নিজস্ব প্রতিবেদক : দেশের কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ফ্রিল্যান্সারদের জন্য বড় ধরনের সুখবর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। কনটেন্ট নির্মাতা ও চিত্ত মিডিয়ার প্রতিষ্ঠাতা জুয়েল রানার সঙ্গে এক দীর্ঘ সৌজন্য সাক্ষাতে তিনি জানিয়েছেন, কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ফ্রিল্যান্সারদের ওপর সাড়ে সাত শতাংশ ভ্যাট আরোপের যে আলোচনা বা শঙ্কা তৈরি হয়েছে, তা বাস্তবায়নের কোনো সুযোগ নেই। বরং যারা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কাজ করে বৈদেশিক মুদ্রা দেশে নিয়ে আসছেন, তাদের জন্য রাষ্ট্রের আরও সহায়ক ভূমিকা থাকা উচিত বলেও মত দিয়েছেন তিনি।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে একটি গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকালে এমন কথা জানিয়েছেন জুয়েল রানা। তিনি বলেন, পুরো সাক্ষাৎকারটি ছিল অত্যন্ত আন্তরিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ। সেখানে রাজনীতির চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে দেশের মানুষ, প্রকৃতি, সংস্কৃতি, মানবিকতা এবং তরুণদের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী তাকে একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবেই আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন এবং দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন বিষয়ে মতবিনিময় করেন। সাক্ষাতের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী জানান, তিনি দীর্ঘদিন ধরে জুয়েল রানার কনটেন্ট দেখে আসছেন। বিশেষ করে গ্রামবাংলার প্রকৃতি, নদী, মাঠ, মেঠোপথ, কৃষিজীবন এবং মানুষের সহজ-সরল জীবনযাপনকে তুলে ধরার বিষয়টি তার ভালো লাগে।
জুয়েল রানা জানান, প্রধানমন্ত্রী তাকে বলেন, ইংল্যান্ডে অবস্থানকালে তিনি প্রকৃতির সান্নিধ্যে থাকার সুযোগ পেয়েছেন এবং এখনো প্রকৃতির প্রতি তার আলাদা টান রয়েছে। ব্যস্ত রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের মধ্যেও সময় পেলেই তিনি প্রকৃতিনির্ভর বিভিন্ন কনটেন্ট দেখেন। গ্রামবাংলার সৌন্দর্য, ঋতু পরিবর্তনের দৃশ্য, মানুষের জীবনসংগ্রাম এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়, তা তাকে আকৃষ্ট করে। শুধু দৃশ্য নয়, কনটেন্টে সাহিত্য, কবিতা বা বিভিন্ন উদ্ধৃতির ব্যবহারও তার কাছে ভালো লাগে।
আলোচনার একপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী জুয়েল রানার কাছে জানতে চান, রাষ্ট্রের জন্য তার কোনো পরামর্শ আছে কি না। জবাবে জুয়েল রানা বলেন, দেশের মানুষের মধ্যে আত্মিক ও মানবিক পরিবর্তন প্রয়োজন। তিনি বলেন, বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় কোনো দুর্ঘটনা বা বিপদে মানুষ সাহায্যের হাত বাড়ানোর আগে মোবাইল ফোন বের করে ভিডিও ধারণ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। অথচ একজন বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোই হওয়া উচিত প্রথম কাজ। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, কোনো শিশু যদি লিচু গাছ থেকে কয়েকটি লিচু পাড়ে, তাহলে তাকে মারধর করার পরিবর্তে ভালোবাসা দিয়ে বোঝানো উচিত। একইভাবে প্রাণী, প্রকৃতি ও মানুষের প্রতি সহমর্মিতা বাড়াতে হবে। রাষ্ট্র তখনই এগিয়ে যাবে, যখন মানুষের মন ও মানসিকতায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
তিনি আরও বলেন, দেশের বিভিন্ন সময়ের কিছু ঘটনা আমাকে ব্যথিত করে। কোনো অসহায় মানুষ যখন কষ্টে থাকে, তখন অনেকেই তা ক্যামেরাবন্দি করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। কিন্তু সহানুভূতির জায়গা থেকে এগিয়ে আসেন না। এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার প্রয়োজনীয়তার কথাই আমি প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরেছেন। তার মতে, দেশের উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের মনন, মূল্যবোধ ও দায়িত্ববোধের উন্নয়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তবে পুরো সাক্ষাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় ছিল কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ফ্রিল্যান্সারদের ওপর প্রস্তাবিত সাড়ে সাত শতাংশ ভ্যাটের বিষয়টি। জুয়েল রানা জানান, তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে সরাসরি জানতে চান, এ বিষয়ে যে আলোচনা চলছে তা কতটুকু সত্য। কারণ দেশের হাজার হাজার তরুণ বর্তমানে ফ্রিল্যান্সিং, ডিজিটাল মার্কেটিং, ভিডিও নির্মাণ এবং বিভিন্ন অনলাইনভিত্তিক পেশার মাধ্যমে আয় করছেন। অনেকেই বিদেশি প্রতিষ্ঠান বা ক্লায়েন্টের সঙ্গে কাজ করে বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আনছেন। এমন একটি খাতে অতিরিক্ত কর বা ভ্যাট আরোপ করা হলে তরুণদের মধ্যে হতাশা তৈরি হতে পারে।
জুয়েল রানা বলেন, বিষয়টি উত্থাপনের পর প্রধানমন্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের ডাকেন এবং বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজ নিতে বলেন। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে তরুণদের কর্মসংস্থানের অন্যতম বড় ক্ষেত্র এখন ডিজিটাল অর্থনীতি। ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটররা শুধু নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করছেন না, তারা দেশের অর্থনীতিতেও অবদান রাখছেন। যারা বিদেশ থেকে আয় এনে দেশের ভেতরে ব্যয় করছেন, তাদের নিরুৎসাহিত করার মতো কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যুক্তিযুক্ত হবে না।
তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী আমাকে আশ্বস্ত করে বলেছেন, আপনারা নিশ্চিন্তে কাজ করুন। ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটররা দেশের সম্পদ। তারা দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। তাদের জন্য অযৌক্তিক কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না।’ তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখেছেন এবং তাকে আশ্বস্ত করেছেন যে এ ধরনের কোনো পদক্ষেপ বাস্তবায়নের সুযোগ নেই।
আলোচনায় জুয়েল রানা আরও উল্লেখ করেন, ফ্রিল্যান্সাররা কোনোভাবেই দেশের অর্থ পাচার করছেন না; বরং উল্টো বিদেশ থেকে আয় এনে দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছেন। এ বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরলে তিনি একমত পোষণ করেন এবং বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, তরুণদের কর্মসংস্থান এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির বিকাশে সরকার ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এগোতে চায়।
সাক্ষাতে প্রধানমন্ত্রী জুয়েল রানাকে তার বর্তমান কাজ চালিয়ে যাওয়ারও অনুরোধ করেন। তিনি বলেন, প্রকৃতি, গ্রামবাংলা এবং মানুষের জীবনকে তুলে ধরার কাজ কখনো বন্ধ করা উচিত নয়। কারণ এসব কনটেন্ট মানুষকে শেকড়ের সঙ্গে যুক্ত রাখে এবং দেশের প্রকৃত সৌন্দর্যকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরে। পাশাপাশি শিল্প ও সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে কনটেন্টকে আরও সমৃদ্ধ করার পরামর্শও দেন তিনি।
জুয়েল রানা জানান, আলোচনার একপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী তাকে জিজ্ঞেস করেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে রাষ্ট্রের কাছে কী চান। জবাবে তিনি বলেন, রাষ্ট্রের সব নাগরিকের জন্য যা ভালো হবে, সেটিই তার জন্য যথেষ্ট। তিনি কোনো ব্যক্তিগত সুবিধা চান না। দেশের সব মানুষ ভালো থাকলে তিনিও ভালো থাকবেন। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে দেশের সম্পদ রক্ষা করা, মানুষকে বিভ্রান্ত না করা এবং দায়িত্বশীল আচরণ করাই তার লক্ষ্য।
কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ফ্রিল্যান্সারদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর এই বার্তা দেশের ডিজিটাল অর্থনীতিতে যুক্ত তরুণদের মধ্যে নতুন আশাবাদ সৃষ্টি করবে বলে তিনি মনে করেন তিনি।