মো. হাফিজ উদ্দিন:
বর্ষা আসার আগেই দ্বৈত সংকটে জনস্বাস্থ্যের উদ্বেগ বেড়ে চলেছে বাংলাদেশে। চলতি বছরের মার্চ মাসের মাঝামাঝি থেকে শুরু হওয়া হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। দেশের বিভিন্ন জেলায় হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন শত শত শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হচ্ছে। দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে হাম ও হামের উপসর্গে মোট প্রাণ গেল ৬৩১ জনের।
গতকাল মঙ্গলবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত বুলেটিনে বলা হয়েছে, এদিন সকাল ৮টা পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে ঢাকা, সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগে একজন করে শিশু মারা গেছে।
এ নিয়ে ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ৯২ জন। আর হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৫৩৯ জন।
বুলেটিনে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে এসেছিলেন ৯৮০ জন। এ নিয়ে সম্ভাব্য হাম আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮১ হাজার ৮৪ জন।
গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৫৪ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। তাতে ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম আক্রান্ত হয়েছেন ৯ হাজার ৮৩৩ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ৬৬ হাজার ১৭০ জন; চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ৬২ হাজার ২৯২ জন।
জুনের প্রথম সপ্তাহ জুড়ে প্রতিদিন হাজারের বেশি নতুন সন্দেহভাজন কেস এবং কয়েকজন করে মৃত্যুর খবর আসছে। মে মাসের শেষের দিকে মৃত্যুর সংখ্যা ৫২৮-এ পৌঁছেছিল এবং হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা তখন ৫০ হাজারের ওপরে ছিল। জুনের শুরুতে এসে পরিস্থিতি এখনও স্থিতিশীল হয়নি। অধিকাংশ আক্রান্তই পাঁচ বছরের নিচের শিশু, যাদের মধ্যে অনেকেই টিকা না পাওয়া বা আংশিক টিকাপ্রাপ্ত। মার্চ থেকে মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে ১ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন কেস শনাক্ত হচ্ছিল, কোনো কোনো দিন ১ হাজার ৫০০ ছাড়িয়েছে। জুনের প্রথম ৯ দিনেও এই ধারা অব্যাহত রয়েছে।
ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, শিশু ওয়ার্ডগুলোতে বেডের অভাব চরমে। অভিভাবকরা দিনরাত লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে সন্তানের চিকিৎসার জন্য অপেক্ষা করছেন। অনেক শিশু উচ্চ জ্বর, কাশি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং শরীরে লালচে র্যাশ নিয়ে ভর্তি হয়েছে। হামের জটিলতায় নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া এবং মস্তিষ্কের প্রদাহের মতো সমস্যা দেখা দিচ্ছে, যা শিশুদের জীবনকে আরও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। চিকিৎসকরা বলছেন, টিকাদানের হার কমে যাওয়া, টিকা সরবরাহে বিঘ্ন এবং সচেতনতার অভাব এই প্রাদুর্ভাবের অন্যতম কারণ। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় এবং শহরের ঘনবসতিপূর্ণ স্লামগুলোতে এই রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে।
সরকার এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু করেছে। এপ্রিল মাস থেকে দেশব্যাপী এই কর্মসূচি চলছে, যার আওতায় ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের টিকা দেওয়া হচ্ছে। ইউনিসেফসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এই প্রচেষ্টায় সহায়তা করছে। কিন্তু টিকাদানের হার এখনও লক্ষ্যমাত্রার পুরোপুরি কাছে পৌঁছায়নি। অনেক জায়গায় সচেতনতার অভাব এবং লজিস্টিক সমস্যার কারণে টিকা পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে। ফলে হামের সংক্রমণ এখনও থামছে না। জুন মাসের প্রথম ৯ দিনেও প্রতিদিন হাজারের বেশি নতুন সন্দেহভাজন কেস রিপোর্ট হচ্ছে এবং হাসপাতালে ভর্তির চাপ কমছে না।
এদিকে, হামের এই বিভীষিকা পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠার আগেই নতুন হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে ডেঙ্গু। বাংলাদেশে ডেঙ্গু এখন আর শুধু বর্ষাকালীন রোগ নয়, সারা বছরব্যাপী একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে বর্ষা মৌসুমে এর প্রকোপ সাধারণত বহুগুণ বেড়ে যায়। ৯ জুন ২০২৬ পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত মোট ৩,৮৪৪টি ডেঙ্গু কেস শনাক্ত হয়েছে এবং ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহে (জুনের প্রথম সপ্তাহ) ৪৩১টি কেস এবং ১টি মৃত্যু রিপোর্ট হয়েছে। জুন মাসের প্রথম ৯ দিনে ৪০৭টি কেস দেখা গেছে, যা মে মাসের ৭১৪টি কেসের তুলনায় দ্রুত বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আসন্ন বর্ষায় বৃষ্টির পানি জমে এডিস মশার বংশবৃদ্ধি হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
ডেঙ্গুর লক্ষণগুলো অনেকটা হামের সঙ্গে মিলে যায় – উচ্চ জ্বর, শরীরে ব্যথা, মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা ইত্যাদি। এ কারণে অনেক সময় দুই রোগের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয় এবং চিকিৎসায় দেরি হয়। ডেঙ্গুর হেমোরেজিক বা ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোমের মতো জটিল রূপ দেখা দিলে রোগীর অবস্থা দ্রুত অবনতি হয়। হামের কারণে ইতোমধ্যে হাসপাতালগুলোতে বেড এবং আইসিইউ সুবিধার ওপর চাপ পড়েছে। গত কয়েক মাসে হামের জন্য ৬০ হাজারের বেশি ভর্তি হয়েছে, যার মধ্যে অনেকে এখনও চিকিৎসাধীন। এর ওপর যদি ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ে, তাহলে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। চিকিৎসকরা বলছেন, শিশু ওয়ার্ডগুলোতে ইতোমধ্যে বেড খালি নেই। ডেঙ্গু যোগ হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীসহ সরকারের বিভিন্ন কর্মকর্তা এই দ্বৈত সংকট মোকাবিলায় সতর্কতা জারি করেছেন। ডেঙ্গু প্রতিরোধে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ অভিযান জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সিটি কর্পোরেশনগুলোকে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে পানি জমে থাকা জায়গাগুলোতে অভিযান চালাতে বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এই অভিযানগুলো কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে নির্মাণাধীন সাইট, পরিত্যক্ত টায়ার, ফুলের টব এবং ছাদের ট্যাঙ্কিতে পানি জমে মশার লার্ভা তৈরি হচ্ছে। গ্রামীণ এলাকায়ও খোলা জলাশয় এবং বাড়ির আশপাশে পানি জমে থাকার কারণে ঝুঁকি বাড়ছে।
হাম এবং ডেঙ্গুর এই যৌথ হুমকি শুধু স্বাস্থ্যগত সমস্যা নয়, এটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও বড় প্রভাব ফেলছে। অনেক অভিভাবক সন্তানের অসুস্থতার কারণে কাজে যেতে পারছেন না। হাসপাতালে ভর্তি শিশুদের দেখাশোনা করতে গিয়ে পরিবারগুলোর আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। চিকিৎসা ব্যয়, যাতায়াত এবং অন্যান্য খরচ মেটাতে অনেকে ধারদেনা করছেন। এছাড়া স্কুল-কলেজে শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতি বেড়ে যাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষা ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করবে।
এই পরিস্থিতিতে জনসচেতনতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। প্রত্যেক নাগরিককে নিজ নিজ এলাকায় পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে হবে। বাড়ির আশপাশে কোনো পানি জমতে দেওয়া যাবে না। সপ্তাহে অন্তত একদিন বাড়ির চারপাশ পরিষ্কার করা, ফুলের টবের পানি পরিবর্তন করা, ব্যবহৃত টায়ার বা অন্যান্য জিনিস ঢেকে রাখা – এসব ছোট ছোট অভ্যাস ডেঙ্গু প্রতিরোধে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। শিশুদের হাম-রুবেলা টিকা নিশ্চিত করতে অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। জ্বর হলেই তাৎক্ষণিক ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত। হাম বা ডেঙ্গুর লক্ষণ দেখা দিলে নিজে নিজে চিকিৎসা না করে হাসপাতালে যাওয়া জরুরি।
সরকারের পক্ষ থেকে হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ এবং শিশু বিভাগের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই উদ্যোগগুলোকে আরও জোরদার করতে হবে। টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করা, সার্ভেইল্যান্স সিস্টেমকে শক্তিশালী করা এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা কাজে লাগানো প্রয়োজন। পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন এবং সিটি কর্পোরেশনকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। জনগণের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি সমন্বিত প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা না গেলে এই দ্বৈত সংকট থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হয়ে পড়বে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই সংকট শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একার দায়িত্ব নয়। শিক্ষা, স্থানীয় সরকার, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়সহ সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। স্কুলে সচেতনতা ক্যাম্পেইন, মসজিদ-মন্দিরে ঘোষণা, সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচার – এসবের মাধ্যমে জনমত গঠন করা যেতে পারে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় স্বাস্থ্যকর্মীদের ভূমিকা আরও বাড়াতে হবে।