টি সমন্বয় করবেন। এ কাজের মধ্যে যৌথ গবেষণা ও উন্নয়ন, যৌথ অস্ত্র উৎপাদন এবং সামরিক ব্যবস্থা ও ডেটার সংযোগ অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

এই বিতর্কিত বিধানের বিষয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক কর্মকর্তা ও অ্যাডভোকেসি গ্রুপ ‘এ নিউ পলিসি’-এর প্রতিষ্ঠাতা জশ পল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, ‘কংগ্রেস এখন এই সম্পর্ককে আমেরিকার নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প ভিত্তির এত গভীরে প্রোথিত করার চেষ্টা করছে, যা উপড়ে ফেলা অসম্ভব।’

তিনি আরো বলেন, এই আইন ইসরাইলকে আমেরিকার প্রযুক্তিতে নজিরবিহীন প্রবেশাধিকার দেবে এবং মার্কিন সামরিক বাহিনীকে তাদের নিজস্ব গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সরবরাহ চেইনে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি একীভূত করতে বাধ্য করবে, যা আমেরিকার নিজস্ব প্রতিরক্ষা অগ্রাধিকারের ওপর ইসরাইলকে অবিশ্বাস্য সুবিধা দেবে।

উভয় দেশ ইতোমধ্যেই আয়রন ডোম-এর মতো ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যৌথভাবে তৈরি করছে। তবে এই বিলের মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ড্রোন এবং সাইবার অপারেশনের মতো আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রের আরো অনেক ক্ষেত্রে তাদের যৌথ কাজ প্রসারিত হবে।

চলতি বছরের শুরুতে ইরানে মার্কিন-ইসরাইলি যৌথ হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতার মধ্যেই এই বিধানটি সামনে এলো। গত ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন ও ইসরাইলি বাহিনী যৌথভাবে ইরানে হামলা চালায়, যা পাঁচ সপ্তাহের যুদ্ধের সূত্রপাত করে। গত এপ্রিলে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার আগে ইরান ইসরাইল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা আঘাত হেনেছিল। এছাড়া গাজা যুদ্ধের কারণে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালত-আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) দক্ষিণ আফ্রিকার দায়ের করা একটি মামলায় ইসরাইল গণহত্যার অভিযোগের মুখোমুখি রয়েছে।

কয়েক দশকের সমর্থন:

বিলটি পূর্ণাঙ্গ হাউজ এবং সিনেটে পাস হওয়ার আগে আগামী জুনের শুরুতে হাউজ আর্মড সার্ভিসেস কমিটিতে অনুমোদিত হতে হবে। কমিটির রিপাবলিকান চেয়ারম্যান মাইক রজার্স এবং জ্যেষ্ঠ ডেমোক্র্যাট অ্যাডাম স্মিথ এটি প্রস্তাব করেছেন। ফলে বিলটিতে দুই প্রধান দলেরই সমর্থন রয়েছে, যদিও সাম্প্রতিক জনমত জরিপ অনুযায়ী ইসরাইলকে আরো সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে মার্কিন ডেমোক্র্যাট এবং কিছু রিপাবলিকানের মধ্যে বিরোধিতা বাড়ছে।

যুক্তরাষ্ট্র কয়েক দশক ধরে ইসরাইলের সামরিক বাহিনীকে সহায়তা করে আসছে। ২০০৮ সাল থেকে মার্কিন আইন অনুযায়ী, ওয়াশিংটনের জন্য ইসরাইলের ‘কোয়ালিটেটিভ মিলিটারি এজ’ বা গুণগত সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব রক্ষা করা বাধ্যতামূলক, যেন এই অঞ্চলের যেকোনো প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে ইসরাইলি বাহিনী শক্তিশালী ও উন্নত থাকে।

সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রশাসনের আমলে স্বাক্ষরিত ১০ বছর মেয়াদী বর্তমান চুক্তি অনুযায়ী, ওয়াশিংটন ইসরাইলকে প্রতি বছর প্রায় ৩৮০ কোটি ডলার সামরিক সহায়তা দেয়। এই চুক্তির মেয়াদ ২০২৮ সাল পর্যন্ত রয়েছে। ১৯৪৮ সালের পর থেকে ইসরাইল মার্কিন বৈদেশিক সহায়তার সবচেয়ে বড় গ্রহীতা, যার প্রায় পুরোটাই সামরিক এবং মুদ্রাস্ফীতি সমন্বয় করলে এর মূল্যমান ৩০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।

তবে এই সহায়তার ধরন এখন বদলে যেতে পারে। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সম্প্রতি জানিয়েছেন, তিনি আগামী ১০ বছরের মধ্যে মার্কিন সামরিক সহায়তার ওপর ইসরাইলের নির্ভরতা শেষ করতে চান। নগদ অর্থের পরিবর্তে দুই দেশের প্রতিরক্ষা শিল্পের মধ্যকার এই ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা সম্ভবত সেই লক্ষ্যের সঙ্গেই মিলে যায়।

সূত্র: আলজাজিরা